সমতার পৃথিবী- করোনাভাইরাসের সাথে কথোপকথন


এপ্রিল ১৯ ২০২০

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন

“আমরা অতি ক্ষুদ্র, আমাদের নিজস্ব জীবন ছিল না, নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার সামর্থ্য ছিল না। কিন্তু এখন থেকে চারশো কোটি বছর আগে এই পৃথিবীতে আমরা ছিলাম। তখনো এই পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হয়নি। জীবন্ত জগতের পূর্বশর্ত যে কোষ তাও আত্মপ্রকাশ করেনি। আমরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছি জীবন্ত কোষ সৃষ্টিতে। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের চেয়ে কত উন্নত, শক্তিশালী এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন্ত প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে এই ধরিত্রীতে। এসেছে আমাদের চেয়ে বহু উন্নত এক কোষী ব্যাকটেরিয়া। তারা সালোক সংশ্লেষণের কাজটি শুরু করে প্রায় তিনশো কোটি বছর আগে। সম্ভব করে অক্সিজেনময় পৃথিবী। তারই হাত ধরে পঁচাত্তর কোটি বছর আগে সবুজ শৈবাল আর পঁয়তাল্লিশ কোটি বছর আগে বহুকোষী সবুজ পত্রাবলির উদ্ভিদরাজি ফুলে-ফলে পৃথিবীকে অপূর্ব সুন্দর ও বর্ণাঢ্য করে তোলে। পোকা-মাকড়, স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখী, বানরকুল হয়ে সোজা হয়ে হাঁটা প্রবুদ্ধ মানুষের(হোমো সেপিয়ান্স) আগমন ঘটে গত চল্লিশ কোটি থেকে আড়াই লক্ষ বছরের মধ্যে। এই দীর্ঘ সময়ে আমরাও ছিলাম সবার মধ্যে। অনেকটা অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে। কারণ আগেই বলেছি আমরা কোন জীবন্ত সত্তা নই। অন্য জীবকোষের আনুকূল্যে তাদের ভেতরেই কেবল আমরা বেঁচে থাকতে পারি, বংশ বিস্তার করতে পারি। চারশ কোটি বছরতো কম নয়! কিন্তু তোমাদের প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ যেমনটা লিখেছেন, ‘দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখেছি যে, মনে হয় যেন সেই দিন।’ আমরা সব দেখেছি। সকল প্রজাতি মিলে মিশে কিভাবে প্রাণময় এই সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুললো। আবার কীভাবে ‘সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব’ মানুষের হাতে তার ধ্বংস চলতেই থাকলো।”

“আমরা আবার এসেছি। কিছু কথা তোমাদের মনে করিয়ে দিতে।”

“তোমাদের সভ্যতার ইতিহাসে বড় বড় রূপান্তরে তোমরা মানুষেরা নিজে ক্রমাগত শক্তিশালী হয়েছো। বিনিময়ে কোটি কোটি ভিন্ন প্রজাতি ধ্বংস করেছো। যেমন, তোমরা যখন গুহাবাসি, তখন পশু-পাখি-মাছ শিকার এবং বন্য শস্য-ফলমূল সংগ্রহ করে জীবন ধারণ করতে। তোমরা ছিলে প্রকৃতির অংশ। সেই তোমরা প্রায় ১২ হাজার বছর আগে পরিকল্পিত চাষাবাদ শুরু করে তোমাদের সভ্যতার ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করলে, বিনিময়ে বিলিন হয়ে গেল কোটি কোটি প্রজাতি। তারপর থেকে বর্তমান এই সময়ে পৃথিবীতে সাড়ে সাতশ কোটি মানুষ, যারা গোটা প্রজাতির মাত্র ০.১ ভাগ তারাই ধ্বংসের কারণ হয়েছো পৃথিবীর ৮৩ ভাগ বন্য প্রাণী ও ৫০ ভাগ উদ্ভিদের। একই সময়ে বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে মানব প্রজাতির ও তোমাদের গৃহপালিত পশুর সংখ্যা। তোমাদের বিজ্ঞানীরাই বলছেন- আধুনিক কৃষি এবং তোমাদের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক বন উজাড় ও বন্য আবাসের ধ্বংস এবং পানি, বায়ু ও পরিবেশ বিষাক্ত করার ফলে পৃথিবী তার চারশো বছরের ইতিহাসে জীবন্ত প্রজাতির ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির পর্যায় পার করছে। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক প্রাণী গত পঞ্চাশ বছরে হারিয়ে গেছে বলে মনে করছেন তোমাদের বিজ্ঞানিরা।”

কথাগুলো বলছিল ‘কোভিড-১৯’ নামে পরিচিত করোনাভাইরাস। এমন নয় যে এই সত্যগুলো আমার অজানা ছিল, বা আগে অন্য কোথাও পড়িনি। ঠিক যখন মনে হচ্ছিল আমার উদ্দেশ্যে কোভিড ১৯ এর কথা হয়তো শেষ হয়েছে, তখনই সে আরো মনে করিয়ে দিল  জাতিসংঘের অধীন জীববৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ রক্ষার আন্ত-সরকার বিজ্ঞান নীতির প্লাটফর্মের আশংকা যে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দশ লাখের মত প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। রিপোর্টে নাকি বলা হয়েছে জীববৈচিত্র্যের এই ধ্বংস পৃথিবী নামের গ্রহের জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখ্য কারণ হিসেবে আধুনিক কৃষিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আরো নাকি বলা হয়েছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সাথে রোগ সংক্রমণের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল যে, দ্রুত সংক্রমণ ঘটায় এমনসব রোগ-বীজাণু জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সাথে পাল্লা দিয়ে বংশ বিস্তার করে।

