অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও সংশপ্তক জাসদ: পর্ব ৪


সেপ্টেম্বর ১৬ ২০২০


জিয়াউল হক মুক্তা:

[জিয়াউল হক মুক্তা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক। এ রচনায় সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের পারিবারিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আর্থরাজনীতিক-অন্তঃদলীয়-আন্তঃদলীয়-প্রশাসনিক-গোয়েন্দা-আধাসামরিক-সামরিক-ভূরাজনীতিক প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে। এখানে বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষ্যের সাথে যোগ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-হত্যা বিচার-আদালতের বিচারকের পর্যবেক্ষণ ও কিছু সাক্ষ্যভাষ্য এবং বঙ্গবন্ধুতনয়া জননেত্রি প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার ও তাঁর পরিজনদের কিছু বক্তব্য; এবং বর্তমান লেখকের গবেষণালব্ধ কিছু পর্যবেক্ষণ। সবশেষে প্রধানমন্ত্রির সদয় বিবেচনা ও সকলের আলোচনার জন্য যোগ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা সত্যানুসন্ধান কমিশন’ বিষয়ক কিছু বিষয়গত ও কাঠামোগত প্রস্তাবনা। পাঠকদের সুবিধা বিবেচনায় লেখাটি ১৬ কিস্তিতে প্রকাশিত হচ্ছে; আজ প্রকাশিত হচ্ছে চতুর্থ পর্ব।]
১৯৭৪ সালে বিজয় দিবসের একদিন আগে ১৫ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেয়া এ ভাষণে মূল্যস্ফীতিকে এক নম্বর শত্রু, প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে দুই নম্বর শত্রু ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু বললেন, “আমাদের নতুন প্রতিরোধ সংগ্রামে সর্ব শেষ ও সর্বপ্রধান শত্রু চোরাকারবারি, কালোবাজারি, মুনাফাবাজ ও ঘুষখোরের দল। মানুষ যখন অনাহারে মারা যায়, তখনও এই সব নরপশুর দল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখের গ্রাস অন্যত্র পাচার করে দিয়ে থাকে। বিদেশ থেকে ধার-কর্জ, এমনকি ভিক্ষা করে আনা পণ্য ও বাংলার সম্পদ মজুদের মাধ্যমে এরা মুনাফার পাহাড় গড়ে তোলে। এদের কোন জাত নেই, নেই কোন দেশ।”

