দলে খালেদা-তারেকের মতের অমিল


নভেম্বর ১৩ ২০২০

  • জহুরুল কবীর:

মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে অনেক বিষয়ে ছেলে তারেক রহমানের মতের মিল হচ্ছে না। স্থায়ী কমিটিতে শূন্য পদ নিয়ে তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে।

বিএনপিতে মা-ছেলের দ্বন্দ্ব চলছে—মাঝেমধ্যেই এমন আলোচনা শোনা যায়। নানা বিষয়ে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছেলে তারেক রহমানের মতের অমিলের কথাও দলের ভেতর আলোচনা আছে। আসলে পরিস্থিতি কী?

গত সেপ্টেম্বরের কথা। ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পান সালাহউদ্দিন আহমেদ, যিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। তখন ঢাকা-৫ আসনে প্রার্থী ছিলেন নবীউল্লাহ। তাঁর মনোনয়ন হয় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ইচ্ছায়। এবার নবীউল্লাহর বদলে সেখানে সালাহউদ্দিন আহমেদকে প্রার্থী করতে ভূমিকা রাখেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বাদ পড়েন নবীউল্লাহ।

পরিবারের ঘনিষ্ঠজন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-৫ আসনে উপনির্বাচনে প্রার্থী বদল নিয়ে মায়ের সঙ্গে তারেকের একচোট রাগ-অনুরাগও হয়েছে। দলের বিভিন্ন বিষয়ে এমনটা জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গেও হচ্ছে। খালেদা জিয়া দুদকের মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন তারেক রহমান।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান সংসদে বিএনপির সাংসদদের যোগদানের প্রশ্নেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে মতভিন্নতা ছিল তারেক রহমানের। ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার পর নাটকীয়ভাবে সংসদে যোগ দেয় বিএনপি। শেষ মুহূর্তে লন্ডন থেকে এ সিদ্ধান্ত দেন তারেক রহমান। পরে খালেদা জিয়া এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।

২০১৮ সালের নির্বাচনে ২০ দলের শরিক জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ‘ধানের শীষ’ প্রতীক দেওয়া নিয়েও দুজনের ভিন্ন অবস্থান ছিল। তারেক রহমানসহ দলের স্থায়ী কমিটির মত ছিল, যেহেতু জামায়াতকে একটু আলাদা রাখতেই বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছে, তাই দলটিকে ‘ধানের শীষ’ না দেওয়াই ভালো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কারাগার থেকে খালেদা জিয়ার বার্তা আসে জামায়াতকে ‘ধানের শীষ’ দেওয়ার।

এ বিষয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য জমিরউদ্দিন সরকারের ব্যাখ্যা একটু ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘জামায়াতকে ছাড়ার জন্য চাপ আছে। আমাদের কিছুসংখ্যক লোক এটা চায়। সরকারও তাদের ব্যাক (সহযোগিতা) করছে। কিন্তু বিষয়টি রাজনৈতিক কৌশলগত। ঐক্যের লক্ষ্যেই জামায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়েছিল।’

সর্বশেষ সরকারের নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়া শর্তসাপেক্ষ মুক্তি চাননি বলে দলে গুঞ্জন আছে। এ কাজে সমঝোতায় মুখ্য ভূমিকা রাখেন খালেদা জিয়ার ভাইবোনসহ পরিবারের সদস্যরা।

‘জামায়াতকে ছাড়ার জন্য চাপ আছে। আমাদের কিছুসংখ্যক লোক এটা চায়। সরকারও তাদের ব্যাক (সহযোগিতা) করছে। কিন্তু বিষয়টি রাজনৈতিক কৌশলগত। ঐক্যের লক্ষ্যেই জামায়াতকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হয়েছিল।’