করোনাভাইরাসকে কী জবাব দেব? মনে পড়লো, ইতিমধ্যে সে প্রায় দেড় লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আমার পরিবার পরিজন আছে। এখনো সুন্দর এই পৃথিবীতে আরো কিছুকাল তাদের নিয়ে বাঁচতে চাই। ফুসফুস ভরে নিঃশ্বাস নিতে চাই। তবে আপাতদৃষ্টিতে করোনাভাইরাসকে শত্রু মনে হলেও, কেন জানি মনে হচ্ছিল বাস্তবে এটি আমাদের শত্রু নয়। এমন একটি ধারণা নিয়েই তার সাথে চলে আমার কথোপকথন।

“আমরা মানুষেরা তোমাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। তোমরাই বলেছো পুরো জীবন্ত নও তোমরা। কারণ শুধু অন্য কোন জীবন্ত কোষের ভেতরেই কেবল তোমরা বেঁচে থাকতে পার, বংশ বিস্তার করতে পার। তোমরা একটি আরএনএ (রাইবো নিউক্লিক এসিড) ভাইরাস। আরএনএ’র কথা বলতে গিয়ে ডিএনএ (ডিওক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড) এবং প্রোটিনের কথাও বলতে হবে। জীবকোষের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই তিনটি বৃহৎ অণু। একটা সময় ছিল যখন মনে করা হতো প্রোটিন হচ্ছে জীবন্ত প্রজাতির সকল রহস্যের মূলে। গত শতাব্দীর চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে আমাদের বিজ্ঞানিরা প্রমাণ করলেন প্রোটিন নয়, জীবনের মৌল রহস্য নিহিত আছে জীবকোষের নিউক্লিয়াসের ভেতরে ডিএনএ অণুর মধ্যে। এই অণুর উপাদানে এসিড যৌগ আছে। আর নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকে বলে ডিএনএকে একটি নিউক্লিক এসিড বলা হয়।  ডিএনএই হচ্ছে বংশগতির বাহক; ডিএনএই নির্দিষ্ট করে দেয় ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির জীবতত্ত্বিক বিশিষ্টতা, তার আপন বৈশিষ্ট্য। ডিএনএ’র গঠন কাঠামো দেখতে পুরনো দালানের প্যাঁচানো সিঁড়ির মত। নিচ থেকে উপরে উঠে যাওয়া সিঁড়ির ধাপে ধাপে সঞ্চিত থাকে জীবনের সকল সংকেত। এসব সংকেত প্রথমে আরএনএ নামের আরেকটি অণু হয়ে প্রোটিন নামের অণুতে প্রকাশিত হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রজাতির সকল বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হতে থাকে। জীবন্ত প্রজাতির সকল বৈশিষ্ট্য বা তথ্য বহন করে বলে ডিএনএকে তথ্যের প্রাণঅণুও (Information bimolecule) বলা হয়।

একটি প্রজাতির কোষে ডিএনএ’র গোটা পরিমাণকে জেনোম হিসেবে অভিহিত করা হয়। প্রজাতির পরিচয় তার জেনোম দিয়ে। এই জেনোমে সকল জেনেটিক তথ্য সাজানো থাকে। তোমাদের ভাইরাসের জেনোম খুবই ছোট। অন্যদিকে বহুকোষী উচ্চতর প্রজাতি যেমন, মানুষের জেনোম অনেক বড়। বিজ্ঞানিরা ‘হিউম্যান জেনোম প্রোজেক্ট’ নামের এক বিশাল গবেষণা, যা ১৯৯০ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০০৩ সালে শেষ হয়, তার মাধ্যমে গোটা জেনোমে সঞ্চিত সকল তথ্যাদির ক্রমবিন্যাস নির্ধারণ করেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই প্রথমবারের মত মানুষ তার জীবনের সকল রহস্য উন্মোচনের জন্য জেনোমের একটি ম্যাপ তৈরিতে সক্ষম হয়। হাতে একটি ম্যাপ থাকলে যেমন অজানা ঠিকানা বা অনাবিষ্কৃত পৃথিবীকে জানা সহজ হয়, তেমনি মানব জেনোমের ম্যাপ থাকার কারণে মানুষের জীবনের সকল রহস্য সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিপুল গতিতে মানুষ জানতে পারছে অজানাকে। এভাবে ডিএনএ সম্পর্কে জানতে গিয়ে বিজ্ঞানিরা দেখলেন ডিএনএ গুরুত্বপূর্ণ বটে কিন্তু আরএনএও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।”

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললাম। বোঝা গেলনা করোনাভাইরাস ডিএনএ-এর কাহিনী আদৌ আগের থেকে জানতো কিনা। তবে আমার কথাগুলো শুনে করোনাভাইরাস খুব একটা বিরক্ত হয়েছে বলে মনে হলো না।

