আজ ১১:৩৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
আশাশুনিতে ১০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও নগদ টাকাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার সাতক্ষীরায় আলিপুর চেকপোস্টে খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত তালেবানের পাঁচ বছর: ক্ষমতা সুসংহত, সংকট কাটেনি আফগানিস্তানের ‎ধুলিহরে পৃথক দুইটি মুদি দোকানে চুরি! ‎ডুমুরিয়াকে আবাসন এলাকা হিসেবে গড়তে চাই ,,,,,, কেডিএ চেয়ারম্যান সাভারে ‌‘প্রেশারকুকার বোমা’ নিষ্ক্রিয় করল পুলিশের বিশেষ টিম সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও উন্নতি হবে: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী শ্যামনগরে তিন লক্ষ টাকা অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ, আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট গরুর ক্ষুরারোগ এবং ছাগল-ভেড়ার পিপিআর রোগ প্রতিরোধে বিনামূল্যে টিকাদান জীবন ও সময় যেভাবে বরকতময় হয়

তালেবানের পাঁচ বছর: ক্ষমতা সুসংহত, সংকট কাটেনি আফগানিস্তানের

  • রিপোর্টার
  • আপডেট সময়: ০৩:১৩:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তালেবান সরকারের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে দেশটিতে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি যেমন শেষ হয়েছে, তেমনি তালেবানবিরোধী বড় কোনো সশস্ত্র শক্তিও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারেনি। ফলে আফগানিস্তানের অধিকাংশ ভূখণ্ডে তালেবানের নিয়ন্ত্রণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত।

তবে স্থিতিশীলতার এই চিত্রের আড়ালে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের শিক্ষা, চাকরি ও জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তালেবান শাসনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হয়ে উঠেছে।

কাবুলে প্রশাসন, সিদ্ধান্তের কেন্দ্র কান্দাহার

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা মূলত কান্দাহার থেকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন। ক্ষমতা দখলের পর গত পাঁচ বছরে তিনি তালেবানকে একটি শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছেন।

কাবুলে প্রধানমন্ত্রী মোল্লা আবদুল গনি বারাদার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাওলভি ইয়াকুব এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কান্দাহারের নেতৃত্বের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তালেবানের নিয়ন্ত্রণ কেবল নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রশাসনিক পদ, আর্থিক সুবিধা, আদর্শগত আনুগত্য এবং বিভিন্ন শ্রেণির অনুসারীদের জন্য পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থাও তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দেশটির হাজার হাজার মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বেতন-ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থাকেও এই সাংগঠনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থনীতিতে স্বস্তির বদলে দীর্ঘ সংকট

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর আফগান অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়ে। তালেবান ক্ষমতায় আসার আগে দেশটির সরকারি ব্যয়ের বড় অংশই আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সহায়তা ব্যাপকভাবে কমে যায়। পাশাপাশি আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সম্পদও আটকে রাখা হয়।

পরবর্তী সময়ে তালেবান সরকার শুল্ক আদায় এবং দেশের খনিজ সম্পদ থেকে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। এতে সরকারি আয় কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রত্যাশিত সুফল পৌঁছায়নি।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আফগান অর্থনীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার কমে প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক আফগান নাগরিক ফিরে আসায় কর্মসংস্থান, খাদ্য ও বাসস্থানের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

নারীদের অধিকার সবচেয়ে বড় সংকট

তালেবান সরকারের শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সমালোচনা হয়েছে নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতা সীমিত করার কারণে।

মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যত বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের পড়াশোনার সুযোগও নেই। কর্মক্ষেত্র, চলাচল এবং জনপরিসরে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীদের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

এই নীতির প্রভাব শুধু সামাজিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, নারীদের শ্রমবাজার থেকে দূরে রাখার কারণে আফগান অর্থনীতি প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে।

নারীদের ওপর এই নীতির কারণে তালেবান নেতৃত্বের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যক্রমে তালেবান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নারীদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ গুরুত্ব পেয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন

তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পাকিস্তান প্রথমদিকে বিষয়টিকে নিজেদের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দুই দেশের সম্পর্কের দৃশ্যপট বদলে যায়।

পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে এবং তালেবান তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তালেবান অবশ্য টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

এই বিরোধের জেরে সীমান্তে সংঘর্ষ, সীমান্তপথ বন্ধ এবং আফগান নাগরিকদের পাকিস্তান থেকে ফেরত পাঠানোর ঘটনা বেড়েছে। পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে পাল্টা বিমান হামলাও চালিয়েছে।

টিটিপির সঙ্গে তালেবানের ঐতিহাসিক ও আদর্শগত সম্পর্ক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও তালেবান নেতৃত্বের জন্য একটি জটিল রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংখ্যালঘুদের নিয়েও উদ্বেগ

তালেবান শাসনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে শিয়া ও হাজারা জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও চাপের মুখে রয়েছে বলে মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং ধর্মীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সালাফি মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধেও তালেবান প্রশাসনের অভিযান পরিচালনার খবর পাওয়া গেছে।

ফলে তালেবানের কঠোর আদর্শিক শাসনব্যবস্থা দেশটির বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য

পাঁচ বছর পর সামরিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে তালেবান আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। বড় কোনো সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী এখন পর্যন্ত এমন অবস্থান তৈরি করতে পারেনি, যা তালেবানের দেশব্যাপী নিয়ন্ত্রণকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে দেশের ভেতরেই। তালেবান নেতৃত্বের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মতপার্থক্যের খবর যেমন রয়েছে, তেমনি দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, খাদ্য ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

