দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণায় স্বস্তি ও আনন্দ বিরাজ করছে সরকারি কর্মীদের মধ্যে। নবম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পেনশনেও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি আনা হয়েছে।
তবে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বেসরকারি খাতের কর্মী ও উদ্যোক্তারা। তাদের আশঙ্কা, মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসায় বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে। এর ফলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেকেই মনে করছেন, শুধু সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ালে আয়বৈষম্য আরও স্পষ্ট হতে পারে। তাদের মতে, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী সরকারি চাকরির বাইরে কর্মরত। তাই জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতেও আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, দেশে বেতন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িভাড়া, পরিবহন ব্যয়সহ বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামও অনেক সময় বেড়ে যায়। ফলে আয় বাড়লেও বাড়তি অর্থের প্রকৃত সুফল অনেকের কাছে পৌঁছায় না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে।
এদিকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগে ধীরগতি এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যেও। তাদের আশঙ্কা, সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির পর বেসরকারি শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে।
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার শিল্প খাতের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় ইতোমধ্যে বেড়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন অবস্থায় অতিরিক্ত মজুরি ব্যয় বহন করা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। তা না হলে বেতন বৃদ্ধির সুফল একাংশ পেলেও বৃহৎ জনগোষ্ঠী জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চাপে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি দুর্বল থাকা অবস্থায় বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সরকারি কর্মীদের তুলনায় বেসরকারি খাতের কর্মী ও নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং কর্মসংস্থান তৈরির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী, সরকারি চাকরির ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের পেনশনও ৫৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো গত জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
সরকারি কর্মীদের জন্য এই বেতন বৃদ্ধি স্বস্তি আনলেও এর সুফল যেন মূল্যস্ফীতির কারণে ম্লান হয়ে না যায়, সে জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ প্রতিনিধি 