“তোমরা যেহেতু আরএনএ ভাইরাস, তাই এবারে আরএনএ সম্পর্কেও কিছু বলবো। ডিএনএ’র মত আরএনএও একটি নিউক্লিক এসিড। উপাদান ও গঠনের দিক থেকে উভয়ের মধ্যে ভালই মিল থাকলেও এর গঠন কাঠামো অনেক সরল। আরএনএ এক ফিতা বিশিষ্ট। এই ফিতার মধ্যেই জমা আছে তোমাদের জেনেটিক তথ্য। শুরুতে বলেছি, ডিএনএতে সঞ্চিত সকল তথ্য প্রথমে আরএনএতে বাহিত হয়। তারপর  আরএনএ থেকে সে তথ্য অনুযায়ী প্রোটিন তৈরি হয়। তোমরা যেহেতু নিজেরা আরএনএ ভাইরাস তাই সরাসরি তোমাদের থেকে প্রোটিন তৈরি হতে পারে। সে যাই হোক জেনেটিক তথ্যের সুনিয়ন্ত্রিত প্রবহমানতার উপর নির্ভর করে দেহের সুস্থতা।”

“আরএনএ ও ডিএনএ সম্পর্কে বলতে গিয়ে জিন সম্পর্কেও বলতে হবে। জিন হচ্ছে জেনোমে ডিএনএ’র একটি টুকরো, যা ট্রান্সক্রিপশান প্রক্রিয়ায় আরএনএতে রূপান্তরিত হয়। কয়েক ধরণের আরএনএ রয়েছে। যেমন, রাইবোসমাল আরএনএ (rRNA), ট্রান্সফার আরএনএ (tRNA) ও মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA)। ওইসব জিন, যাদের মধ্যে প্রোটিন তৈরির সংকেত রয়েছে, তাদের থেকে তৈরি হয় মেসেঞ্জার আরএনএ। শুধু মেসেঞ্জার আরএনএ’র তথ্য অনুযায়ী প্রোটিন তৈরি হয়। বাকি রাইবোসমাল আরএনএ ও ট্রান্সফার আরএনএ প্রোটিন তৈরিতে সহায়তা করে। প্রোটিন তৈরির জিনকে কোডিং জিন বলা হয়। এমন জিনের সংখ্যা খুব বেশি নয়। মানুষের জন্য তার সংখ্যা বাইশ হাজারের মত। তোমাদের জন্য এই সংখ্যা মাত্র ১৫। মানুষের গোটা জেনোমের মাত্র দেড় ভাগ তথ্য কোডিং জিনের মাধ্যমে সকল প্রোটিন তৈরিতে ব্যবহার হয়। তা হলে বাকি জেনোমের কাজ কী? সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে জেনোমের প্রায় ৮০ ভাগ নন-কোডিং জিন হিসেবে কাজ করে। এরা রাইবোসমাল আরএনএ (rRNA) ও ট্রান্সফার আরএনএ (tRNA) ছাড়াও আরো নানা ধরণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরএনএ তৈরি করে। এসব আরএনএ প্রোটিন তৈরি করেনা বটে, কিন্তু জিনের নিয়ন্ত্রনে, তাদের আত্মপ্রকাশে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”

আমার কথাগুলো শুনে করোনাভাইরাস হাসলো। তবে সে আমায় বাঁধা দিল না। বললো, “বলে যাও, শুনছি তোমার কথা।”

“পঞ্চাশের দশকে যখন ডিএনএ’র গঠন কাঠামো আবিষ্কৃত হল এবং প্রাণের উদ্ভব, তার স্বাতন্ত্র ও অস্তিত্ব রক্ষায় মূল অণু হিসেবে ডিএনএ’র ভূমিকা জানা গেল, তখন বলা হয়েছিল, রেপ্লিকেশন প্রক্রিয়ায় ডিএনএ থেকে ডিএনএ, ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়ায় ডিএনএ থেকে আরএনএ, এবং ট্রান্সলেশন প্রক্রিয়ায় আরএনএ থেকে প্রোটিন তৈরি হয়। জেনেটিক কোডের এই গতি প্রবাহকে নাম দেয়া হয় ‘সেন্ট্রাল ডগমা’। ফ্রান্সিস ক্রিক যিনি জেমস ওয়াটসনের সাথে ডিএনএ’র গঠন কাঠামো আবিস্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন, তিনি ‘সেন্ট্রাল ডগমা’-এর তত্ত্বটি হাজির করেন এবং বলেন সকল জীবন্ত প্রজাতিতে তা ক্রিয়াশীল শুধু নয়, এমন ‘সেন্ট্রাল ডগমা’ একমুখী। অর্থাৎ ডিএনএ থেকে তথ্য যাবে আরএনএতে এবং আরএনএ থেকে পাওয়া তথ্য অনুয়ায়ী প্রোটিন তৈরি হবে – এর অন্যথা হবে না। আরো পরিষ্কারভাবে বললে, প্রোটিন থেকে আরএনএ অথবা আরএনএ থেকে ডিএনএ তৈরি হবে না। পরে দেখা গেল ‘সেন্ট্রাল ডগমা’ মূলত অভ্রান্ত হলেও প্রকৃতি জগতে তার ব্যতিক্রমও আছে। আরএনএ থেকে ডিএনএ তৈরির নজির পাওয়া গেল তোমাদের মত ভাইরাস নামের জীবন্ত ও অজীবন্তের মাঝামাঝি এক সত্ত্বার মধ্যে। ট্রান্সক্রিপশনের উল্টো রিভার্স ট্র্যান্সক্রিপশনের জন্য ক্রিয়াশীল ‘রিভার্স  ট্র্যান্সক্রিপটেইস’ এনজাইমের উপস্থিতি পাওয়া গেল তোমাদের মত ভাইরাসে। পরে দেখা গেল শুধু আরএনএতে সঞ্চিত তথ্য নিয়েই ভাইরাস থাকতে পারে। অর্থাৎ ডিএনএ ভাইরাস ছাড়াও আরএনএ ভাইরাস রয়েছে। শুধু তাই না, ডিএনএ ভাইরাস থেকে আরএনএ ভাইরাসের সংখ্যা অনেক বেশি। তোমরা করোনা তেমন একটি আরএনএ ভাইরাস। আরএনএ নিয়ে এত কথা বললাম আসলে তোমাদের এ কথা জানাতে যে প্রকৃতি জগতে তোমাদের মত আরএনএ ভাইরাসের গুরুত্বের কথা আমরা মানুষেরা জেনেছি।”

“সকল ভাইরাসের মত তোমরা করোনা ভাইরাসেরও রয়েছে একটি বহিরাবরণ। প্রোটিন ও স্নেহ (লিপিড) দিয়ে তৈরি এই বহিরাবরণের আকৃতি হয় নানা ধরনের। দেখতেও ভারি সুন্দর। তোমরা দেখতে আমাদের দেশের কদম ফুলের মত। ভিরিয়ন নামের বহিরাবরণে রয়েছে দ্বিস্তর বিশিষ্ট লিপিড যার মধ্যে গেঁথে আছে পর্দা বা মেমব্রেন প্রোটিন, মোড়ক বা এনভেলাপ প্রোটিন ও স্পাইক প্রোটিন। ভিরিয়নের ভেতরে থাকে জেনেটিক উপাদান। তোমাদের করোনার জন্য তা আরএনএ। ভিরিয়নের বাইরে পেরেকের আকৃতি বিশিষ্ট প্রোটিন রয়েছে। তোমাদের যে ছবিটির সাথে সবাই পরিচিত, সেখানে এমন আকৃতির প্রোটিনের উপস্থিতি সহজেই চোখে পড়ে। এদের স্পাইক প্রোটিন বলা হয়, যার বাইরের দিকের ফোলানো অংশ বা মুকুটটির জন্য তোমাদের আমরা নাম দিয়েছি করোনা ভাইরাস। তুমি জানবে হয়তো, ল্যাতিন ভাষায় মুকুটকে বলা হয় করোনা। আশা করি এই সুন্দর নামটি তোমাদের পছন্দ হয়েছে। আগে বলেছি, তোমরা শুধুমাত্র অন্য একটি জীবন্ত কোষের অভ্যন্তরে বেঁচে থাকো ও বংশ বৃদ্ধি কর। কিভাবে তোমরা অন্য কোষে প্রবেশ করো, তা আমরা জেনেছি। যখন কোন জীবকোষের উপর তোমরা বসো, তখন তোমাদের স্পাইক প্রোটিনের সাথে ওই জীবকোষের angiotensine-converting enzyme2 (ACE2) নামের বহিরাবরণ প্রোটিনের সংযোগ ঘটে। এই সংযোগ যথাযথ হলে ওই কোষের একটি প্রোটিএস এনজাইম সংযোগকৃত স্পাইক প্রোটিনকে কেটে ফেলে ও সক্রিয় করে। এর ফলে তোমরা এন্ডোসাইটোসিস প্রক্রিয়ায় জীবকোষে সহজেই প্রবেশ করতে পার। তা হলে দেখতেই পাচ্ছ আমাদের কোষে তোমাদের প্রবেশে আমরা সাহায্য করি।”

“যতদূর আমরা জানতে পেরেছি, তোমরা ছিলে চীনের উহানে। গত ৩০ জানুয়ারী ২০২০ তারিখে ‘The Lancet’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে উহানে একটি সিফুড মার্কেট, যেখানে বাদুড়, পেঙ্গোলিন (বনরুই্‌), সিভেট (গন্ধগোকুল) ও অন্যান্য বন্য প্রাণী খাদ্য হিসেবে বিক্রি হয়, সেখান থেকে ভাইরাস-জনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৯ জন চীনা নাগরিকের থেকে নেয়া নমুনায় তোমাদের দেখা মেলে। আমরা নাম দিয়েছি কোভিড-১৯। এই ভাইরাসের জেনোমের সাথে বাদুড়ের দেহের ভাইরাস যা ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাস হিসেবে মানুষের দেহে সংক্রমণ ঘটিয়েছিল তার জেনোমের মিল পাওয়া যায়। বাদুড় বা অন্য কোন প্রাণী থেকে মানব দেহে সংক্রমনের পর এই ভাইরাস অতি দ্রুত মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গবেষণা পত্রে জানা যায় কিভাবে কোষের ACE2 surface protein-এর সাথে ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের সংযোগের মাধ্যমে আমাদের কাছে নতুন তোমরা এই করোনা ভাইরাস দেহে প্রবেশ করতে পার।”

