পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন বা লবণাক্ত বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত সুন্দরবন।
যা আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরা জেলায় বিস্তৃত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় এই সুন্দরবন দেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে ঢাল হয়ে রক্ষা করে আসছে।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণে কমিয়ে দেয় এই বিশাল বনভূমি। সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির শ্বাসমূলীয় গাছপালা শক্তিশালী ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের গতিবেগ কমিয়ে দেয়। এতে উপকূলীয় জনপদে বসবাসরত কোটি কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য প্রকৃতি ও প্রাণীকূলের ওপর মানুষের অমানবিক আচার-আচরণে অনেকটা বিপর্যস্ত এই সুন্দরবন। বৃক্ষ নিধন, বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচারসহ নানা কারণে আজ বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য।
সুন্দরবনে গরান, গোলপাতা, সুন্দরী বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। বাঘ, হরিণ, কুমির, সাপসহ নানা প্রাণীর বিচরণও এই বনে লক্ষ্য করা যায়। এই সুন্দরবনে যেসব প্রাণীর বিচরণ রয়েছে, তাদের মধ্যে প্রধান আকর্ষণ হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। যার আদি ও অকৃত্রিম বাসস্থান হলো সুন্দরবনের গহীন অরণ্য। এই প্রাণী মূলত সুন্দরবনকে টিকিয়ে রেখেছে।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে পড়ে মাঝেমধ্যেই প্রাণ হারাতে হচ্ছে সুন্দরবনের বাঘকে। বিগত কয়েক বছরে এমন ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে সুন্দরবনের পূর্ব এবং পশ্চিম রেঞ্জে। যার ফলে দিন দিন বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
তাই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এ বছরের শুরুর দিকে অর্থাৎ ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনে শরকির খালসংলগ্ন বনাঞ্চলে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে একটি বাঘিনী। পরেরদিন ৪ জানুয়ারি ট্রাঙ্কুইলাইজারগান ব্যবহার করে তাকে অচেতন করে খুলনায় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।
এরপর ৬ মাসের চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যায় বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে উঠে। চলতি জুলাই মাসের ১২ জুলাই সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে তাকে অবমুক্ত করা হয়েছে। বাঘটি ছাড়ার সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
তিনি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মত একটা অসুস্থ বাঘকে সুস্থ করে ৬ মাস পরে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হলো। নিশ্চয় এ খবর আমাদের সকলের জন্য অত্যন্ত আনন্দ, গর্ব এবং স্বস্তির। রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণের ইতিহাসে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
বিশেষ করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের এই যৌথ প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আগামীদিনে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষায় এ ধরনের উদ্যোগ যেন আরও গ্রহণ করা হয় এমনটাই আশা এবং প্রত্যাশা।
বন বিভাগের তথ্য মতে, ২০০১ থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত ২৫ বছরে সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে পিটিয়ে ও শিকার করে হত্যা করা হয়েছে ৫৮টি, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ৩০টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে ৩টি বাঘ। এই পরিসংখ্যান থেকে সহজে বোঝা যাচ্ছে, শিকার করে বাঘ হত্যার সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি বাঘ মৃত্যুর ঘটনায় কারণ হিসেবে বার্ধক্য উল্লেখ করা হয়। আর বাঘ লোকালয় প্রবেশ করলে জনগণ যদি পিটিয়ে মারে তাহলে সেটি প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু শিকারিদের পাতা ফাঁদে বাঘের মৃত্যুর খবর খুবই কম উঠে আসে। আর মৃত বাঘ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত করে বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হলেও প্রকৃত কারণ পরবর্তীতে আর প্রকাশ পায় না। এজন্য এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে যেকোন মূল্যে সুন্দরবনের ভেতরে শিকারিদের এই মরণফাঁদ পাতা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। বিভিন্ন সময় এসব শিকারীরা হরিণ শিকার করতে এসব ফাঁদ পেতে রাখে।
যেখানে বাঘ আটকে গিয়ে মারা যায়। আবার অনেক সময় বাঘের চামড়া, হাড়, দাঁত ও মাংসের চড়া মূল্য হওয়ার কারনে তাদের মূল লক্ষ্য থাকে বাঘ শিকার করা। এরা মূলত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্রের একটি অংশ। এজন্য চোরা শিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বন্যপ্রাণী আইনের ৩৬ ধারায় বলা হয়েছে, বাঘ শিকারী বা হত্যাকারী জামিন অযোগ্য হবেন এবং সর্বোচ্চ সাত বছর সর্বনিম্ন দুই বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানা ১ লাখ থেকে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
তাই এই আইনটিও অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। এর পাশাপাশি সুন্দরবনের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা চোরা শিকারীদের ফাঁদে আটকে পড়া বন্যপ্রাণীদের উদ্ধারকাজ যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে করা সম্ভব হয় এ ব্যাপারে বন বিভাগের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। উদ্ধারকারী দল বা রেসকিউ টিমকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উপযোগী করে তুলতে হবে।
দ্রুতগামী জলযানের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তুলতে হবে। তবে সমস্ত সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ের এই ঘটনা আমাদের নতুন করে আশার আলো দেখালো।সবশেষ আহত বাঘিনী উদ্ধারের পর তাকে সুস্থ করে পুনরায় বনে ফিরিয়ে দেওয়া যেমন বড় একটি সাফল্য, তেমনি সদিচ্ছা এবং সঠিক পদক্ষেপে যেকোন পরিস্থিতিতে প্রকৃতির ভারসাম্য যে রক্ষা করা যায়; সেটিও প্রমাণ হলো।
লেখক: রিয়াদ হোসেন, শিক্ষার্থী,
সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।
রিয়াদ হোসেন, 
















