আজ ০৫:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
১৮০ দিনের মূল্যায়ন শেষে মন্ত্রিসভায় বড় পরিবর্তনের আভাস শ্যামনগরের উপকূলীয় কৈখালী ভূমি অফিসে জরাজীর্ণ টিন সেটে চলছে দুই ইউনিয়নের ভূমি সেবা আশাশুনির তেতুলিয়া-টিকা সড়কের কোদালশাহ স্লুইস গেটে ধস,প্লাবনের শঙ্কায় ১০ গ্রামের মানুষ দেবহাটা-কালিগঞ্জে সরকারি বরাদ্দের টাকা গিলে খাচ্ছে পিআইও মফিজুর ‘তোমরা আমাদের অবাক করে দিয়েছ’, মিরাজকে গিলক্রিস্ট ট্রলের ‘লর্ড শান্ত’ এখন সত্যিকারের ‘লর্ড’ সাতক্ষীরায় জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উপলক্ষে আলোচনা সভা, র‍্যালি মৎস্য পোনা অবমুক্তকরণ ও পুরস্কার বিতরণ সাতক্ষীরায় বল্লী ইউনিয়নে জমিজমা বিরোধের জেরে নারীসহ পরিবারের ওপর হামলায় থানায় লিখিত অভিযোগ চিকিৎসার আশ্বাসে তালায় এনে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় নারীসহ গ্রেপ্তার ২ শ্যামনগরের উপকূলে রাস্তা সংস্কার না হওয়ায় এলাকাবাসী ধান রোপন করে প্রতিবাদ

গভীর নলকূপের চাপে নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, বাড়ছে শঙ্কা

  •  আবু হাসান
  • আপডেট সময়: ০৪:৩১:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ২৩৭ বার পড়া হয়েছে

 দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় দিন দিন বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট। লবণাক্ততার কারণে পুকুর, খাল ও নদীর পানি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ায় অধিকাংশ মানুষ নির্ভর করছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত শত শত গভীর নলকূপ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পানিসংকটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিবছর গড়ে ১ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে পানির স্তর। বিশেষ করে শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ এলাকায় এই প্রবণতা বেশি। আগে যেখানে অল্প গভীরতায় মিঠা পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে আরও গভীরে নলকূপ বসাতে হচ্ছে। এতে খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাও ঝুঁকিতে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানি যে হারে উত্তোলন করা হচ্ছে, সেই তুলনায় পুনর্ভরণ (রিচার্জ) হচ্ছে না। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বৃষ্টির পানিও অনেক সময় পুরোপুরি মাটিতে প্রবেশ করতে পারে না। পাশাপাশি পুকুর ভরাট, খাল দখল ও প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংসের ফলে পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সাতক্ষীরার চারপাশে নদ-নদী থাকলেও অধিকাংশ নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেশি হওয়ায় তা সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা চরম আকার ধারণ করে। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় দৈনিক পানির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সরবরাহের বড় অংশই এখনো ভূগর্ভস্থ উৎসনির্ভর। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি সরবরাহের চেষ্টা করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।

গভীর থেকে পানি তুলতে বিদ্যুৎ খরচ, যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে। এতে পানি সরবরাহ প্রকল্প পরিচালনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক এলাকায় পানির মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে—কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও লোহা বেশি, আবার কোথাও পানির চাপ কম।

পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু নলকূপ স্থাপন করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সাতক্ষীরার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও খাল পুনঃখনন এবং লবণাক্ত পানি শোধনের মাধ্যমে বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে।

স্থানীয় পরিবেশবিদদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চিংড়ি চাষে লবণ পানি ব্যবহারের কারণেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এতে ভবিষ্যতে মিঠা পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, সাতক্ষীরার অনেক এলাকায় খোলা মাটির জায়গা কমে যাচ্ছে এবং অপরিকল্পিত বসতি গড়ে উঠছে। ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে ঢোকার সুযোগ কমে যাচ্ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে বাধা সৃষ্টি করছে।

তাদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে সাতক্ষীরার মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সংকট ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই সময় থাকতেই বিকল্প উৎসের উন্নয়ন এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

গ্রীষ্ম মৌসুমে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। তখন গভীর নলকূপের ওপর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে জেলার অধিকাংশ নিরাপদ পানির উৎসই ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর, যা সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

ট্যাগস:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

১৮০ দিনের মূল্যায়ন শেষে মন্ত্রিসভায় বড় পরিবর্তনের আভাস

গভীর নলকূপের চাপে নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, বাড়ছে শঙ্কা

আপডেট সময়: ০৪:৩১:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

 দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় দিন দিন বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট। লবণাক্ততার কারণে পুকুর, খাল ও নদীর পানি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ায় অধিকাংশ মানুষ নির্ভর করছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত শত শত গভীর নলকূপ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পানিসংকটের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলায় প্রতিবছর গড়ে ১ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে পানির স্তর। বিশেষ করে শ্যামনগর, আশাশুনি ও কালীগঞ্জ এলাকায় এই প্রবণতা বেশি। আগে যেখানে অল্প গভীরতায় মিঠা পানি পাওয়া যেত, এখন সেখানে আরও গভীরে নলকূপ বসাতে হচ্ছে। এতে খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি নিরাপদ পানির প্রাপ্যতাও ঝুঁকিতে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ পানি যে হারে উত্তোলন করা হচ্ছে, সেই তুলনায় পুনর্ভরণ (রিচার্জ) হচ্ছে না। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বৃষ্টির পানিও অনেক সময় পুরোপুরি মাটিতে প্রবেশ করতে পারে না। পাশাপাশি পুকুর ভরাট, খাল দখল ও প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংসের ফলে পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সাতক্ষীরার চারপাশে নদ-নদী থাকলেও অধিকাংশ নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেশি হওয়ায় তা সরাসরি ব্যবহারযোগ্য নয়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা চরম আকার ধারণ করে। ফলে বাধ্য হয়ে মানুষ গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় দৈনিক পানির চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সরবরাহের বড় অংশই এখনো ভূগর্ভস্থ উৎসনির্ভর। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি সরবরাহের চেষ্টা করা হলেও তা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।

গভীর থেকে পানি তুলতে বিদ্যুৎ খরচ, যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে। এতে পানি সরবরাহ প্রকল্প পরিচালনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে অনেক এলাকায় পানির মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে—কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও লোহা বেশি, আবার কোথাও পানির চাপ কম।

পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু নলকূপ স্থাপন করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সাতক্ষীরার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও খাল পুনঃখনন এবং লবণাক্ত পানি শোধনের মাধ্যমে বিকল্প উৎস তৈরি করতে হবে।

স্থানীয় পরিবেশবিদদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং চিংড়ি চাষে লবণ পানি ব্যবহারের কারণেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। এতে ভবিষ্যতে মিঠা পানির সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, সাতক্ষীরার অনেক এলাকায় খোলা মাটির জায়গা কমে যাচ্ছে এবং অপরিকল্পিত বসতি গড়ে উঠছে। ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে ঢোকার সুযোগ কমে যাচ্ছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধারে বাধা সৃষ্টি করছে।

তাদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে সাতক্ষীরার মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সংকট ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই সময় থাকতেই বিকল্প উৎসের উন্নয়ন এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

গ্রীষ্ম মৌসুমে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদা আরও বেড়ে যায়। তখন গভীর নলকূপের ওপর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বর্তমানে জেলার অধিকাংশ নিরাপদ পানির উৎসই ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর, যা সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।