প্রেমের টানে দেশের সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে পাড়ি জমিয়েছিলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের আলিগড়ের তরুণ বাদল বাবু। সঙ্গে ছিল না পাসপোর্ট, ভিসা কিংবা কোনো ভ্রমণ নথি। ছিল শুধু পাকিস্তানি তরুণী সানা রানির প্রতি ভালোবাসা। তবে সেই ভালোবাসার পরিণতি সুখকর হয়নি। প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি জীবন কাটছে তার।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের এক গভীর রাতে ভারতের আত্তারি–ওয়াঘা সীমান্তের কাছে পৌঁছান বাদল। সীমান্তের নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করতে অন্ধকারে একে একে জুতা ছুড়ে দেখেন তিনি। কোনো বিস্ফোরণ বা সতর্কসংকেত না পেয়ে বৈদ্যুতিক তারের নিচ দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানে ঢুকে পড়েন।তার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের ম্যান্ডি বাহাউদ্দিনে থাকা ফেসবুকের পরিচিত তরুণী সানা রানির সঙ্গে দেখা করা।
ফেসবুক থেকে প্রেম
বাদল ও সানা রানির পরিচয় ২০২২ সালে ফেসবুকে। তখন বাদলের বয়স মাত্র ১৭ বছর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথোপকথনের পর তাদের যোগাযোগ গড়ায় হোয়াটসঅ্যাপে। টেক্সট মেসেজের পর অডিও ও ভিডিও কলে নিয়মিত কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তারা।
বাদল তখন দিল্লির একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। মাসে প্রায় ১৫ হাজার রুপি আয় করতেন তিনি। এর মধ্যে ১০ হাজার রুপি পরিবারের কাছে পাঠাতেন। পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের একটি বড় অংশও তার ওপর ছিল।
২০২৪ সালে সানা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে বাদল রাজি হয়ে যান। কিন্তু সানার পরিবার এ বিয়েতে আপত্তি জানায়। বিশেষ করে বাদল ভারতীয় নাগরিক এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়ায় তার প্রতি সানার মায়ের আপত্তি ছিল।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে সীমান্তের পথে
২০২৪ সালের আগস্টে রাখিবন্ধন উৎসবের পর বাদল তার মাকে জানান, কাজের জন্য তাকে দিল্লিতে ফিরতে হবে। এরপরই বাড়ি ছাড়েন তিনি। নিজের পোশাক, টাকা–পয়সা ও সরকারি পরিচয়পত্র পর্যন্ত বাড়িতে রেখে যান।
কয়েক সপ্তাহ পরিবারের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। দীপাবলির একদিন আগে অবশ্য একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ভিডিও কল আসে। পরে বাদলের মা গায়ত্রী বুঝতে পারেন, নম্বরটির শুরুতে পাকিস্তানের কান্ট্রি কোড +৯২ রয়েছে।
ততক্ষণে বাদল ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তানে পৌঁছে গেছেন।
পাকিস্তানে গিয়ে বদলে গেল গল্প
পাকিস্তানে পৌঁছে ম্যান্ডি বাহাউদ্দিন এলাকায় সানা রানির সঙ্গে দেখা করেন বাদল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল তার প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত। সানা তাকে বিয়ে করতে রাজি হননি। তার পরিবারও সম্পর্কটি মেনে নেয়নি।
অন্যদিকে বাদলের কাছে কোনো পরিচয়পত্র না থাকায় বৈধ পথে ভারতে ফিরে যাওয়ার সুযোগও ছিল না। বাধ্য হয়ে পাকিস্তানের একটি গ্রামে গবাদিপশু চরানোর কাজ শুরু করেন তিনি। স্থানীয় একটি পরিবার তাকে থাকার সুযোগ দেয়।
এভাবেই কয়েক মাস কেটে যায়।
কথার টানেই ধরা পড়েন
২০২৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাদলের কথাবার্তায় স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। তার কথায় আলিগড় অঞ্চলের উপভাষার টান ধরা পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, তিনি ভারতের নাগরিক।
পরে স্থানীয় পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সদর ম্যান্ডি বাহাউদ্দিন থানায় বাদলের বিরুদ্ধে ১৯৪৬ সালের ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৩ ও ১৪ ধারায় মামলা করা হয়।
২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার পাকিস্তানি রুপি জরিমানা করেন।
সাজা শেষ, তবু মুক্তি নেই
বাদলের আইনজীবী ফিয়াজ রামের দাবি, তার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি বা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার অপরাধ ছিল বৈধ ভিসা বা অনুমতি ছাড়া পাকিস্তানে প্রবেশ করা।
আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই বাদলের কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু সাজা শেষ হওয়ার পরও তিনি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ভারতে ফিরতে পারেননি।
ছেলের ফেরার অপেক্ষায় পরিবার
বাদলের বাবা কৃপাল সিংহ ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করছেন। আইনি প্রক্রিয়ায় পরিবারের প্রায় তিন লাখ রুপি খরচ হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বাদলের পরিবারের এখন একমাত্র আশা, সরকারি ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি অনুযায়ী, পাকিস্তানের লাহোর কারাগারে থাকা বাদলের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের কনস্যুলার যোগাযোগ হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি তাকে কনস্যুলার অ্যাকসেস দেওয়া হয়।
তবে ওই সময় পর্যন্ত ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাদলের ভারতীয় নাগরিকত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাকিস্তানের কারাগারে থাকা ভারতীয় বন্দিদের মুক্তি ও দেশে ফেরানোর বিষয়টি নিয়মিত কূটনৈতিক পর্যায়ে উত্থাপন করা হয়। বাদলের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও পরবর্তী প্রক্রিয়ার অপেক্ষা চলছে।
এক তরুণের কাছে যা ছিল ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার স্বপ্ন, শেষ পর্যন্ত সেটিই পরিণত হয়েছে সীমান্ত, মামলা আর কারাগারের দীর্ঘ অপেক্ষায়। প্রেমিকার কাছে যেতে সীমান্ত পেরোনো বাদল এখন অপেক্ষা করছেন নিজের দেশ ও পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার।
বিশেষ প্রতিনিধি(অনলাইন ডেস্ক) 























