প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা জোরালো হয়েছে। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার পাশাপাশি কোন মন্ত্রণালয়ের কাজ কতটা এগিয়েছে, কোথায় গতি কম এবং কোথায় দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
যদিও মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অন্তত কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আসতে পারে। কিছু মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব কমানো, দপ্তর পরিবর্তন এবং কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীকে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
সরকারের ভেতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাত থেকে আটটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। এসব মন্ত্রণালয়ের কয়েকটিতে নেতৃত্বের পরিবর্তন কিংবা দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন কয়েকজনকে সরকারে যুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের হিসাব
সোমবার ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে। এ সময়কে সামনে রেখে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রম মূল্যায়ন করছে। পর্যালোচনা শেষ হলে প্রধানমন্ত্রী জাতির সামনে সরকারের অর্জন ও পরবর্তী পরিকল্পনা তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান আরও পরিষ্কার হতে পারে।
আরও পড়ুন
শ্যামনগরের উপকূলীয় কৈখালী ভূমি অফিসে জরাজীর্ণ টিন সেটে চলছে দুই ইউনিয়নের ভূমি সেবা
কয়েকটি মন্ত্রণালয় নিয়ে অসন্তোষ
সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কাজ প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোচ্ছে না। এসব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কয়েকটিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীদের দায়িত্বের পরিধি কমিয়ে অন্যদের ওপর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলে তাঁদের মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন বলেও সূত্রের দাবি। কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ের জন্য নির্দিষ্ট কর্মলক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
এ কারণে ছয় মাসের মূল্যায়নকে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং এই মূল্যায়নের ফলাফল মন্ত্রিসভার ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের পর নতুন সমীকরণ
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় এখন পর্যন্ত বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ১ জুন পদত্যাগ করেন। এরপর ওই মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনকে।
এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে কি নেতৃত্ব পরিবর্তন হতে যাচ্ছে? সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে এমন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মন্ত্রিসভায় ২৪ জন মন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। এর বাইরে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন ১০ জন উপদেষ্টা। সম্ভাব্য রদবদলে কারও দপ্তর পরিবর্তন, কারও দায়িত্ব কমানো এবং নতুন দায়িত্ব দেওয়ার মতো বিষয় সামনে আসতে পারে।
প্রতিমন্ত্রীদের কয়েকজন পেতে পারেন পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব
মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীর পদোন্নতি। সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান ২৩ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্য থেকে কয়েকজনকে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
তবে কারা এই তালিকায় রয়েছেন, সে বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
বিএনপির একাধিক নেতার নাম আলোচনায়
মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত হলে বিএনপির অভ্যন্তর থেকেও কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও রুহুল কবির রিজভী, ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবদিন ফারুক, শামসুজ্জামান দুদু ও ড. আসাদুজ্জামান রিপনের নাম রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরছে।
এ ছাড়া চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়কারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ এবং সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিমের নামও আলোচনায় রয়েছে।
লন্ডন বিএনপির নেতা মাহিদুর রহমান ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবার নামও সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে এসব নামের কোনোটিই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
শরিকদের জন্যও থাকতে পারে সুযোগ
মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এলে বিএনপির বাইরে রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্য থেকেও কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের নাম আলোচনায় রয়েছে।
এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট থেকে আসা কয়েকজন নেতা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। এনডিএম থেকে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। একইভাবে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকিও মন্ত্রিসভায় রয়েছেন।
ফলে ভবিষ্যতে শরিকদের মধ্য থেকে আরও কাউকে সরকারে যুক্ত করা হতে পারে—এমন সম্ভাবনাও রাজনৈতিক মহলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এ বিষয়ে বলেন, মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা শুনছেন, তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই। ব্যক্তি হিসেবে তাঁর প্রত্যাশা না থাকলেও দলীয়ভাবে সরকারের অংশ হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে বলে জানান তিনি।
পার্থকে ঘিরে জল্পনা
সম্ভাব্য নতুন মুখের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের নাম। তাঁর দলীয় নেতাদের একটি অংশের দাবি, খুব শিগগিরই তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন।
তবে এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আবার রাজনৈতিক অঙ্গনের আরেকটি সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
অর্থাৎ ১৭ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নিয়মিতভাবে মন্ত্রীদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে রদবদল কখন হবে, কতজন পরিবর্তনের মুখে পড়বেন কিংবা কারা নতুন করে দায়িত্ব পাবেন—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ছয় মাসের মাথায় পরিবর্তন হতে পারে, আবার প্রয়োজন অনুযায়ী তা এক বছর পরও হতে পারে।
ফলে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পর মন্ত্রিসভার চেহারা কতটা বদলায়, সেটিই এখন রাজনৈতিক মহলের প্রধান আগ্রহের বিষয়। নতুন সরকার ছয় মাসের মূল্যায়নের পর কয়েকজন নতুন মুখ নিয়ে সামনে এগোয়, নাকি বর্তমান কাঠামোতেই বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই কাজ চালিয়ে যায়—চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় এখন সংশ্লিষ্ট সবাই।
বিশেষ প্রতিনিধি: 

























