সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্যর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া কাজের অগ্রগতি যথাযথভাবে যাচাই না করে বিল ছাড়ে অনীহা এবং বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ঠিকাদার ও জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রকল্পের বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে প্রথমে ২০ শতাংশ কমিশন দাবি করা হলেও পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে ১১ শতাংশ কমিশন দেওয়ার শর্তে বিল ছাড়ের কথা জানানো হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কালিগঞ্জ উপজেলার ধলবাড়িয়া, রতনপুর ও বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিনটি প্রকল্পে দুই প্যাকেজে ইটের সোলিং রাস্তা ও প্লাসাইডিংয়ের জন্য প্রায় ৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের কাজ নিয়ে মাঠপর্যায়ে যথাযথ তদারকির ঘাটতি এবং কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বিল ছাড়ের জন্য পিআইও মফিজুর রহমান প্রথমে ২০ শতাংশ কমিশন দাবি করেন। পরে দর-কষাকষির মাধ্যমে ১১ শতাংশ কমিশন দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে পিআইও মফিজুর রহমান বলেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ না হলে বরাদ্দের টাকা ফেরত যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তৎকালীন অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহা বিলে স্বাক্ষর করলেও কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিল ছাড়বেন না।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের অভিযোগ, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন আদায়ের কারণে পিআইও মফিজুর রহমান অফিসে ‘মিস্টার পার্সেন্টেজ’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের কয়েকজন জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, দৃশ্যমান উন্নয়নকাজের পাশাপাশি কিছু প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে কাজের বাস্তব অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই না করেও নানা প্রক্রিয়ায় বিল সংক্রান্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
তাদের অভিযোগ,পিআইও কার্যালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা স্বপন নামের এক স্কুল কর্মচারী বিভিন্ন প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ তদারকি ও কমিশন আদায়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। তিনি উকশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে পিআইও কার্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত ও কাজ করার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া এডিবি, উন্নয়ন সহায়তা, টিআর, কাবিখা, কাবিটা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পের রাস্তা, কালভার্ট, ব্রিজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির ও খাল খননসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিআইও মফিজুর রহমানকে বহনের জন্য আরশাদ নামে এক ব্যক্তিকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা বেতনে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, ওই ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় ও কর্মকাণ্ড নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা রয়েছে।
গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে পিআইও মফিজুরের বিরুদ্ধে। তথ্য চাইতে গেলে সাংবাদিকদের এড়িয়ে যাওয়া এবং দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী।
গত ২ আগস্ট একজন সংবাদকর্মী তথ্য অধিকার আইনে আবেদন নিয়ে পিআইও কার্যালয়ে গেলে আবেদন গ্রহণ না করে তাকে লাঞ্ছিত ও দুর্ব্যবহার করে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগের পর গত ৩১ আগস্ট সাতক্ষীরা জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বিষয়টি তদন্ত করেন। অভিযোগকারীর দাবি, তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় পিআইও মফিজুর রহমানকে কঠোরভাবে ভৎসনা করা হয়েছে।
পিআইও কার্যালয়ের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পিআইও স্যারের কাছ থেকে কাজ আদায় করতে হলে আগে তার ‘পাওনা’ বুঝিয়ে দিতে হয়। পার্সেন্টেজ পেলেই হলো মাঠপর্যায়ে কাজ ঠিকমতো হয়েছে কি না, সেটি তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না।
এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার বলেন, টাকা ছাড়া পিআইও কোনো ফাইল সই করেন না। আমরা ঘুষের বিষয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছি ঠিকই, কিন্তু চাহিদার হার অনেক বেশি। এভাবে চললে কাজ করব নাকি কমিশন দেব সেটিই বুঝতে পারছি না।
তবে এসব অভিযোগও অস্বীকার করেছেন পিআইও মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও মনগড়া।
কালিগঞ্জ উপজেলার সদ্য অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শ্যামানন্দ বলেন, কাজ বাস্তবায়ন না করে বিল পাসের সুযোগ নেই। এটি চরম অন্যায়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও সেসব অর্থের যথাযথ ব্যবহার ও মাঠপর্যায়ে কাজের মান নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই কালিগঞ্জের পিআইও মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা কমিশন বাণিজ্য, প্রকল্প তদারকি এবং বিল ছাড় সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
স্টাফ রিপোর্টার, 














