আজ ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
ভোমরার হালিম মাস্টারের বিরুদ্ধে মাদক সাম্রাজ্য গড়ার অভিযোগ আশাশুনিতে জলবায়ু সহনশীল উপকূল গড়তে লিডার্সের  উন্নয়ন প্রশিক্ষণ  আশাশুনিতে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে ঘরে ঢুকে নারীদের মারপিট  অনিয়ম-দুর্নীতির গ্যাড়াকলে বিপর্যস্ত নলতা আহছানিয়া মিশন রেসিডেন্সিয়াল কলেজ সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের ‘বিকৃত প্রচারের’ অভিযোগ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের অপসারণ দাবিতে উত্তাল ক্যাম্পাস কালিগঞ্জে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলচেষ্টাও হামলা রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়? এক মাসের মধ্যে শাখরা-কোমরপুর সেতুর সংস্কারকাজ শুরুর ঘোষণা দিলেন আব্দুর রউফ উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক রোকনুজ্জামান রোকনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সাতক্ষীরায় জেলা পরিষদ প্রশাসক হাবিবের সঙ্গে ছাত্রদল নেতাদের শুভেচ্ছা বিনিময়
উপকূল থেকে হাওর—পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় বাড়ছে বন্যা, নদীভাঙন ও কৃষির ঝুঁকি

‘যে রইদ দের, পানি কমাইয়া দিলে মাইনসে কিছু ধান আনতো পারলোনে’

  •  আবু হাসান
  • আপডেট সময়: ০৫:১৪:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
  • ১২২ বার পড়া হয়েছে

“যে রইদ দের, পানি কমাইয়া দিলে মাইনসে কিছু ধান আনতো পারলোনে”—সুনামগঞ্জের মহাসিং নদীর পাগলা বাজারে হাওরের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিলেন খেয়ানৌকার মাঝি রফিক মিয়া। ছয় দিনের কড়া রোদে নদীর পানি অনেকটা নেমে গেলেও বুকসমান পানিতে এখনও ডুবে আছে হাওরের পাকা ধান। কৃষকদের বিশ্বাস, এখনই যদি হাওরের পানি কিছুটা নামানো যায়, তাহলে অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ফসল রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এই আহাজারি শুধু হাওরের নয়; দেশের উপকূল থেকে নদীতীর, সর্বত্রই দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ আজ একই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।

 

বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে বসবাস

 

 

করছে প্রায় ৪ কোটি মানুষ, যারা সরাসরি নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, বেড়িবাঁধ ভাঙন ও লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটারের বেশি প্রতিরক্ষা বেড়িবাঁধ থাকলেও এর বড় একটি অংশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ ও সংস্কারযোগ্য। সামান্য ঘূর্ণিঝড় বা অস্বাভাবিক জোয়ারেই অনেক স্থানে বাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, মিঠা পানির উৎস এবং মানুষের বসতভিটা।

একইভাবে দেশের নদীভাঙন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। প্রতিবছর গড়ে ৫ থেকে ১০ হাজার হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়, আর বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীভাঙনের অন্যতম বড় কারণ নদীর তলদেশে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়া। নদীর গভীরতা কমে গেলে পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়, বর্ষায় অতিরিক্ত স্রোত তীরের ওপর চাপ তৈরি করে, আর তাতেই বাড়ে ভাঙন। বর্তমানে দেশের ২৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি নদীপথের বড় অংশই শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা সংকটে পড়ে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন বড় নদীগুলোর বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং, নদীতীর সংরক্ষণে জিওব্যাগ ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ, এবং নদীর দুই পাড়ের অবৈধ দখল উচ্ছেদ। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে পলি জমে পুনরায় নদী ভরাট না হয়।

দেশের অভ্যন্তরেও পানি নিষ্কাশনের সংকট ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বছরের পর বছর খাল ভরাট ও দখলের কারণে বর্ষার পানি দ্রুত নামতে পারছে না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, আর হাওরাঞ্চলে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই ফসল ডুবে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে এখন নদীর পানি হাওরের তুলনায় আড়াই থেকে তিন ফুট নিচে অবস্থান করছে। কৃষকেরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে এখনো বহু কৃষক কিছু ধান ঘরে তুলতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সময় এসেছে পানি ব্যবস্থাপনাকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখার। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ পুনর্নির্মাণ ও শক্তিশালী করা, দেশের গুরুত্বপূর্ণ খালগুলো পুনঃখনন, বড় নদীগুলোর নিয়মিত খনন ও তীররক্ষা, এবং হাওরাঞ্চলে আধুনিক পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।

হাওরের কৃষকের কণ্ঠে উচ্চারিত “পানি কমাইয়া দিলে” কথাটি আজ পুরো বাংলাদেশের দাবি হয়ে উঠেছে। উপকূলকে জলোচ্ছ্বাস থেকে, নদীতীরকে ভাঙন থেকে, আর কৃষিজমিকে বন্যা থেকে রক্ষা করতে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না গেলে সামনে আরও বড় বিপদের মুখে পড়বে দেশ।  সূত্র : সমকাল, বিভিন্ন এআই মডেল, সম্পর্কিত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট।

অনলাইন ই-পেপার দেখুন : https://e.dakshinermashal.com/

ট্যাগস:

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

ভোমরার হালিম মাস্টারের বিরুদ্ধে মাদক সাম্রাজ্য গড়ার অভিযোগ

উপকূল থেকে হাওর—পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় বাড়ছে বন্যা, নদীভাঙন ও কৃষির ঝুঁকি

‘যে রইদ দের, পানি কমাইয়া দিলে মাইনসে কিছু ধান আনতো পারলোনে’

আপডেট সময়: ০৫:১৪:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬

“যে রইদ দের, পানি কমাইয়া দিলে মাইনসে কিছু ধান আনতো পারলোনে”—সুনামগঞ্জের মহাসিং নদীর পাগলা বাজারে হাওরের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলছিলেন খেয়ানৌকার মাঝি রফিক মিয়া। ছয় দিনের কড়া রোদে নদীর পানি অনেকটা নেমে গেলেও বুকসমান পানিতে এখনও ডুবে আছে হাওরের পাকা ধান। কৃষকদের বিশ্বাস, এখনই যদি হাওরের পানি কিছুটা নামানো যায়, তাহলে অন্তত ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ফসল রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এই আহাজারি শুধু হাওরের নয়; দেশের উপকূল থেকে নদীতীর, সর্বত্রই দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ আজ একই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।

 

বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে বসবাস

 

 

করছে প্রায় ৪ কোটি মানুষ, যারা সরাসরি নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, বেড়িবাঁধ ভাঙন ও লবণাক্ততার ঝুঁকিতে রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটারের বেশি প্রতিরক্ষা বেড়িবাঁধ থাকলেও এর বড় একটি অংশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ ও সংস্কারযোগ্য। সামান্য ঘূর্ণিঝড় বা অস্বাভাবিক জোয়ারেই অনেক স্থানে বাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকে নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি, মিঠা পানির উৎস এবং মানুষের বসতভিটা।

একইভাবে দেশের নদীভাঙন পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। প্রতিবছর গড়ে ৫ থেকে ১০ হাজার হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়, আর বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীভাঙনের অন্যতম বড় কারণ নদীর তলদেশে পলি জমে গভীরতা কমে যাওয়া। নদীর গভীরতা কমে গেলে পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পায়, বর্ষায় অতিরিক্ত স্রোত তীরের ওপর চাপ তৈরি করে, আর তাতেই বাড়ে ভাঙন। বর্তমানে দেশের ২৪ হাজার কিলোমিটারের বেশি নদীপথের বড় অংশই শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা সংকটে পড়ে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন বড় নদীগুলোর বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং, নদীতীর সংরক্ষণে জিওব্যাগ ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাঠামো নির্মাণ, এবং নদীর দুই পাড়ের অবৈধ দখল উচ্ছেদ। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে পলি জমে পুনরায় নদী ভরাট না হয়।

দেশের অভ্যন্তরেও পানি নিষ্কাশনের সংকট ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বছরের পর বছর খাল ভরাট ও দখলের কারণে বর্ষার পানি দ্রুত নামতে পারছে না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, আর হাওরাঞ্চলে সামান্য অতিবৃষ্টিতেই ফসল ডুবে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে এখন নদীর পানি হাওরের তুলনায় আড়াই থেকে তিন ফুট নিচে অবস্থান করছে। কৃষকেরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে পানি বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে এখনো বহু কৃষক কিছু ধান ঘরে তুলতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সময় এসেছে পানি ব্যবস্থাপনাকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখার। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ পুনর্নির্মাণ ও শক্তিশালী করা, দেশের গুরুত্বপূর্ণ খালগুলো পুনঃখনন, বড় নদীগুলোর নিয়মিত খনন ও তীররক্ষা, এবং হাওরাঞ্চলে আধুনিক পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।

হাওরের কৃষকের কণ্ঠে উচ্চারিত “পানি কমাইয়া দিলে” কথাটি আজ পুরো বাংলাদেশের দাবি হয়ে উঠেছে। উপকূলকে জলোচ্ছ্বাস থেকে, নদীতীরকে ভাঙন থেকে, আর কৃষিজমিকে বন্যা থেকে রক্ষা করতে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না গেলে সামনে আরও বড় বিপদের মুখে পড়বে দেশ।  সূত্র : সমকাল, বিভিন্ন এআই মডেল, সম্পর্কিত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট।

অনলাইন ই-পেপার দেখুন : https://e.dakshinermashal.com/