সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে এসে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগে ফের আলোচনায় ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শেখ মোকাররম হোসেন।
নামজারি, খাজনা ও খাসজমির ডিসিআরসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা নিয়ে একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ভূমিসেবা পেতে সাধারণ মানুষকে কেন অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে? আর একই কর্মকর্তাকে ঘিরে বারবার অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর তদন্ত কোথায়?
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সরকারি নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেও ভূমি অফিসে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থের দাবি করা হয়। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের কাছে কাজের ধরন ও জমির পরিমাণ অনুযায়ী ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। শুধু নামজারি নয়, খাসজমির ডিসিআরসহ অন্যান্য কাজেও মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি করেছেন কুলিয়া গ্রামের আনিসুর রহমান। তার দাবি, ১৫ শতক জমি নামজারির জন্য তার কাছে ৭ হাজার টাকা দাবি করা হয়। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে গিয়ে কাজ করিয়ে নিতে বলা হয়। তার অভিযোগ, ৭ হাজার টাকার কমে কাজ করে দেওয়া সম্ভব নয় এমন কথাও তাকে বলা হয়।
আরেক ভুক্তভোগী হালিমা খাতুনের অভিযোগ আরও বড় অঙ্কের। তার দাবি, চার বিঘা জমি নামজারি করতে তাকে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। অতিরিক্ত টাকা না দিলে কাজ হবে না এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই টাকা দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
‘নামজারি আমি করি না’কর্মকর্তার দাবি
ভুক্তভোগীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোকাররম হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারি সম্পন্ন হয় না; নামজারি করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। ফলে নামজারি বাবদ ঘুষ নেওয়ার সুযোগ তার নেই বলে দাবি করেন তিনি।
কিন্তু ভুক্তভোগীদের অভিযোগের প্রশ্ন হলো নামজারির পুরো প্রক্রিয়া যদি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে সম্পন্ন হয়, তাহলে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারি সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবির অভিযোগ উঠছে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর বের করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মোকাররম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সূত্রপাত কেবল কুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নয়—এমন দাবিও করেছেন স্থানীয়রা। এর আগে কালিগঞ্জ উপজেলার কুশুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মের একাধিক অভিযোগ ওঠার কথা জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সে সময় এক নারীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। এছাড়া ফতেপুর গ্রামের এক ভূমি মালিকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা, উত্তর শ্রীপুর গ্রামের মৃত গোরাই সরদারের ছেলে আব্দুল মান্নানের কাছ থেকে নামজারির জন্য ৯ হাজার টাকা এবং কলিযোগা গ্রামের এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
এমনকি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ১৪৫ ধারার মামলায় প্রতিবেদন দেওয়ার ক্ষেত্রেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।
এসব অভিযোগ নিয়ে তখন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাকে কুশুলিয়া থেকে কলারোয়া ভূমি অফিসে বদলি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করে। পরবর্তীতে কলারোয়া ভূমি অফিসেও তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে বলে অভিযোগকারীদের ভাষ্য।
বদলি কি সমাধান, নাকি তদন্তই জরুরি?
একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন কর্মস্থলে একই ধরনের অভিযোগ ওঠার বিষয়টি এখন সামনে এনে স্থানীয়রা বলছেন, শুধু বদলি করলেই অভিযোগের সমাধান হয় না। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা তা নির্ধারণে প্রশাসনিক তদন্ত হওয়া দরকার।
তাদের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি বারবার ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে, তাহলে প্রতিটি অভিযোগের নথি, ভূমি সেবার আবেদন, সরকারি ফি জমার রসিদ, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্য যাচাই করা হয়েছে কি না?
বিশেষ করে নামজারি ও ভূমিসেবা সংক্রান্ত কাজের ক্ষেত্রে সরকারি ফি কত, কোন ধাপে কত টাকা নেওয়ার বিধান রয়েছে এবং অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কী—এসব বিষয় প্রকাশ্যে পরিষ্কার করার দাবি উঠেছে।
‘অভিযোগের শেষ কোথায়’ জবাব চায় সেবাপ্রত্যাশীরা
কুলিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ভূমি সংক্রান্ত কাজ এমনিতেই জটিল। এর মধ্যে সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হলে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য তা বড় ধরনের চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগগুলোকে ব্যক্তিগত বিরোধ বা ভিত্তিহীন অভিযোগ হিসেবে পাশ কাটিয়ে না দিয়ে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরেজমিন তদন্ত করা হোক। প্রয়োজনে ভুক্তভোগীদের লিখিত বক্তব্য নেওয়া, সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই, সরকারি ফি ও আদায়ের হিসাব পর্যালোচনা এবং অফিসের কার্যক্রম তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীদেরও বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানানো দুই ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
একই কর্মকর্তাকে ঘিরে অতীতে ও বর্তমানে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কীএখন সেটিই মূল প্রশ্ন। বদলি নয়, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এর জবাব বের হওয়া দরকার বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
স্টাফ রিপোর্টার, 

















