মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অন্যকে কষ্ট দেওয়া, অপমান করা, গীবত করা কিংবা অন্যায়ভাবে কারও সম্মানহানি করা ইসলামে নিন্দনীয় কাজ। একজন মানুষের কথা, আচরণ ও কর্মকাণ্ডে অন্যের মনে আঘাত সৃষ্টি হলে তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে জবাবদিহির বিষয় রয়েছে। তাই মুমিনের উচিত নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি না করা এবং মানুষের অধিকার ও সম্মান রক্ষা করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا
অর্থ: ‘যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের কোনো অপরাধ ছাড়াই কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’
—সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ৫৮
কথার মাধ্যমে অন্যকে কষ্ট দেওয়া
মানুষকে আঘাত করার অন্যতম মাধ্যম হলো মুখের কথা। গালি দেওয়া, অপমান করা, কটূক্তি, উপহাস, মিথ্যা অপবাদ ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মাধ্যমে অন্যের মনে গভীর কষ্ট তৈরি হতে পারে। ইসলামে এসব আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ
অর্থ: ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসিকি এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৪
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, একজন মুসলমানের প্রতি অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি। রাগের সময়ও নিজের কথাবার্তা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। কারণ একটি অসতর্ক মন্তব্য অন্যের মনে দীর্ঘস্থায়ী আঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
গীবত ও অপবাদ থেকে বেঁচে থাকা
ইসলামে গীবত ও অপবাদকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারও অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষের কথা বলা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে, তা গীবতের অন্তর্ভুক্ত। আর কোনো ব্যক্তির মধ্যে নেই এমন দোষ তার নামে প্রচার করা হলো অপবাদ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) গীবতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন—
أَتَدْرُونَ مَا الْغِيبَةُ؟ قَالُوا اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ
অর্থ: ‘তোমরা কি জান, গীবত কী? … তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ
অর্থ: ‘তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দ কর।’
—সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২
এই আয়াতে গীবতের ভয়াবহতা বোঝাতে অত্যন্ত কঠিন একটি উপমা ব্যবহার করা হয়েছে। তাই কারও অনুপস্থিতিতে তার সম্মানহানি হয় এমন কথা বলা থেকে প্রত্যেকের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কাউকে উপহাস ও অপমান করা নিষিদ্ধ
কোনো মানুষকে তার চেহারা, দুর্বলতা, আর্থিক অবস্থা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে উপহাস করা ইসলামে নিষিদ্ধ। কাউকে ছোট করা বা অপমানজনক নামে ডাকার মাধ্যমে তার মনে কষ্ট সৃষ্টি হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَىٰ أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ
অর্থ: ‘হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’
—সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১১
একই আয়াতে একে অপরকে মন্দ নামে ডাকা থেকেও নিষেধ করা হয়েছে। মানুষের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করা তাই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা।
চোগলখুরীর ভয়াবহ পরিণতি
একজনের কথা অন্যজনের কাছে এমনভাবে পৌঁছে দেওয়া, যার ফলে মানুষের মধ্যে বিবাদ ও সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তা চোগলখুরীর অন্তর্ভুক্ত। ইসলামে এ ধরনের আচরণ থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ
অর্থ: ‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’
—সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৫৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৫
এ ছাড়া হাদিসে চোগলখুরী ও মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টির মতো কাজের কারণে কবরের শাস্তির কথাও উল্লেখ রয়েছে। তাই অন্যের কথা বহন করে সম্পর্ক নষ্ট করা এবং মানুষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
মানুষের হক নষ্ট করলে কেয়ামতে নিঃস্ব হতে পারেন
ইসলামে মানুষের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণনা করেছেন। এতে এমন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে দুনিয়ায় অনেক ইবাদত করলেও মানুষের ওপর জুলুম ও অন্যায় করার কারণে কেয়ামতের দিন নিঃস্ব হয়ে যেতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
‘আমার উম্মতের মধ্যে প্রকৃত নিঃস্ব সে ব্যক্তি, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কাউকে হত্যা করেছে বা কাউকে মারধর করেছে। এরপর তার নেক আমল থেকে একে একে ক্ষতিগ্রস্তদের দিয়ে দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮১
এই হাদিসে মানুষের অধিকার নষ্ট করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত করলেই মানুষের প্রতি করা অন্যায়ের বিষয়টি উপেক্ষিত হবে না। অন্যের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং জুলুম থেকে বিরত থাকা একজন মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
অন্যায় করলে ক্ষমা চাওয়া জরুরি
কোনো ব্যক্তির প্রতি অন্যায় করা হলে তা সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। কারও সম্মানহানি, সম্পদ আত্মসাৎ কিংবা অন্য কোনো অধিকার নষ্ট করে থাকলে আল্লাহর কাছে তওবা করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী তার কাছে ক্ষমা চাওয়াও প্রয়োজন হতে পারে।
মানুষের হৃদয়ে আঘাত সৃষ্টি করা সহজ হলেও সেই কষ্ট দূর করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই কথা বলার আগে চিন্তা করা উচিত, নিজের বক্তব্য বা আচরণে অন্য কেউ অকারণে কষ্ট পাচ্ছেন কি না।
একজন মুমিনের উচিত গালিগালাজ, গীবত, অপবাদ, উপহাস ও চোগলখুরী থেকে নিজেকে দূরে রাখা। একই সঙ্গে মানুষের সম্মান, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় সচেতন থাকা। সুন্দর কথা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মশাল নিউজ(বিশেষ প্রতিনিধি) 





















