সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে অর্থ আদায়, কাজ পরিদর্শনের নামে টাকা নেওয়া এবং ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেওয়া মোটরসাইকেল চালককে দিয়ে প্রকল্পের কাজ তদারকির অভিযোগ উঠেছে।
ওই মোটরসাইকেল চালক আরশাদ আলীকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কালিগঞ্জে যোগদানের পর থেকেই নলতা ইউনিয়নের আরশাদ আলী নামে এক মোটরসাইকেল চালককে নিয়মিত নিজের সঙ্গে রাখছেন পিআইও মফিজুর রহমান। তিনি পিআইওকে মোটরসাইকেলে বহন করার পাশাপাশি বিভিন্ন ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও অন্যান্য প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ওই চালকের মাধ্যমে টাকা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
ভাড়াশিমলা ইউনিয়ন পরিষদের এক সদস্য অভিযোগ করে বলেন, পিআইও মফিজুর রহমান অনেক সময় নিজে প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনে না গিয়ে তার মোটরসাইকেল চালক আরশাদ আলীকে পাঠিয়ে দেন। একবার আরশাদ আলী গিয়ে তাকে বলেন, ‘স্যার আমাকে কাজের অগ্রগতি দেখার জন্য পাঠিয়েছেন।’ এরপর তার কাছে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পিআইওর কাছের লোক হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাকে হয়রানির হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ওই ইউপি সদস্য।
তিনি বলেন, বাধ্য হয়ে আরশাদ আলীকে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তার অভিযোগ, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বিল দেওয়ার আগেই পিআইও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ টাকা কেটে নেন। এরপর আবার কাজ পরিদর্শনের নামে তার মোটরসাইকেল চালককে পাঠিয়ে টাকা নেওয়া হলে সরকারি বরাদ্দের অর্থ দিয়ে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের এক প্যানেল চেয়ারম্যান অভিযোগ করে বলেন, ‘মোটরসাইকেল চালক আরশাদ আলী ছাড়া পিআইও মফিজুর রহমান কিছু বোঝেন না। যেখানেই যান, তাকে সঙ্গে নিয়ে যান। প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনে গেলে কাজের ধরন অনুযায়ী ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত তার মাধ্যমে নেওয়া হয়।
ওই প্যানেল চেয়ারম্যান আরও বলেন, একসময় হাসতে হাসতে পিআইও মফিজুর রহমানকে তিনি প্রশ্ন করেন, সরকারি বরাদ্দ থেকে যদি একটি অংশ নেওয়া হয়, তাহলে কাজ পরিদর্শনের সময় আবার টাকা কোথা থেকে দেবেন। জবাবে পিআইও তাকে বলেন, তার মোটরসাইকেল চালক আরশাদ আলীকে মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। সরকার তাকে কোনো গাড়ি দেয়নি। সাইড পরিদর্শনে এলে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছ থেকে নেওয়া টাকা দিয়েই চালকের বেতন দিতে হয় বলেও পিআইও মন্তব্য করেন বলে দাবি করেন ওই প্যানেল চেয়ারম্যান।
বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের এক নারী সদস্য বলেন, ‘পিআইও অফিসে গেলেই আরশাদ আলীকে সেখানে দেখা যায়। তার কাজ হলো পিআইও সাহেবকে মোটরসাইকেলে বহন করা। এজন্য তাকে মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয় বলে শুনেছি।
তিনি অভিযোগ করেন, পিআইও নিজের বেতন থেকে যদি ওই টাকা দিতেন, তাহলে প্রকল্পের কাজ থেকে টাকা নেওয়ার প্রশ্ন উঠত না। কিন্তু প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে টাকা কেটে নিয়ে ওই চালককে বেতন দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। পিআইওর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও চেয়ারম্যান-মেম্বাররা প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিযোগ করলে ভবিষ্যতে ইউনিয়নে সরকারি বরাদ্দ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ পিআইও অফিসের মাধ্যমে আসে।
এদিকে পিআইওর মোটরসাইকেল চালক আরশাদ আলীর কাছে তার বেতনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পিআইও স্যার যে টাকা দেন, তা দিয়ে খেয়ে-পরে ভালোই চলে যায়। স্যার অনেক বড় মনের মানুষ, এজন্য তার কাছেই আমি পড়ে আছি।
তার বেতন পিআইও নিজের অর্থ থেকে দেন কি না জানতে চাইলে আরশাদ আলী বলেন, ‘স্যার কি নিজের টাকা দিয়ে আমার বেতন দেন? চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছ থেকে নিয়ে তো আমার বেতন দেন।
তবে প্রকল্প পরিদর্শনের নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে পিআইও মফিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারী ইউপি সদস্য ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যের অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে পিআইও মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
স্টাফ রিপোর্টার, 


