“পৃথিবীতে প্রায় চৌদ্দ হাজার প্রজাতির বাদুড় আছে। পৃথিবীতে তাদের আগমন ঘটে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগে। বাদুড় ও অন্যান্য প্রাণীদেহে প্রায় ছয় লাখের ওপর তোমাদের সমগোত্রীয় অজানা ভাইরাস বসবাস করে। যে তোমরা ছিলে বাদুড়ের দেহে, মিলে মিশে; একে অন্যের ক্ষতি করোনি কয়েক কোটি বছর ধরে, সেই তোমরা কেন বাদুড়ের দেহ ছেড়ে মানুষ বা মানুষের গৃহপালিত পশু, হাঁস-মুরগি, মাছের দেহে প্রবেশ করলে? শুধু তোমরা কোভিড ১৯ করোনা ভাইরাস নও, মানুষের দেহের দুই তৃতীয়াংশ সংক্রামক ব্যাধি যাদের মধ্যে তোমরা ছাড়াও রয়েছে সার্স, মার্স, ইবোলা, এইডস, জিকা, এইচ১এন১, রেবিস ইত্যাদি রোগের কারণ যে বিভিন্ন ভাইরাস তারা এসেছে বন্য প্রাণী থেকে অথবা তাদের মাধ্যমে আক্রান্ত অন্য প্রাণী থেকে।”

“এবারে এমন একজন বিজ্ঞানীর কথা বলবো, যিনি বহু বছর ধরে তোমাদের নিয়ে কাজ করছেন। মধ্য চীনের উহানে কর্মরত এই ভাইরাস বিশেষজ্ঞ শি জেং লি। চীনের বনাঞ্চলের পাহাড়ে-পর্বতে প্রাচীন বা পরিত্যক্ত গুহায় তিনি সন্ধান করেন বাদুড়ের। যোগসূত্র বের করতে চান বাদুড়ের দেহে বসবাস করে যে ভাইরাস তার সাথে মানুষের দেহ সংক্রমণকারী ভাইরাসের কোন মিল আছে কিনা। সম্প্রতি ‘ব্যাট ওমেন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠা এই নিবেদিতপ্রাণ বিজ্ঞানী বাদুড়ের গুহায় কয়েক ডজন সার্সের মত ভাইরাসের সন্ধান পান। তিনি সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছিলেন যে আরো অনেক ভাইরাস সেখানে আছে। তার কথা সত্য হয়েছিল।”

“৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, সকাল ৭টা। উহান ইন্সটিটিউট অফ ভাইরোলজিতে রহস্যময় রোগীর স্যাম্পল এসেছে। মুহূর্তেই ফোনে ডাক পড়লো শি জেং লি-র। ইন্সটিটিউটের পরিচালক বললেন, উহানের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রে নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হওয়া দুজন রোগীর দেহে নতুন করোনাভাইরাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানী শি’র গবেষণাগারে তা প্রমাণিত হলে, তা হবে মহা বিপদবার্তা। কারণ ২০০২-২০০৩ সালে এই ধরণের সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৮০০ রোগী মৃত্যুবরণ করেছিল। ভাবনায় পড়লেন শি ও তার গবেষণা দল। যে সব বাদুড়ের গুহায় করোনার মত ভাইরাস পাওয়া গিয়েছিল, তাদের অবস্থান তো মধ্য চীনের উহান থেকে বহু দূরে, দক্ষিণ চীনের গুয়ান্ডং, গুয়াংশি এবং ইউনান অঞ্চলে। তা হলে কি তার গবেষণাগার থেকে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন এই করোনাভাইরাস? উৎসের সন্ধান শুরু হলো। এর মধ্যেই তোমরা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে হুবেই প্রদেশে, উহান যার রাজধানী। অল্প কয়েক দিনেই শি’র গবেষণা দল নতুন করোনা ভাইরাসের সাথে মিল খুঁজে পেলেন ২০১৩ সালে ইউনান প্রদেশের শিতো গুহায় পাওয়া হর্সশু বাদুড়ের করোনাভাইরাসের সাথে। এই অঞ্চলের  গন্ধগোকুল প্রাণীর দেহে পাওয়া করোনা ভাইরাসের সাথে ৯৭ ভাগ মিল খুঁজে পাওয়া গেল দুটো ভাইরাসের জেনোমের। অন্যদিকে উহানের বন্যপ্রাণীর খোলা বাজারে খাঁচায় আবদ্ধ বাদুড় এবং বনরুই-এর দেহে পাওয়া করোনাভাইরাসের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া গেল নতুন ভাইরাসের জেনোমের। ‘ব্যাট ওমেন’ আবার প্রমাণ করলেন বাদুড় কিংবা তার থেকে সংক্রামিত অন্য পশু থেকে তোমরা করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে মানব দেহে।”

“এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যাবে প্রায় বার হাজার বছর ধরে প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত আছে আধুনিক মানুষ (হোমো স্যাপিয়েন্স) এবং তাদের সভ্যতা। মানুষের এমন বিরুদ্ধাচরণ জ্যামিতিকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে। বিশেষ করে স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রথম শিল্প বিপ্লব (১৭৬০ – ১৮৩০) শুরু হওয়ার পর থেকে। এর পর এল বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদন বহুগুন বাড়িয়ে দেয়ার দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব (১৮৭০-১৯০০)। ইলেক্ট্রনিক্স ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনে অটোমেশন তৃতীয় শিল্প বিপ্লব সূচনা করে। গত শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে তার শেষ পর্যন্ত তা চলে। ডিজিটাল বিপ্লব নামেও পরিচিত তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের উপর দাঁড়িয়ে বর্তমানে চলছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। এর বৈশিষ্ট হচ্ছে সকল প্রযুক্তির মেলবন্ধনের মাধ্যমে তাদের সীমানা মুছে ফেলা। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মুহূর্তে কোটি কোটি মানুষকে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। তথ্যের বিপুল সংগ্রহশালা গড়ে তোলা ও তার অবাধ প্রাপ্তির সাথে যুক্ত হচ্ছে অবিশ্বাস্য গতিতে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন। যাদের মধ্যে রয়েছে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, প্রাণ প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ বা যে কোন প্রজাতির জেনেটিক বৈশিষ্ট্য পাল্টে দেয়া, ন্যানো প্রযুক্তি, আইওটি (IOT বা ইন্টারনেট অব থিংগস), থ্রিডি প্রিন্টিং, কোয়ান্টাম কমপিউটিং ইত্যাদি। নতুন উদ্ভাবিত এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে অচিন্তনীয় গতিতে মানব সভ্যতা অগ্রসর হচ্ছে। তৃতীয় ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই সময়ে প্রকৃতি ও তার প্রাণ বৈচিত্র্য সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ধ্বংস হচ্ছে।

‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের’ প্রতিষ্ঠাতা ও কার্যকর চেয়ারম্যান ক্লউস শোয়াব (তাঁকে একজন পরিবশবান্ধব ভাল মানুষ বলতে পার)  ২০১৬ সালের ১৪ জানুয়ারি তারিখে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপর ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ সাময়িকীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেন। ‘The Fourth Industrial Revolution: what it means, how to respond.’ শিরোনামে এই প্রবন্ধে তিনি বলেন, প্রযুক্তির একজন উৎসাহী প্রবক্তা হয়েও এই ভাবনা আমার আসে, যে আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে যেভাবে জড়িয়ে ফেলছে, তাতে মানুষ তার অন্তর্নিহিত গুণাবলী ও সামর্থ্য, যেমন সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মনোভাব হারিয়ে ফেলে কিনা। স্মার্ট ফোনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বললেন, ‘এই ফোনের অবিরাম ব্যবহার আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ- বিরাম, চিন্তা ও অর্থপূর্ণ বাক্যালাপের জন্য কিছুটা সময়ও বরাদ্দ রাখবে কিনা’। তার প্রবন্ধের ইতি টেনেছেন তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করে, ‘শেষ বিচারে মানুষ ও তার মূল্যবোধই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সামর্থ্য আছে মানুষকে হৃদয়হীন রোবোটে পরিণত করার। কিন্তু মানুষের রয়েছে সৃজনশীলতা, সহমর্মিতা ও বিপদে নেতৃত্ব দেয়ার অপার ক্ষমতা, যা ব্যবহার করে মানুষ সমষ্টিগতভাবে এক অভিন্ন লক্ষ্যে নিজেদের উন্নিত করতে পারে মানবিক ও নৈতিক সচেতনতার এক সুউচ্চ শিখড়ে’।”

“আমরা হোমো স্যাপিয়েন্স বা প্রবুদ্ধ মানুষ অভিধায় নিজেদের পরিচিত করেছি। এই আমরাই কিভাবে তোমাদের বাধ্য করেছি আমাদের কিংবা আমাদের গৃহপালিত প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে আমাদের কঠিন রোগে আক্রান্ত করতে সে সম্পর্কে কিছু উদাহরণ দেব। ব্রাজিলের উত্তর অ্যামাজন রেইন ফরেস্টের বিশাল যে বনভূমি ছিল বাদুড় ও অন্যান্য বন্য পশুর আবাসস্থল, তা উজাড় করে গড়ে তোলা হয়েছে সাদা রঙের গরুর খামার। চারদিকে অ্যামাজনের ঘন সবুজের মাঝখানে সাদা রঙের গরুর পাল সহজেই চোখে পড়ে। যে অ্যামাজনের রেইন ফরেস্টকে বলা হত পৃথিবীর ফুসফুস, কারণ বাতাসের কার্বনডাইঅক্সাইড শুষে নিয়ে বাতাসে ছেড়ে দিত অক্সিজেন এই বনের ঘন উদ্ভিদরাজি, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে সেই অ্যামাজন গড় কার্বন শোষণের বদলে কার্বন নির্গমনকারী হিসেবে বিবেচিত হবে। ভেবে দেখেছো প্রকৃতি ও সারা বিশ্বের জন্য তা হবে কত মারাত্মক।”

