সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার পূর্ব টিকেট থেকে হিজলডাঙ্গা ওয়াপদা বাঁধ হয়ে এল্লারচর বাজার পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণকাজে নিম্নমানের বালু ব্যবহার এবং অবৈধভাবে ড্রেজার (বলগেট) দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি অর্থায়নে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
বিশেষ করে একাধিকবার অভিযোগ জানানোর পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিলন সাহার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলা পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জিওবি অর্থায়নে ৭ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬১ টাকা ব্যয়ে সড়কটির নির্মাণকাজ চলছে। প্রায় ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির কাজ শুরু হয়েছে ২৬ এপ্রিল ২০২৬ এবং চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ১২ এপ্রিল ২০২৭।
প্রকল্পের মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে শাহিদ এন্টারপ্রাইজ (প্রা.) লিমিটেড বয়রা, খুলনা। আর মাঠপর্যায়ে কাজ বাস্তবায়ন করছে সাতক্ষীরার মেসার্স মো. ইকবাল জামাদার অ্যান্ড কনসোর্টিয়াম। স্থানীয়দের অভিযোগ, দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নের ডাঁড়ার খাল এলাকার একটি মৎস্যঘের থেকে প্রায় এক মাস ধরে অবৈধ ড্রেজার মেশিন (বলগেট) ব্যবহার করে ভূগর্ভ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ওই বালু সরাসরি সরকারি সড়ক নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ী ইউনিয়নের শিমুলবাড়ীয়া এলাকার প্রয়াত গোলাম সরোয়ার সরদারের ছেলে সাবু সরদার এবং স্থানীয় আমজাদ সরদারের ছেলে মিজান সরদারের নাম উঠে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, দিনের পর দিন প্রকাশ্যে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো বাধা দেওয়া হচ্ছে না। প্রকল্পের স্টিমেট অনুযায়ী প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ২৭ টাকা (ভ্যাটসহ) নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত মানের বালুর পরিবর্তে ড্রেজার দিয়ে মাত্র প্রায় ৬ টাকা ঘনফুট মূল্যের নিম্নমানের ও কাঁদাযুক্ত বালু উত্তোলন করে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এতে প্রতি ঘনফুটে প্রায় ২১ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ বালুর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় এভাবে নিম্নমানের বালু ব্যবহার করা হলে সরকারের বিপুল অর্থের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তবে প্রকল্পে মোট কত ঘনফুট বালু প্রয়োজন এবং প্রকৃতপক্ষে কতটুকু বালু ব্যবহার করা হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও প্রকল্পের মেজারমেন্ট বুক (এমবি) যাচাই না করে নির্দিষ্ট অঙ্ক আত্মসাতের অভিযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই হিসাব যাচাই করলেই প্রকল্পে প্রকৃত অনিয়মের চিত্র বেরিয়ে আসবে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার অত্যন্ত কাছাকাছি এলাকা থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। ফলে রাস্তার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের জমি ও বসতভিটায় ভাঙন দেখা দিতে পারে। এমনকি বালু উত্তোলনের ফলে ভবিষ্যতে রাস্তা ধসে যাওয়া, মৎস্যঘেরের পাড় ভেঙে পড়া এবং আশপাশের বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের প্রশ্ন সরকার যেখানে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে টেকসই সড়ক নির্মাণ করছে, সেখানে সেই সড়কের নির্মাণসামগ্রী যদি অনিয়ম ও নিম্নমানের উপকরণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়, তাহলে জনগণের অর্থ ব্যয়ের উদ্দেশ্য কতটা সফল হবে? সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে দেবহাটা উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহাকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের পরও ঘটনাস্থলে দৃশ্যমান অভিযান, ড্রেজার জব্দ কিংবা সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
ফলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনের পর দিন অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চললেও তা বন্ধ হচ্ছে না কেন? স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, প্রশাসনের একাংশের নীরবতার সুযোগেই বালু উত্তোলনকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এমনকি ইউএনওকে ম্যানেজ করে বালু উত্তোলন চলছে এমন দাবিও কেউ কেউ করছেন। তবে ইউএনওকে ম্যানেজ করার এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিষয়টি শুধু অবৈধ বালু উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এর সঙ্গে সরকারি প্রকল্পের অর্থ, নির্মাণসামগ্রীর মান এবং সড়কের স্থায়িত্ব সরাসরি জড়িত। তাই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়সারা অভিযান নয়, বরং প্রকল্পের বালু সংগ্রহের উৎস, বালুর মান, পরিমাণ, ক্রয়মূল্য, পরিবহন বিল, ভাউচার ও প্রকল্পের মেজারমেন্ট বুক যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বালু সংগ্রহের বৈধ কাগজপত্র এবং অনুমোদিত উৎসের তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বালু দস্যু মিজান সরদারের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, এলাকার মানুষের কল্যাণে আমি এই কাজ করছি। নিউজ করার দরকার নেই আপনি আসেন চা খাই।
এবিষয়ে সাবু সরদারের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলে, তার ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিলন সাহার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি/তিনি বক্তব্য দিতে পারেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকার সরকারি প্রকল্পে যদি নিম্নমানের বালু ব্যবহার ও অবৈধ উৎস থেকে বালু উত্তোলনের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে উপজেলা প্রশাসন এতদিন কী করেছে? আর অভিযোগ মিথ্যা হলে প্রশাসন প্রকাশ্যে তদন্ত করে তা পরিষ্কার করছে না কেন? এদিকে স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে অবৈধ ড্রেজার বন্ধ করে বালু উত্তোলনের স্থান পরিদর্শন, বালুর মান পরীক্ষা এবং প্রকল্পের নির্মাণকাজের গুণগত মান যাচাই করা হোক।
পাশাপাশি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
স্টাফ রিপোর্টার, 


