জমিরউদ্দিন সরকার, জ্যেষ্ঠ নেতা ও স্থায়ী কমিটির সদস্য

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, সাইফুল আলম ওরফে নীরবকে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি করা নিয়েও খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান অনেকটা বিপরীত অবস্থানে ছিলেন। এ পদে খালেদা জিয়া চেয়েছিলেন শহীদ উদ্দীন চৌধুরীকে (এ্যানি)। শেষ পর্যন্ত সাইফুল আলমকেই সভাপতি করেন তারেক রহমান। সাইফুল ইসলামকে এখন বিএনপির মহানগর কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার চিন্তাও আছে বলে জানা গেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দলের নেতা-কর্মীদের ভেতরে নানা প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। এর রেশ পড়ছে দলের নীতিনির্ধারণে এবং মাঠপর্যায়ে দল পুনর্গঠনেও।

এ বিষয়ে স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্যের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁদের দাবি, খালেদা–তারেকের মতবিরোধ ‘একেবারে অসত্য’। এর সঙ্গে জমিরউদ্দিন সরকার যুক্ত করেন, ‘অনেক সময় এমন কিছু ইস্যু থাকে, যেগুলো আমরা স্থায়ী কমিটিতে আলোচনার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বলি, আপনি আপনার মায়ের (খালেদা জিয়া) সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেন।’

স্থায়ী কমিটিতে শূন্যতা, তিক্ততা

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্ষদ স্থায়ী কমিটির ১৯টি পদের এখনো চারটি শূন্য আছে। এই শূন্যতা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ নেতাদের তিক্ততার একটা কারণ হয়ে উঠেছে বলেও জানা গেছে। যার বহিঃপ্রকাশ সম্প্রতি তিন ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও শাহজাহান ওমর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করেন।

এ বিষয়ে দলের মহাসচিবসহ পাঁচজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলছেন, স্থায়ী কমিটিতে পদ না দেওয়ার মনঃকষ্ট থেকে তাঁরা এই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

নেতা-কর্মীদের অনেকে বলছেন, ২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয়। এর ৩৯ মাস পর গত বছরের ১৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটিতে নেওয়া হয় সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান মাহমুদকে। তখন এ নিয়ে দলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ, এ সিদ্ধান্তে জ্যেষ্ঠ অনেকে উপেক্ষিত হন। এর রেশ এখনো রয়ে গেছে।

‍‍‍‍‘দলের প্রধান মুক্ত নন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান দেশের বাইরে—এ রকম একটা পরিস্থিতিতেও দল ঐক্যবদ্ধ। দুটি ভিন্ন মেরুর জোটকে সঙ্গে নিয়ে আমরা একটি নির্বাচনও করেছি। মানুষ ভোট দিতে পারলে ফলাফল কী হতো সবাই জানে। এসব ছোট করে দেখার উপায় নেই।’

মির্জা ফখরুল

বর্তমানে দলের স্থায়ী কমিটিতে আছেন ১৫ জন। খালেদা জিয়া মুক্ত নন, তারেক রহমান দেশে নেই। রফিকুল ইসলাম মিয়া গুরুতর অসুস্থ। ভারতে অনুপ্রবেশের মামলায় সে দেশে রয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। স্থায়ী কমিটি থেকে অব্যাহতি চেয়ে চিঠি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমান। সেটি গৃহীত হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ​ফলে ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে এখন সর্বোচ্চ ১১ জনের উপস্থিতিতে সভা হয়।

২০১৬ সালে দলের ষষ্ঠ কেন্দ্রীয় সম্মেলনের পর থেকেই স্থায়ী কমিটি নিয়ে গুঞ্জন চলছে। প্রায়ই খবর হয়, ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল নোমান, খন্দকার মাহবুব হোসেন, আবদুল আউয়াল মিন্টু ও মো. শাহজাহান স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, শূন্য পদগুলো কি পূরণ হবে?