আগে-পরে অন্য অনেক বক্তব্যের মতো, পরে ১৯৭৫ সালে বঙ্গভবনে বাকশাল কমিটির উদ্বোধনী ভাষণেও তিনি বলেন, “আমি সার দিতে পারি নাই। যা সার দিয়েছি, তার থার্টি পারসেন্ট চুরি হয়ে গেছে। স্বীকার করেন? আমি স্বীকার করি। আমি মিথ্যা কথা বলতে পারবো না। মিথ্যা বলে একদিনও হারাম এ-দেশের প্রেসিডেন্ট থাকবো না। আমার যে সার আমি দিয়েছি, তার কমপক্ষে থার্টি পারসেন্ট ব্ল্যাক মার্কেটিং-এ চুরি হয়ে গেছে। আমি যে ফুড দিই, তার কুড়ি পারসেন্ট চুরি হয়ে যায়। আমি যে মাল পাঠাই গ্রামে গ্রামে তার বিশ পারসেন্ট, পঁচিশ পারসেন্ট চুরি হয়ে যায়। সব চুরি হয়ে যায়। হুইট [গম] আমি তো হুইট পয়দা করি না, খুব কমই করি, তবু কোন বাজারে হুইট পাওয়া যায় না? গভর্নমেন্ট গোডাউনের হুইট? সার তো আমি ওপেন মার্কেটে বিক্রি করি না, তবু কোন বাজারে সার পাওয়া যায় না?” এ সময়, জাসদ ব্যস্ত আত্মরক্ষায়; পলাতক। বঙ্গবন্ধু কথিত চাটার দল আর চোরের দল আর নরপশুর দল ঠেকানোর কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তি তখন আর প্রকাশ্যে/মাঠে নেই। পাকিস্তানের সামরিক জান্তাদের বিরুদ্ধে দশ বছর লড়াই করা আর মুক্তিযুদ্ধে মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে তাকে তুড়ে মেরে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া ছাত্র-যুব-তরুণরা এ অশনিসংকেত দেখেছিলেন অনেক আগেই। ১৯৭৪ সালের শুরুতেই জাসদ বঙ্গবন্ধু কথিত চাটার দল আর চোরের দল আর নরপশুর দলের দুর্নীতি-লুটপাট-মজুদদারি-কালোবাজারি-পাচারকারিদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করে ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’-এর ‘ঘেরাও’ কর্মসূচি। কর্মসূচির প্রথম দিনে ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাওয়া রক্ষীবাহিনী গুলি করে হত্যা করে ৫০ জন জাসদ নেতাকর্মীকে; তাদের চার জনের লাশ বাদে বাকিদের লাশ গুম করে ফেলা হয়; গ্রেফতার করা হয় শতাধিক। পরের দিন জ্বালিয়ে দেয়া হয় জাসদ কার্যালয়। তছনছ করা হয় জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠের কার্যালয়। ১৭ মার্চ রাত থেকে সারাদেশে শুরু হয় নতুন উদ্যমে জাসদ-দমন; চিরুনী অভিযানের ফলে কারোর এমনকি আত্মগোপনে থাকাও অসম্ভব হয়ে ওঠে। দেশের দুর্ভাগা জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছিল জাসদ একা; আর কেউ দাঁড়ায়নি তাদের পাশে; ন্যাপ-সিপিবি সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল, গোপন চীনপন্থী দলগুলো ব্যস্ত কথিত শ্রেণিশত্রু খতমে আর অপরাপর প্রকাশ্য সব সংগঠন নিজেরা একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম তৈরি করলেও তেমন উল্লেখযোগ্য কোন কর্মসূচি হাজির করতে পারেনি। এককভাবে আন্দোলনে থাকা জাসদকে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনার দাম দিতে হলো কড়ায়গন্ডায়— অত্যাচার-নির্যাতন-জেল-জুলুম-সন্ত্রাস-নিপীড়ন-খুন-গুমের শিকার হয়ে। রাজনীতির মাঠে নিঃসঙ্গ জাসদ যেন হয়ে ওঠলো সংশপ্তক।

অধ্যায় আট. এ ব্যাটলফিল্ড অব দ্য প্রক্সি ওয়ার?
সে সময়টা ছিল শীতল যুদ্ধের কাল। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। পারমাণবিক যুদ্ধের শংকায় কম্পমান মানব সভ্যতা। পাকিস্তান সমাজতন্ত্র মোকাবেলার সামরিক জোট সাউথইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা সিয়াটো ও দি সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা সেনটো’র সদস্য; উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় পাশে পেয়েছে চীন ও আমেরিকাকে। ইউরোপের অনেক দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক হস্তক্ষেপে; এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকায় সমাজতন্ত্র এসেছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের হাত ধরে। ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোও চেষ্টা করেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তা পেতে; কিন্তু সহায়তা গ্রহণের পাশাপাশি তাদেরকে ঝুঁকিও নিতে হয়েছে অনেক। ১৯৫৪ সালে ভিয়েতনাম দ্বিখন্ডিত হয়েছিল ও ১৯৬২ সালের অক্টোবরে কিউবা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল ১৩ দিনের স্নায়ু-ছেঁড়া পারমানবিক যুদ্ধের মিসাইল সংকট।

এদিকে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্টরা চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বলয়ে বিভক্ত ছিলেন। ফলে চীনপন্থীদের কেউ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ও কেউ জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মূলধারার বাইরে স্বতন্ত্র অবস্থান গ্রহণ করেছেন; আর সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুসারীরাও ন্যাপ-সিপিবিতে বিভক্ত ছিলেন। এসব বামপন্থীদের কেউ বাঙালির জাতীয় মুক্তির দিকে পরিকল্পিত আন্দোলন সংগ্রামের অংশ ছিলেন না। এরা ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের ঔপনিবেশিক সরকার ও তাদের শাসনকে নিজেদের অবস্থান দ্বারা প্রকারান্তরে সহায়তাই করে গিয়েছেন। স্বাধীন বাংলাদেশেও স্বৈরশাসন ও সামরিক শাসনের বেলায়ও এরা আপোষই করেছেন প্রায় সকল সময়। বঙ্গবন্ধু তাই বলতেন যে বাংলাদেশ কোনো আমদানি করা সমাজতন্ত্র চলবে না। স্বাধীনতা-সমাজতন্ত্রের অগ্রবাহিনী নিউক্লিয়াসপন্থীরাও বলতেন যে আমদানি করা সমাজতন্ত্র নয়, বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিকশিত জাতীয় সমাজতন্ত্রীরা আন্তর্জাতিক প্রভাববলয়ের বাইরে থেকে কায়েম করবেন শোষণমুক্ত সমাজ ও দেশ। দেশজ বাস্তবতার বৈজ্ঞানিক অনুধাবন থেকে পরিচালনা করবেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েমের আন্দোলন ও নির্মাণ করবেন সমাজতান্ত্রিক সমাজ। কোন দেশ বা সামরিক জোটের অনুসরণ নয়, জোট নিরপেক্ষতা হবে ভূরাজনীতিগত অবস্থান। জাসদ তৎকালীন জাতীয়-আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সা¤্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল জাতীয় সার্বভৌমত্বকে বিপদমুক্ত রাখতে; আজ ২০২০ সালে এসে এ কথাগুলো হাস্যকর শোনাতে পারে, কিন্তু প্রক্সি ওয়ারের যুগে স্বাধীন ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেই এসব রাজনৈতিক টার্ম তৈরি হয়েছিল। জাতীয় সমাজতন্ত্র ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারণা থেকে গঠিত জাসদ স্বাধীন দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়, আর তাই চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থী সমাজতান্ত্রিক দলগুলো মনে করতো জাসদ তাদের সমাজতান্ত্রিক জমিদারি ধ্বংস করে দিয়েছে; আর তাই তারা জাসদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত সর্বদা সর্বত্র।

বঙ্গবন্ধু যখন দল ও দলের বাইরের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি দ্বারা অবরুদ্ধ ও জাসদ যখন রাজনৈতিকভাবে ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করে মিত্রহীন নিঃসঙ্গ, ওই ন্যাপ-সিপিবি সুযোগটি নিলো পুরোপুরি, অনপ্রবেশ করলো আওয়ামী লীগের ঘরে; সরকারের সমর্থক থেকে পরিণত হলো সরকারের অংশে। দেশে একদল বাকশাল গঠন করা হলে সোভিয়েত ইউনিয়নপন্থী সিপিবি ও ন্যাপ নিজেদের দল বিলোপ করে এতে ঢুকে পড়লো। ন্যাপ-সিপিবি বাকশালে বিলুপ্তির ফলে— বিশেষত ন্যাপ-সিপিবির জাতীয়তাবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিকতাবাদের রাজনীতি, সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাথে এদের পার্টি-টু-পার্টি সম্পর্ক ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর নির্দেশ পালনকারী বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সাথে এদের সম্পর্ক বিবেচনায়— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনে হতেই পারে যে বাংলাদেশ বুঝি জোট নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে গিয়ে সোভিয়েত ব্লকে ঢুকে গেল। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অগত্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হলেও, বঙ্গবন্ধুকে মেনে নিতে পারেনি কখনোই; বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি কখনোই।

কোমিতেত গোসুদার্স্তভেন্নয় বেজোপাসনস্তিবা কেজিবি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। কেজিবি’র পক্ষত্যাগী সাবেক আর্কাইভ কর্মকর্তা ভাসিলি মিত্রোখিন ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার এন্ড্রু কেজিবির নথিপত্রের ভিত্তিতে রচনা করেন ‘দি মিত্রোখিন আর্কাইভ: দি কেজিবি অ্যান্ড দি ওয়ার্ল্ড’ নামের গ্রবেষণাগ্রন্থ। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্সের তদারকিতে ২০০৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এটা পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত হয়। দি মিত্রোখিন আর্কাইভ, বাংলাদেশে পরিচালিত আরও কিছু গবেষণাকর্ম এবং ন্যাপ-সিপিবি’র নেতাদের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে দৈনিক প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খান ২০০৬ সালের মার্চ মাসে নিজ পত্রিকায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ও কেজিবির নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা বিষয়ে একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

এ প্রতিবেদনে বলা হয় যে ১৯৭৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির পলিট ব্যুরো কেজিবিকে বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে নির্দেশ দেয়। কেজিবি আওয়ামী লীগ ও এর মিত্র সিপিবি-ন্যাপ-এর নির্বাচনী প্রচারণায় তহবিলের যোগান দেয়। দি মিত্রোখিন আর্কাইভ জানায় ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে কেজিবি মিশনের আনুষ্ঠানিক বাজেট ছিল ৫২ হাজার ৯০০ রুবল। কেজিবি একটি দৈনিক পত্রিকা ও একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে দৈনিক পত্রিকাটিকে ছাপাখানা কেনার জন্য ৩ লাখ রুবলের সমপরিমাণ অর্থ দেয়। বইটির এক ফুটনোটে লেখা হয়েছে যে বাকশালে একীভূত আওয়ামী লীগকেও কেজিবি গোপনে তহবিলের যোগান দিয়েছে। অবশ্য আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতা তোফায়েল আহমেদ বিদেশী অর্থ নেয়ার বিষয়টিকে নাকচ করে দিয়েছেন; কিন্তু ন্যাপ-সিপিবি তা করেনি।

ন্যাপ-এর সাবেক নেতা মোনায়েম সরকার জানিয়েছেন যে সোভিয়েত সহায়তায় ১৯৭২-১৯৭৫ সময়কালে ন্যাপ পরিচালিত সমাজতন্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ৭ হাজার ৭০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সিপিবি সূত্র থেকে মিজানুর রহমান খান জানান যে আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক তাদেরকে দেয়া অর্থের পরিমাণ হয় সর্বোচ্চ বার্ষিক প্রায় ৫০ হাজার ডলার। ন্যাপও সিপিবির মতো অনেকটা সমপরিমাণ অর্থ পেত; সিপিবি-ন্যাপ-এর সাথে যুক্ত অন্যান্য গণসংগঠনও আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা পেত। অন্যান্য সহায়তার মধ্যে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে ছাত্র পাঠানো, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ ইত্যাদি। সিপিবির এ বছরভিত্তিক তহবিল দলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ বিশেষভাবে নিজস্ব এখতিয়ারে দেখভাল করতেন। সিপিবির সাবেক নেতা অজয় রায়ও একই তথ্য প্রকাশ করে বলেন, ‘দলীয় তহবিলের হাঁড়ির খবর একমাত্র জানতেন দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মোহাম্মদ ফরহাদ। দলীয় সিদ্ধান্ত যৌথভাবে গৃহীত হলেও তহবিল ব্যবস্থাপনা কিন্তু যৌথ নেতৃত্বাধীন ছিল না।’ ১৯৮৭ সালে মোহাম্মদ ফরহাদের মৃত্যুর পর থেকে ১৯৯১ সালে সিপিবি বিভক্ত হওয়ার সময় পর্যন্ত সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কেজিবিপ্রদত্ত সে অর্থ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১৯৭২ সালে কেজিবির আবাসিক মিশন ঢাকা রেসিডেন্সি ‘মুজিবের সচিবালয়ের একজন উর্ধতন সদস্য, দুজন মন্ত্রি ও দুজন ঊর্ধতন গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে [তাদের এজেন্ট হিসেবে] নিয়োগ’ করে। এটা আরও জানায়, ১৯৭৫ সালে ‘সন্দেহাতীতভাবে মস্কোর উৎসাহে’ শেখ মুজিব বাংলাদেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। দি মিত্রোখিন আর্কাইভ-এর মতো অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামানের স্বতন্ত্র একটি গবেষণাও তা বলে। সোভিয়েত ইউনিয়নের নাম উল্লেখ না করে নিজের একটি বইয়ে তিনি বলেন যে ‘দেশটির ঢাকাস্থ দূতাবাস’ ১৯৭৪ সালের নভেম্বর থেকে মস্কোপন্থী দলগুলোর নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র বাতিল করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার কথা বলছিল; আওয়ামী লীগের দুজন বড় নেতাকে তারা একদল বাকশাল গঠন করতে প্রভাবিত করেছিল। [আগামী কাল পঞ্চম পর্ব]

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন