জটিল রোগ নির্ণয় ও বিশেষায়িত চিকিৎসায় বাড়ছে সেবার পরিধি
মোহাম্মদ মুজাহিদ:
সাতক্ষীরায় আধুনিক চিকিৎসাসেবার পরিসর সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সাতক্ষীরা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস)। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয়, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নির্দিষ্ট কিছু রোগের আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে থাইরয়েডের রোগ, ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা ও চিকিৎসা, কিডনির কার্যক্ষমতা নির্ণয়, হরমোন পরীক্ষা এবং বিভিন্ন ধরনের আল্ট্রাসনোগ্রাফির সুযোগ থাকায় প্রতিষ্ঠানটি সাতক্ষীরাসহ আশপাশের এলাকার রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৩ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিউক্লিয়ার মেডিসিন ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসেবার পরিধি নিয়ে কাজ করে আসছে। বর্তমানে পরিচালক হিসেবে ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট যোগদান করেন ডা. নাজমুল হোসেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানের সেবার মানোন্নয়ন ও রোগীদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইনমাসে রোগীদের জন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আল্ট্রাসনোগ্রাফি সেবা। এর মধ্যে সম্পূর্ণ পেট, লিভার, পিত্তথলি, কিডনি ও মূত্রতন্ত্র, প্রোস্টেট, মূত্রথলি, তলপেট এবং গর্ভাবস্থার আল্ট্রাসনোগ্রাফি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ভ্রূণের জন্মগত ত্রুটি শনাক্তকরণ, বায়োফিজিক্যাল প্রোফাইল, থাইরয়েড গ্রন্থি, স্তন ও বগল, অণ্ডথলি ও অণ্ডকোষ, পেশি, অস্থিসন্ধি, চোখ এবং শিশুদের মস্তিষ্কের উচ্চ রেজোলিউশন আল্ট্রাসনোগ্রাফির ব্যবস্থাও রয়েছে। পাশাপাশি যোনিপথে আল্ট্রাসনোগ্রাফি (টিভিএস), ইলাস্টোগ্রাফি এবং কালার ডপলার বা ডুপ্লেক্স আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গের গঠন, টিস্যুর দৃঢ়তা ও রক্তপ্রবাহ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ক্যারোটিড ও ভার্টিব্রাল রক্তনালি, হাত-পা, কিডনি, লিভার, পেটের মহাধমনি এবং অণ্ডকোষের রক্তনালির ডুপ্লেক্স পরীক্ষাও এ সেবার অন্তর্ভুক্ত। রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা ও নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ইমেজিং প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়। ইনমাসে আল্ট্রাসনোগ্রাফির নির্দেশনায় সূক্ষ্ম সূঁচ দিয়ে নমুনা সংগ্রহ (এফএনএসি), কোর নিডল বায়োপসি, থাইরয়েডের সিস্টে ইথানল প্রয়োগ, লিভারের সিস্টে স্ক্লেরোথেরাপি এবং বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা তরল নিষ্কাশনের মতো সেবা রয়েছে। এ ছাড়া ফুসফুসের আবরণে জমে থাকা তরল, পেটের অতিরিক্ত তরল এবং লিভারের ফোঁড়া থেকে তরল নিষ্কাশনসহ প্রয়োজন অনুযায়ী জয়েন্টের ভেতরে ওষুধ বা তরল প্রয়োগের ব্যবস্থাও রয়েছে। এসব প্রক্রিয়া রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পন্ন করা হয়। হরমোনজনিত রোগ নির্ণয়ে ইনমাসে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে থাইরয়েড উদ্দীপক হরমোন (টিএসএইচ), ফ্রি টি৩, ফ্রি টি৪, থাইরোগ্লোবুলিন, থাইরয়েড-সংশ্লিষ্ট অ্যান্টিবডি, লুটিনাইজিং হরমোন (এলএইচ), ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন (এফএসএইচ), টেস্টোস্টেরন, প্রোল্যাকটিন, প্যারাথাইরয়েড হরমোন ও কর্টিসল উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি কার্সিনোএমব্রায়োনিক অ্যান্টিজেন (সিইএ), সিএ ১৫.৩, সিএ ১৯.৯, সিএ ১২৫ এবং সিরাম ক্যালসিয়াম পরীক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন হরমোন পরীক্ষার সমন্বিত প্যাকেজও করা যায়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা সংশ্লিষ্ট রোগের মূল্যায়ন ও পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারেন।
ইনমাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবাক্ষেত্র হলো থাইরয়েড-সংক্রান্ত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা। এখানে থাইরয়েড স্ক্যান, থাইরয়েডের আয়োডিন গ্রহণক্ষমতা পরীক্ষা বা আপটেক স্টাডি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হরমোন পরীক্ষার সমন্বিত ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া সম্পূর্ণ শরীরের আই-১৩১ থাইরয়েড স্ক্যান এবং চিকিৎসা-পরবর্তী রোগীদের ফলোআপের জন্য নির্দিষ্ট পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। থাইরয়েড ক্যানসারের অস্ত্রোপচার-পরবর্তী চিকিৎসায় চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন মাত্রায় আই-১৩১ প্রয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রেভস ডিজিজ, অতিসক্রিয় থাইরয়েড নডিউল এবং বহুগুটিযুক্ত অতিসক্রিয় থাইরয়েড গয়টারের ক্ষেত্রেও রেডিও-আয়োডিন চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ধরনের চিকিৎসা রোগীর অবস্থা, পরীক্ষার ফলাফল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়।
কিডনির কার্যক্ষমতা নির্ণয় এবং বিভিন্ন সমস্যার মূল্যায়নে ইনমাসে ডিটিপিএ রেনোগ্রামসহ ক্যামেরা জিএফআর পরীক্ষা, ডিটিপিএ ক্যাপটোপ্রিল রেনোগ্রাম এবং ডিএমএসএ স্ক্যানের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া হাড়ের বিভিন্ন রোগের মূল্যায়নে বোন স্ক্যান, প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যায় স্পেক্ট-সিটি প্যারাথাইরয়েড স্ক্যান এবং হাড়ের খনিজ ঘনত্ব নির্ণয়ে বিএমডি পরীক্ষা করা হয়। নিউক্লিয়ার মেডিসিনভিত্তিক এসব পরীক্ষা রোগের ধরন ও চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা পরিকল্পনায় সহায়তা করে।
আধুনিক যন্ত্রপাতিনির্ভর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে সাতক্ষীরায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইনমাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থানীয়ভাবে এসব সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকায় রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী দূরবর্তী প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। তবে প্রতিটি পরীক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং সংশ্লিষ্ট সেবার প্রাপ্যতা বিবেচনা করা হয়। পরিচালক ডা. নাজমুল হোসেনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটির সেবামূলক কার্যক্রম আরও সুসংগঠিত ও জনবান্ধব হবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। মানসম্মত পরীক্ষা, সঠিক রোগ নির্ণয়ে সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সাতক্ষীরা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) ভবিষ্যতেও সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে যাবে এমনটাই প্রত্যাশা।
ইনমাসের পরিচালক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, সাতক্ষীরার মানুষের জন্য আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করাই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। রোগীরা যেন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিউক্লিয়ার মেডিসিনভিত্তিক চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে সঠিক তথ্য পান এবং যথাসম্ভব নিজ জেলাতেই প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। রোগীদের প্রতি আন্তরিকতা, সেবার মান বজায় রাখা, নির্ভুল পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করা এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে আমরা সচেষ্ট। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের সেবার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা এবং রোগীবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করছি।
রিপোর্টার 
















