উপকূলীয় অঞ্চলে একসময় অন্তাখালী খালটি ছিল এলাকার কৃষক ও প্রকৃতির অন্যতম ভরসা। বর্ষার মৌসুমে পানি ধরে রাখা, শুষ্ক মৌসুমে সেচের চাহিদা মেটানো এবং দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত অন্তাখালী খাল। সময়ের সঙ্গে নানা কারণে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে একদিকে কৃষকের সেচসংকট বাড়ে, অন্যদিকে কমতে থাকে খালের জীববৈচিত্র্য। এছাড়াও বর্ষার মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
পুনঃখননের পর সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। খালে পানি ধারণক্ষমতা বেড়েছে, তৈরি হয়েছে সেচের নতুন সুযোগ। এতে শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের পাতাড়াখোলা ও অন্তাখালী গ্রামের হাজার হাজার কৃষক পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন আশার সঞ্চার। কৃষকের কাছে খালটি এখন শুধু একটি দেশীয় প্রজাতির মাছের জলাধার নয়, বরং বছরজুড়ে ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনার প্রতীক।
অন্তাখালী খালেতে ছিপ বাইতে দেখাযায় ছকিনা বিবিকে। তাঁর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আগে খালে ছিপ বাইতে দিতে না। খালটি খনন করে অবমুক্ত করে দেওয়ার পর থেকে ছিপ বেয়ে মাছ ধরে পরিবারে মাছের চাহিদা মিটাই। মাছ কেনা লাগে না।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পাতাড়াখোলা ও অন্তাখালী গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অন্তাখালী খালটি ২০২৫ সালে পুনঃখনন করা হয়। পাতাড়াখোলা গ্রামের মোতালেব হুজুরের বাড়ি থেকে অন্তাখালী গ্রামের খলিল গাজীর বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মিটার দীর্ঘ খালটি পুনঃখননের ফলে পানি সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খালে সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে শুষ্ক মৌসুমেও কৃষিকাজ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা ও পানির সংকট যখন কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন খাল পুনঃখনন স্থানীয় কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে।
খালের পানি সংরক্ষণ করে বছরব্যাপী জলবায়ু সহনশীল সবজি ও বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে খালে দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণেরও সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষির পাশাপাশি স্থানীয় জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও ভূমিকা রাখবে এই খাল।
স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলাম ও আব্দুল সবুর বলেন, উপকূলীয় এলাকায় কৃষিকাজ অনেকটাই পানির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার শেষে খালে পানি না থাকলে সেচের জন্য বাড়তি খরচ করতে হয়। আবার লবণাক্ততার কারণে অনেক সময় মিঠা পানির সংকট দেখা দেয়। খালে পানি ধরে রাখা গেলে সেচের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি ফসলের আবাদ বাড়ানো সম্ভব হবে।
স্থানীয় কৃষক সুবেন্দ্রনাথ মন্ডল বলেন, অন্তাখালী খালটি দীর্ঘ বছর ধরে দখলদারদের দখলে ছিলো। তা ছাড়াও খালটি প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছিল। খালটি পুনঃখনন করে দখলদারদের হাত থেকে দখল মুক্ত করে, সর্বসাধারণের জন্য অবমুক্ত করা দেওয়ায় কয়েক হাজার মানুষ উপকৃত হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষাণী আনোয়ারা বেগম এর ভাষ্য, খালটি পুনঃখনন করে অবমুক্ত করায় অন্তাখালী বিলের কয়েক হাজার বিঘা জমি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। এবং খালের মিষ্টি পানি ব্যবহার করে এলাকাবাসি সবজি চাষ করছে, মাছ ধরে খাচ্ছে ও খালের পাড়ে ছাগল, গরু ও ভেড়া পালন করছে। এছাড়াও খালের পানি ব্যবহার করে গরমের মৌসুমে কৃষকেরা শতশত বিঘা ধান চাষ করতে পারবে।
অপরদিকে রমজাননগর ইউনিয়নের আটকাটা খালে দেখা মেলে ভিন্ন চিত্র। নামে খাল থাকলেও বিল সমান হয়ে গেছে খননের অভাবে। ফলে পানি সড়ার জায়গা না থাকায় জলাবদ্ধতা হয়ে হাজারো বিঘা কৃষি জমির বীজতলাসহ ধান নষ্ট হচ্ছে। অন্তাখালী খালের মতো আটকাটা খালটি পুনঃখননের দাবি এলাকাবাসীর। এছাড়াও আটকাটা খাল ও অন্তাখালী খালের সংযোগ স্থলে কালভার্ট নির্মাণের দাবিও জানান তারা।
আতিয়ার গাজী, সিরাজুল গাজী, আইজ উদ্দিনসহ স্থানীয় কৃষক-কৃষাণীরা বলেন, খাল থাকলেও দখলদারদের কবলে ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবছর। এখন খাল আর খাল নেই বিল সমান হয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর বর্ষার মৌসুমে দুই তিনবার করে অন্য এলাকা থেকে ধানের চারা কিনে এনে রোপণ করতে হয়ে। সরকারের কাছে আটকাটা খালটি পুনঃখনন দাবি জানাই। খালটি খনন হলে কয়েক হাজার কৃষক উপকৃত হবে।
লেখক-গবেষক পীযুষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, উপকূলীয় জনপদে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত দিন দিন বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় স্থানীয় জলাধার ও খালগুলোকে পুনরুদ্ধার করা কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্তাখালী খালের পুনঃখনন সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ। একসময় যে খালটি হারিয়ে যেতে বসেছিল, পুনঃখননের পর সেটিই আবার পানি ধরে রাখার সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। সেই পানিকে ঘিরে কৃষকের মাঠে নতুন ফসলের স্বপ্ন, জলজ প্রাণের নিরাপদ আশ্রয় এবং ভবিষ্যতের টেকসই কৃষির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
শ্যামনগর প্রতিনিধি: 