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, খালেদা জিয়ার অবর্তমানে স্থায়ী কমিটিকে​ নিজের মতো করে তৈরি করতে চাইছেন তারেক রহমান। সে লক্ষ্যে সেলিমা রহমানকে নারী কোটায়, ইকবাল হাসান মাহমুদকে নিজের পছন্দে কমিটিতে আনেন। সামনে যাঁরা এ পদ পাবেন, তাঁরাও এ বিবেচনাতেই আসবেন বলে জানা গেছে।

এ নিয়ে অস্বস্তি আছে জ্যেষ্ঠ নেতাদের। অবশ্য দলে এমন কথাও দীর্ঘদিন থেকে চালু আছে যে জ্যেষ্ঠ নেতারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করতে যতটা স্বস্তিবোধ করেন, তারেক রহমানের সঙ্গে তা পান না। এ প্রসঙ্গে দলের একটি সূত্র গত সেপ্টেম্বর মাসে স্থায়ী কমিটির এক সভায় একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। তিনি জানান, সাংগঠনিক বিষয়ে স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের একটি বক্তব্যে তারেক রহমান যে প্রতিক্রিয়া দেখান, তাতে ওই সদস্য খুবই মনঃক্ষুণ্ন হন। তৎ​ক্ষণাৎ ওই নেতা বলেন, দলের বিষয়ে তিনি আর কখনো কিছু বলবেন না।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘স্থায়ী কমিটিতে যেকোনো বিষয়ে দ্বিমতের চর্চা আছে, কিন্তু মূল নেতৃত্ব নিয়ে আমাদের মধ্যে এতটুকুও দ্বিমত নেই।’ তিনি বলেন, ‘দলের প্রধান মুক্ত নন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান দেশের বাইরে—এ রকম একটা পরিস্থিতিতেও দল ঐক্যবদ্ধ। দুটি ভিন্ন মেরুর জোটকে সঙ্গে নিয়ে আমরা একটি নির্বাচনও করেছি। মানুষ ভোট দিতে পারলে ফলাফল কী হতো সবাই জানে। এসব ছোট করে দেখার উপায় নেই।’

দল পুনর্গঠন কত দূর?

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার পর ওই বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন ডেকে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, দল গুছিয়ে তাঁরা আবার আন্দোলন শুরু করবেন। এরপর ২০১৬ সালে দলের সম্মেলন হয় এবং দল পুনর্গঠনে দায়িত্ব বদল হয়েছে তিনবার—আদতে বলার মতো কিছুই হয়নি।

দেশের ৬৪ জেলা ও মহানগরে বিএনপির সাংগঠনিক ইউনিট আছে ৮১টি। দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্র বলছে, বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ কমিটি আছে মাত্র ৩৯টি ইউনিটে। ২৩টিতে আহ্বায়ক কমিটি, ১৬টিতে আংশিক কমিটি রয়েছে। একটি ইউনিট কমিটি বিলুপ্ত আছে, সেটি হচ্ছে লক্ষ্মীপুর জেলা কমিটি। এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ও আহ্বায়ক মিলিয়ে ৫২টি কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। অর্থাৎ​ মেয়াদ আছে মাত্র ১০টির। সেগুলো হচ্ছে লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, জামালপুর, শেরপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলা কমিটি।

যদিও আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার সময় তিন মাসের মধ্যে সম্মেলন করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কেউই সম্মেলন করতে পারেনি। এমনও আছে, ২০১১-২০১২ সালে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেই কমিটি এখনো বহাল রয়েছে। যেমন ২০০৯ সালে বেগম রাবেয়া চৌধুরী ও আমিনুর রশিদ ইয়াসীনের নেতৃত্বে দুই বছরের জন্য কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা কমিটি দেওয়া হয়। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর কমিটির মেয়াদ শেষ হয়, সে কমিটি এখনো বহাল রয়েছে।

বয়স, অসুস্থতা ও শারীরিক অবস্থা—সব মিলিয়ে আগের জায়গায় নেই খালেদা জিয়া। এর সঙ্গে আছে জেল ও মামলা। সার্বিক পরিস্থিতিতে অঘোষিতভাবেই দলের হাল ছেলে তারেক রহমানের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই কার্যত দল চলছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে। এখন খালেদা জিয়া চেয়ারপারসন পদে আছেন, এটুকুই।

তারেক রহমান খালেদা জিয়া

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন