সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যেই জারি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত প্রস্তাব আগামী সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে। অনুমোদন মিললে কয়েক দিনের মধ্যেই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। সোমবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চলছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে বৃহস্পতিবারের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে।
তবে চূড়ান্ত প্রস্তাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা কতটা বাড়ানো হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি অর্থ বিভাগ।
এর আগে গত ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার জানিয়েছিলেন, নতুন পে-স্কেলের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই এটি ঘোষণা করা হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া গত ২৯ জুলাই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, নবম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে দ্রুত মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব পাঠানো হবে এবং অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
### বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সুপারিশ পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে ১০ সদস্যের একটি সচিব কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইতোমধ্যে তাদের সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সচিব কমিটি সরকারি চাকরির ১ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ প্রায় দ্বিগুণ করার সুপারিশ করেছে। প্রস্তাবটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে মূল বেতন এবং পরবর্তী ধাপে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর হতে পারে।
### সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামো
চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত গ্রেডভিত্তিক বেতনের এসব হিসাবকে নিশ্চিত নয়, বরং সম্ভাব্য বা প্রস্তাবিত কাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ১ম গ্রেডের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা হতে পারে। ২য় গ্রেডে ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং ৩য় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
৪র্থ গ্রেডে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা, ৫ম গ্রেডে ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা হতে পারে।
৭ম গ্রেডে ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা, ৮ম গ্রেডে ৪৭ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা এবং ৯ম গ্রেডে ৪৫ হাজার ১০০ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতনের প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া ১০ম গ্রেডে ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা, ১১তম গ্রেডে ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডে ২৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা হতে পারে।
১৩তম গ্রেডে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা, ১৪তম গ্রেডে ২৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১৫তম গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০ থেকে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
১৬তম গ্রেডে ২১ হাজার ৯০০ থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা, ১৭তম গ্রেডে ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা এবং ১৮তম গ্রেডে ২১ হাজার থেকে ৫০ হাজার ৯০০ টাকা হতে পারে।
অন্যদিকে, ১৯তম গ্রেডে ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডে ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত মূল বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
### এক যুগ পর নতুন বেতন কাঠামো
অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রায় ১২ বছর পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ওই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশনের সুপারিশে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়। এর মধ্যে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ সময় একই বেতন কাঠামো চালু থাকা এবং মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
সরকারের ১৮০ দিন উপলক্ষে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকেও নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে।
বিশেষ প্রতিনিধি 
