রাশিয়া, চীন ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তালেবানের বাস্তবভিত্তিক যোগাযোগ কিছু অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাব এবং নারী ও মানবাধিকারের বিষয়ে কঠোর নীতি তালেবান সরকারকে এখনো আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে তালেবান আফগানিস্তানে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সফল হলেও সাধারণ আফগানদের জন্য স্থিতিশীলতা এখনো সমৃদ্ধি বা অধিকারের নিশ্চয়তায় পরিণত হয়নি। রাষ্ট্রের কাঠামো টিকে থাকলেও তার মূল্য দিতে হচ্ছে অর্থনীতি, মানবাধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

ট্যাগস:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

আশাশুনিতে ১০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও নগদ টাকাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

তালেবানের পাঁচ বছর: ক্ষমতা সুসংহত, সংকট কাটেনি আফগানিস্তানের

আপডেট সময়: ০৩:১৩:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর তালেবান সরকারের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে দেশটিতে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি যেমন শেষ হয়েছে, তেমনি তালেবানবিরোধী বড় কোনো সশস্ত্র শক্তিও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারেনি। ফলে আফগানিস্তানের অধিকাংশ ভূখণ্ডে তালেবানের নিয়ন্ত্রণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংহত।

তবে স্থিতিশীলতার এই চিত্রের আড়ালে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা এবং কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের শিক্ষা, চাকরি ও জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তালেবান শাসনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হয়ে উঠেছে।

কাবুলে প্রশাসন, সিদ্ধান্তের কেন্দ্র কান্দাহার

তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা মূলত কান্দাহার থেকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন। ক্ষমতা দখলের পর গত পাঁচ বছরে তিনি তালেবানকে একটি শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছেন।

কাবুলে প্রধানমন্ত্রী মোল্লা আবদুল গনি বারাদার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হাক্কানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাওলভি ইয়াকুব এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কান্দাহারের নেতৃত্বের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তালেবানের নিয়ন্ত্রণ কেবল নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। প্রশাসনিক পদ, আর্থিক সুবিধা, আদর্শগত আনুগত্য এবং বিভিন্ন শ্রেণির অনুসারীদের জন্য পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থাও তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। দেশটির হাজার হাজার মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বেতন-ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থাকেও এই সাংগঠনিক কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থনীতিতে স্বস্তির বদলে দীর্ঘ সংকট

ক্ষমতা পরিবর্তনের পর আফগান অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়ে। তালেবান ক্ষমতায় আসার আগে দেশটির সরকারি ব্যয়ের বড় অংশই আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সহায়তা ব্যাপকভাবে কমে যায়। পাশাপাশি আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সম্পদও আটকে রাখা হয়।

পরবর্তী সময়ে তালেবান সরকার শুল্ক আদায় এবং দেশের খনিজ সম্পদ থেকে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। এতে সরকারি আয় কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রত্যাশিত সুফল পৌঁছায়নি।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আফগান অর্থনীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও পরবর্তী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার কমে প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক আফগান নাগরিক ফিরে আসায় কর্মসংস্থান, খাদ্য ও বাসস্থানের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

নারীদের অধিকার সবচেয়ে বড় সংকট

তালেবান সরকারের শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক সমালোচনা হয়েছে নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতা সীমিত করার কারণে।

মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যত বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের পড়াশোনার সুযোগও নেই। কর্মক্ষেত্র, চলাচল এবং জনপরিসরে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীদের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

এই নীতির প্রভাব শুধু সামাজিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, নারীদের শ্রমবাজার থেকে দূরে রাখার কারণে আফগান অর্থনীতি প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে।

নারীদের ওপর এই নীতির কারণে তালেবান নেতৃত্বের কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যক্রমে তালেবান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নারীদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ গুরুত্ব পেয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন

তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর পাকিস্তান প্রথমদিকে বিষয়টিকে নিজেদের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দুই দেশের সম্পর্কের দৃশ্যপট বদলে যায়।

পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে এবং তালেবান তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তালেবান অবশ্য টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

এই বিরোধের জেরে সীমান্তে সংঘর্ষ, সীমান্তপথ বন্ধ এবং আফগান নাগরিকদের পাকিস্তান থেকে ফেরত পাঠানোর ঘটনা বেড়েছে। পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে পাল্টা বিমান হামলাও চালিয়েছে।

টিটিপির সঙ্গে তালেবানের ঐতিহাসিক ও আদর্শগত সম্পর্ক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও তালেবান নেতৃত্বের জন্য একটি জটিল রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংখ্যালঘুদের নিয়েও উদ্বেগ

তালেবান শাসনে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে শিয়া ও হাজারা জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য ও চাপের মুখে রয়েছে বলে মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং ধর্মীয় প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সালাফি মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধেও তালেবান প্রশাসনের অভিযান পরিচালনার খবর পাওয়া গেছে।

ফলে তালেবানের কঠোর আদর্শিক শাসনব্যবস্থা দেশটির বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য

পাঁচ বছর পর সামরিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে তালেবান আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। বড় কোনো সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী এখন পর্যন্ত এমন অবস্থান তৈরি করতে পারেনি, যা তালেবানের দেশব্যাপী নিয়ন্ত্রণকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে দেশের ভেতরেই। তালেবান নেতৃত্বের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মতপার্থক্যের খবর যেমন রয়েছে, তেমনি দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান, খাদ্য ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

রাশিয়া, চীন ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তালেবানের বাস্তবভিত্তিক যোগাযোগ কিছু অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অভাব এবং নারী ও মানবাধিকারের বিষয়ে কঠোর নীতি তালেবান সরকারকে এখনো আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে তালেবান আফগানিস্তানে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সফল হলেও সাধারণ আফগানদের জন্য স্থিতিশীলতা এখনো সমৃদ্ধি বা অধিকারের নিশ্চয়তায় পরিণত হয়নি। রাষ্ট্রের কাঠামো টিকে থাকলেও তার মূল্য দিতে হচ্ছে অর্থনীতি, মানবাধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই