এসজিডির সফল বাস্তবায়নে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের বিশেষ মনোযোগ


জুলাই ১৪ ২০২০

আশেক-ই-এলাহী: বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার থেকে সম্পূর্ন পৃথক এক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়ে উঠেছে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল। যে এলকাটি বিশ্বব্যাপি সাম্প্রতিক মহাসংকট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। সাগরের নোনাপানি আর উজানের মিষ্টি পানির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা উপকূলীয় এ অঞ্চলের ভুমি গঠনের সাথে রয়েছে জোয়ার ভাটার প্রভাব। জোয়ারে পলি অবক্ষেপনের মাধ্যমে ভূমির গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ার আগেই ষাটের দশকে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ করায় ভূমি বসে যেয়ে নদী পাড় অপেক্ষা বাঁধের মধ্যের জমি নিচু হয়ে যায়। পাশাপাশি পলি জমিতে (প্লাবনভুমিতে) না পড়তে পেরে নদীর মধ্যে পড়ায় নদীর তলদেশ উচু হতে শুরু করে। উপকূলীয় বাঁধ এর নির্মাণকালীনগলদরে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ৭০ দশকের শেষ দিকে বিশেষ করে আশি সালে মারাত্মক আকার ধারণ করে। কৃষি উৎপাদন নেমে আসে নিন্মস্তরে আর তৈরী হতে থাকে অঞ্চল ভিত্তিক জলাবদ্ধতা।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবণতা অত্যাধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় দেশ সমুহের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুকিতে আছে। দেশের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে দক্ষিণ-পচিম উপকূলীয় অঞ্চল। সমুদ্রপৃষ্ঠে ঘূর্ণিঝড় ও জলচ্ছ্বাস প্রায়শ তৈরী হচ্ছে। আগে যেটি দশ বছরের অধিক সময়ে একবার ঘটতো, বর্তমানে সেটি প্রায় প্রতি বছর হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উপক’লের মানুষ ফণি, বুলবুল ও সর্বশেষ আম্ফানে আক্রন্ত হয়েছে। ২০০৯ আইলায় প্রচন্ড বিপর্যস্তার সম্মুখিন হয় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষ। দশ বছরের পরও আইলার ক্ষতির রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আম্ফান আইলায় বিধ্বস্ত এলাকাকে আবারও বিধ্বস্ত করে। আম্ফানে সরকারের সময় উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে প্রানহানি প্রায় শুন্যের কোটায় থাকলেও সম্পদের ক্ষতি হয় মারাত্মক। এমনকি সরকারের গত দশ বছরের উন্নয়ন কর্মকান্ডও প্রায় বিলীন হয়ে যায়।

অন্য যে কোন এলাকার দুর্যোগের থেকে পৃথক দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের দূর্যোগের বাস্তবতা। এখানে দুর্যোগ এলাকার মানুষদের প্রতিদিন দু বার করে দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। জোয়ারভাটার কারনে দুর্যোগ কবলিত এলকার মানুষদের কোনধরনের সহযোগীতা টেকসই হয় না, যদি না দুর্যোগ কবলিত এলাকায় জোয়ারের নোনা পানি উঠা বন্ধ করা না যায়। যার প্রধান অনুসঙ্গ হচ্ছে উপক’লীয় টেকসই বাঁধ। আইলার পর দু বছর জোয়ার ভাটার মধ্যে কাটানোর দুর্ভোগ সরকার প্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও সেনাবাহিনী নিয়োগ দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে।
ষাটের দশকে অর্থাৎ ১৯৬৬ সালে সম্পন্ন উপকূলীয় বাধঁ নিয়ে পরে আর কোন স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করে সংস্কারের ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে বর্তমানে যে ভেড়িবাঁধটি আছে সেটি বতমান জলবায়ু পরিবর্তনের সহযোগী জলোচ্ছ্বাস ঘূণিঝড় থেকে রক্ষায় অকার্যকর। শুধুমাত্র সুন্দরবনের কারনে সকল দুর্যোগে উপকূলের মানুষের জীবন ও সম্পদ ও সরকারী উন্নয়ন কর্মকান্ড আজও ধ্বংশের শেষ প্রান্তে এসেও টিকে আছে। এহেন বাস্তবতায় দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের সরকারী উন্নয়ন কর্মকান্ড, স্থানীয় মানুষের সম্পদ ও জীবিকার উৎস্য স্থায়ীত্বশীল করতে উপকূলের নদী প্রবাহ, পলি অবক্ষেন, জোয়ারভাটার প্রভাব, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার জীববৈচিত্রসহ প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করে টেকসই উপকূলীয় বাধ নির্মানের বিকল্প নেই। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী যেটি ২০১০ শ্যামনগরের হরিচরন হাইস্কুলের মাঠে ঘোষনা করেন।

দূর্যোগ প্রবণ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এলাকাতে প্রকৃতিগত ভাবে প্রধান সংকট সাধু পানি। নোনা কবলিত ও সুমুদ্র এর কাছাকাছি হওয়ায় এখানে সাধু পানি বা নিরাপদ পানির সংকট মারাত্মক। শুধুমাত্র খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে যেয়ে নারী ও শিশুদের ৫ থেকে ৬ ঘন্টা বাড়ীর বাইরে থাকতে হয়। এবং শরীরের ওজনের অধিক ওজনের পানি পাত্র নিয়ে কিশোরীদের কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। ফলে শুধু খাওয়ার ও ব্যবহারের পানি সংকট এলাকার দারিদ্রতার হার অন্য এলাকার প্রায় দ্বিগুন করেছে। সরকারের ভীষন বাস্তবায়নে মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত, দরিদ্রমুক্ত সমতার বাংলাদেশ গড়তে উপকূলের পানির স্থায়ী সমাধন হওয়া জরুরী।

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল একটি শৃজনশীল ব্যতিক্রমধর্মি এলাকা। বাংলাদেশের এমনকি উপকুলের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পৃথক একটি অঞ্চল। বর্তমানে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা অঞ্চল এটি। দরিদ্রের হার বেশী, শিক্ষায় পিছিয়ে, মানুষের এলাকা ত্যাগের প্রবনতাও অধিক। সরকারকারের নানামুখি কর্মকান্ডও উপকূলের মানুষের জীবন মান উন্নয়নের লক্ষ্যে করা হচ্ছে। কিন্তু এখানে কর্মরত সকল সরকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতাও এলাকাতে মাঝে মধ্যে বিপর্যয় তৈরী করে, যেজন্য এখানে, হাওড়, বরেন্দ্র, পার্বত্য অঞ্চলের মত একটি কতৃপক্ষ হওয়া খুবই জরুরী। এখানের বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয়, কৃষি বিভাগ, মৎস্য, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, পানি সম্পদসহ সকল মন্ত্রনালয়কে সমন্বিত করে কাজ করা জলবায়ু ঝুকিতে থাকা এলাকা হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এলাকার বিপর্যয়ের আরো একটি কারণ অপরিকল্পিত চিংড়ী চাষ। কৃষি জমিতে গড়ে তোলা চিংড়ী প্রকল্পের মালিকরা যথেচ্ছার ভাবে উপকূলীয় বাঁধকে নিজের ঘেরের রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজেনে ভেড়িবাধ কাটা, ফুটো করে এবং প্রকল্পের নোনা পানি অরিকল্পিত ভাবে নিস্কাশন করা ইত্যাদির ফলে বাঁধ ও পরিবেশের ঝুঁকি উত্তোর উত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দক্ষিণ-পশ্চিম বিশেষ করে সাতক্ষীরার উপকূলের কর্মক্ষম মানুষদের এলাকা ত্যাগের হার অনেক বেশী। কৃষি জমিতে নোনা পানি থাকায় কাজের সন্ধানে কেহ মৌসুম ভিত্তিক আবার কেহ কেহ স্থায়ী ভাবে এলাকা ত্যাগ করছে। ফলে পরিবারের শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধিদের ভার পরে পরিবারের নারীদের উপর। যা খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে দেয়। শিশু শ্রম ও বাল্য বিবাহের প্রবনতা তৈরী করে।

দুর্যোগ আর সমন্বয়হীন উন্নয়ন কর্মকান্ড দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের জীবন জীবিকা ও প্রশাসনিক উন্নয়ন ব্যবস্থাপনাকে অনিশ্চিত করে ফেলেছে। যা স্থায়ীত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পক্ষে একটি বড় অন্তরায়। ‘কাউকে পিছনে ফেলে নয়’- এ ধারার সফল বাস্তবায়নে দক্ষিণ- পশ্চিম উপকূলের নাগরিকদের সংকট নিরসনের ও দ্রুত বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের জরুরী কর্মসুচি ও কার্যক্রম দরকার। এসজিডির সফল বাস্তবায়নে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জন্য দরকার সরকারে বিশেষ মনোযোগ।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন