দীর্ঘ ১৭ বছর পর সংস্কার ও নির্মাণকাজ শুরু হলেও সাতক্ষীরা-ভেটখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের ৬২ কিলোমিটার অংশে কাজ চলছে ধীরগতিতে। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩১ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সড়ক কেটে রাখা, পুরোনো সড়কের ইট-পাথর তুলে পাশে রাখা এবং কালভার্ট নির্মাণের জন্য বিকল্প সড়ক তৈরির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সড়ক ব্যবহারকারীরা।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাতক্ষীরা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা থেকে ভেটখালী পর্যন্ত ৬২ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণে বরাদ্দ রয়েছে ৮২২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সড়কটির নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা পূরণ হয়নি। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। কাজটি পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের এক পাশে ঢালাইয়ের কাজ চলছে। অপর পাশে রয়েছে খানাখন্দ। এর মধ্য দিয়েই বাস, ট্রাক, অটোরিকশা ও কাভার্ড ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করছে। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে যানবাহনের গতি কমে গেছে এবং তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা।
নির্মাণকাজের মান নিয়েও রয়েছে স্থানীয়দের অভিযোগ। পারুলিয়া গ্রামের আসাদুজ্জামান বলেন, ইট ও সিমেন্ট কম দেওয়ায় সড়কের পাশের একটি দেয়াল ভেঙে পড়েছিল। নির্ধারিত মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার না করার অভিযোগে একপর্যায়ে স্থানীয়রা কাজ বন্ধ করে দেন।
পারুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওলিয়ার রহমান বলেন, দীর্ঘদিন পর সড়কটির কাজ শুরু হওয়ায় এলাকাবাসী আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু শুরু থেকেই ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ না করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের নজরদারির কারণে কাজের মান কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনো পুরোপুরি মানসম্মত কাজ হচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
দেবহাটার গাজীরহাট এলাকায় দেখা যায়, কালভার্ট নির্মাণের স্থানগুলোতে যান চলাচলের জন্য তৈরি করা হয়েছে বিকল্প সড়ক। কোথাও মাটি, কোথাও ইট-সুরকি দিয়ে তৈরি এসব সড়কের কোনো কোনো অংশ বৃষ্টিতে কাদায় পরিণত হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি পথচারীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
গাজীরহাট এলাকার নেহাল আহমেদ অভিযোগ করেন, নির্মাণকাজে সিমেন্ট কম এবং নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। বর্ষায় সড়কের বিভিন্ন অংশের নির্মাণসামগ্রী উঠে যাওয়ার পর আবার তা সমান করে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, ১৭ থেকে ১৮ বছর পর কাজ শুরু হওয়ার পরও যদি নিম্নমানের নির্মাণ করা হয়, তাহলে সড়কটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
তবে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমডি মাঈনুদ্দীন লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, কোনো নির্মাণসামগ্রী সাইটে আনার আগে তার উৎস অনুমোদন করা হয়। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই তা ব্যবহার করা হচ্ছে।
কালিগঞ্জ সদর উপজেলার মৌতলা এলাকায় দেখা যায়, পুরোনো সড়কের ইট-পাথর তুলে সড়কের দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এতে সড়ক সংকুচিত হয়ে যান চলাচলের গতি কমে গেছে। কালিগঞ্জের নলতা এলাকার কে এম সবুজও সড়কের পাশের দেয়ালের পাইলিংয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সাতক্ষীরা-মুন্সিগঞ্জ সড়কের বাসচালক মিজানুর রহমান বলেন, নির্মাণকাজের কারণে চালকদের দুর্ভোগের শেষ নেই। অনেক স্থানে এক পাশ দিয়ে যানবাহন চালাতে হচ্ছে। এতে যানবাহন হেলে পড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণকাজের কারণে পরিবহন মালিকদেরও লোকসান হচ্ছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিভিন্ন অংশেও নির্মাণকাজ চলতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও নির্মাণ করা সড়কের পাথর উঠে গিয়ে আবারও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সড়কের উন্নয়নকাজ চললেও ব্যবহারকারীদের দুর্ভোগ কমছে না।
কাজের ধীরগতির বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ বলেন, বিভিন্ন জটিলতার কারণে ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজের মেয়াদ ছিল দুই বছর ১১ মাস। তবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রায় দুই বছর সময় নষ্ট হয়েছে। ১১ মাসে কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৩২ শতাংশ। বৈদ্যুতিক খুঁটির কারণে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্যাকেজের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার আশা করা হচ্ছে। নির্মাণকাজ নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক মহাসড়কের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় স্বস্তির আশা করেছিলেন সাতক্ষীরা ও উপকূলীয় এলাকার মানুষ। কিন্তু ধীরগতি, বিভিন্ন স্থানে সড়ক সংকুচিত হয়ে যাওয়া, বিকল্প সড়কের দুরবস্থা এবং নির্মাণকাজের মান নিয়ে ওঠা অভিযোগে সেই স্বস্তি এখনো অধরা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় সাতক্ষীরা-ভেটখালী সড়কের মানুষের এই দুর্ভোগ আর কতদিন চলবে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
স্টাফ রিপোর্টার, 



