“চীনের গুয়ান্ডং প্রদেশের  কিনউয়ান কাউন্টি এলাকায় বনভূমি পরিষ্কার করে বিশাল শূয়রের খামার গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মধুপুর এবং গাজীপুরের গজারি বন উজার হয়েছে। সেখানে জায়গা নিয়েছে পোলট্রি, মাছের প্রকল্প এবং টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস শিল্প। এই অঞ্চলের বনভূমি ছিল বন্য গাছ-গাছালি, পশু প্রাণী, বাদুড়, পাখি, অণুজীব ও ভাইরাসের আবাসস্থল। এর বাতাস ছিল নির্মল, নদী-খাল-ঝরনা ও নিচু জলাভুমির পানি ছিল বিশুদ্ধ টল টলে। এই প্রকৃতির মাঝখানে বসবাসরত সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বোধটি ছিল যে এই বনভূমি তাদের বেঁচে থাকার জন্য বড়ই প্রয়োজন, তাই তাকে রক্ষা করতে হবে। খোঁজ নিলে জানা যাবে বন উজাড় ও প্রকৃতি ধ্বংসের জন্য বনভূমির মানুষজনেরা নয়, মুখ্যত দায়ী সরকারী বনবিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণি- যারা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মধুপুর এবং গাজীপুরের বড় অংশ এখন আর বন্য পশু-পাখি ও অণুজীবের আবাসস্থল নয়, সেখানে বাতাসে মুরগির বিষ্ঠার গন্ধ। মাছের খামারে মাছের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পানিতে দেয়া হয় কৃত্রিম খাবার, যাতে রয়েছে শরীরের দ্রুত বর্ধনের জন্য হরমোন, রোগ-বালাই থেকে রক্ষার জন্য নানা ওষুধ ও উচ্চ শক্তির এন্টিবায়োটিক।  এই পানিও দুর্গন্ধময়। কালচারের মাছ ছাড়া এই পানিতে অন্য কোন প্রজাতি বাঁচতে পারেনা। এই অঞ্চলে নদী-খাল-জলাভূমির পানি আলকাতরার মত। টেক্সটাইল ও গার্মেন্টসের বিষাক্ত কেমিক্যাল এই পানিকে অনুপযুক্ত করেছে শুধু বন্য পশু-পাখি-অণুজীবের জন্য নয়, এখানে বসবাসরত সাধারণ গরিব মানুষের জন্যও। এইসব বড় বড় স্থাপনার মালিকদের অবকাশের জন্য অবশ্য জায়গায় জায়গায় গড়ে উঠেছে ঘন বন আচ্ছাদিত সুদৃশ্য রিট্রিট, ভূতল থেকে উত্তোলিত পরিস্কার পানি।”

“পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও আবাসস্থলের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আমরা হোমো স্যাপিয়েন্সরা ধ্বংস করেছি এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ বনভূমি- তার প্রতিবেশ। এক সময়ে এই বনভূমিতে বিচরণ করতো বন্য মোরগ, বরাহ, গয়াল, বাদুড়। তোমরা ভাইরাস তাদের কোন ক্ষতি করেনি। যখন বন উজাড় হলো, বাস্তুচ্যুত হলো বন্য পশু-পাখি-অণুজীব, তখন বাদুড় ও অন্যান্য বন্য পশু-পাখির দেহে সহঅবস্থান করতো তোমাদের মত যে অসংখ্য ভাইরাস, তারা কিভাবে বাঁচবে, নিজেদের বংশবিস্তার করবে? লক্ষ কোটি বছর ধরে যে নিরাপদ আবাসে তারা বেঁচে ছিল, তা এখন অরক্ষিত। বাদুড়, বনরুই – এসব মানুষের খাদ্য তালিকায় এসেছে। বন থেকে ধরে এনে বাজারে ছোট খাঁচায় বন্দী করা হয়েছে তাদের। মানুষের খাবারের টেবিলে চলে যাবে তারা। কী করণীয় ছিল ভাইরাসের, তোমাদের? তোমরা মানুষের দেহে আশ্রয় খুঁজেছো, সংক্রমিত করেছো খামারের শূয়োর, মুরগি ও মাছ। বন্য পশু-প্রাণীর কোষে তোমরা শুধু সহ-অবস্থান করতে, নিজেদের জীবন বাঁচাতে। আশ্রয়দাতাকে মেরে ফেলতে না। ওই সব পশু-প্রাণির রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা তা নিশ্চিত করতো। কিন্তু মানুষ বা খামারের পশু-পাখি-মাছ – এদের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থাতো তোমাদের মত নতুন ভাইরাসকে মোকাবেলার জন্য গড়ে ওঠেনি। তাই কিছু দিন পর পর নতুন নতুন ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ ও খামারে পালিত প্রাণী দলে দলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে নিতান্ত অসহায় ভাবে।”

“মানুষকে কী বার্তা দিচ্ছ করোনাভাইরাস? মারণ ক্ষমতার দিক থেকে তোমরা ইতঃপূর্বে আমাদের পরিচিত ইবোলা, নিপা, সার্স, মার্স ভাইরাসের চেয়ে কম কার্যকর। কিন্তু মানুষের দেহে প্রবেশের পর তোমরা অতি দ্রুত গতিতে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়। সারা পৃথিবীর মানবকুলের মধ্যে তোমরা ছড়িয়ে পড়েছো। প্রতিরোধের বা প্রতিকারের কোন ব্যবস্থা আমরা মানুষ এখনও গড়ে তুলতে পারিনি। আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে গৃহবন্দী করেছি নিজেদের। যানবাহন, উড়োজাহাজ, কল-কারখানা, অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছি। যে গতিতে চলছিল চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, তা আজ বড়ই মন্থর। তবে তোমাদের একথাও জানিয়ে রাখি, ভাল মানুষও এই পৃথিবীতে আছে। প্রকৃতি তথা পৃথিবীকে বাঁচাতে চান এমন বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, নীতিপ্রণেতা, শিল্পী, সমাজসেবক রাজনীতিবিদ- এরা সবাই কতবার সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু পৃথিবীর গোটা সম্পদের ৮৫ ভাগ যে ১০ ভাগ মানুষের হাতে, যাদের হাতের মুঠোয় শক্তিমান পরাশক্তির সরকার – তারা তোয়াক্কা করেনি ওইসব সাবধানবাণী। এখন তোমরা এসে বাধ্য করেছে মহা শক্তিশালী আমেরিকা ও তার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন, মোদীর ভারত ও কর্পোরেট পুঁজির মালিকদের লকডাউন-শাটডাউনে যেতে। তথাকথিত সভ্যতার চাকাকে মন্থর করতে। পারমাণবিক অস্ত্র, জীবাণু অস্ত্র, নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ড্রোন, দুর্বলের উপর পরাশক্তির চাপিয়ে দেয়া নিষেধাজ্ঞার অস্ত্র – কিছুই বশ করতে পারেনি অতি ক্ষুদ্র করোনা ভাইরাস তোমাদের। মহা আতংকে আছে মহা শক্তিধর পরাশক্তি। যে সুবচন শোনা যায়নি এসব শক্তিধরদের  মুখে এতকাল, নিতান্ত কাবু হয়ে তারা শরণাপন্ন হচ্ছে বিজ্ঞানীদের, ছুটছে টোটকার পেছনেও, দুহাত তুলে প্রার্থনা করছে যেন কোন অলৌকিক শক্তি এই যাত্রা তাদের উদ্ধার করুক। এতদিন কল্যাণ রাষ্ট্রের যে সামাজিক সুবিধাদি এরা ক্রমাগত কর্তন করেছে সমাজের ৮৫ ভাগ সম্পদ ভোগকারী ১০ ভাগ মহা বিত্তবানদের স্বার্থে, তারা আজ শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় খাতের কথা বলছে। কর্মহীন ব্রিটেনবাসীকে বেতনের ৮৫ ভাগ দেয়া ও রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসকে’ শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেছেন করোনায় আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসা প্রধান মন্ত্রী বরিস জনসন। ট্রাম্পের মুখেও অন্য সুর।”

“হাজার হাজার বছর ধরে চীনা সভ্যতায় ঐতিহ্যগত খাবার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল বন্য প্রাণী। যে ব্যবসার কাজে যুক্ত আছে এক কোটি চল্লিশ লাখ মানুষ, যে ব্যবসায় খাটে প্রায় সাড়ে ছয়শ হাজার কোটি টাকা এবং যে কারণে কখনো তা বন্ধ করা যায়নি, তোমাদের আক্রমণের ৫৫ দিনের মাথায় তা সম্পূর্ণ বন্ধের আইন জারিতে এগিয়ে এলো চীনা সরকার। ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ তারিখ। চীনা সরকার গবেষণায় ওষুধ হিসেবে ব্যবহার ছাড়া বন্য প্রাণী ধরা, ভক্ষণ বা রপ্তানি করার উপর নিষেধাজ্ঞার আইন জারি করে। অবশ্য ট্র্যাম্প, যাকে নোয়াম চোমস্কি (তোমাদের অর্থাৎ প্রকৃতির একজন সুহৃদ) দেখেন এক সমাজ-বিচ্ছিন্ন মানসিক রোগী ও ভাঁড় হিসেবে, তার পক্ষে কখনো সম্ভব হতো না চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিংপিং সরকারের মত এমন বলিষ্ঠভাবে প্রকৃতির পক্ষ নিতে।”

এক টানে অনেক কথা বলে ফেলেছিলাম। করোনা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো, “দেখা যাচ্ছে, যে কথা মনে করিয়ে দিতে আমি ফিরে এসেছিলাম, তার অনেকটাই তুমি অনুধাবন করতে পারছো।”

“আমি নিতান্ত সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক, নীতিপ্রণেতা, শিক্ষাবিদ, সমাজ সেবক, লেখকরা কি বলছেন তোমাদের সম্পর্কে? শুনে তোমরা খুশিই হবে।”

“ভারতের বরেণ্য ঔপন্যাসিক অরুন্ধতী রায় লিখেছেন  “করোনা শক্তিধরদের নত হতে বাধ্য করেছে। পৃথিবীকে সাময়িক ভাবে হলেও থামিয়ে রাখার যে কাজ অন্য কেউ কখনো পারেনি, তা সম্ভব করেছে করোনা। আমাদের মন এই ভাবনায় এখনো আচ্ছন্ন আছে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবার; যে গভীর ছেদটি ঘটে গেছে, তাকে আমলে না নিয়ে ভবিষ্যকে অতীতের সাথে আবার জোড়া লাগাবার। কিন্তু যে বিশাল পরিবর্তনটি ঘটে গেছে তাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া যাবে না। করোনার এই সময় আমাদের সামনে হাজির করেছে আমাদেরই সৃষ্ট মহা দানবীয় ব্যবস্থা যা পৃথিবীকে সমূহ ধ্বংসের শেষ সীমায় নিয়ে যাবে, তার সম্পর্কে খোলা চোখে নতুন করে ভাববার। নতুন পৃথিবীতে প্রবেশের যে পথটি খুলে গেছে, তা ধরে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারি আমাদের কুসংস্কার, ঘৃণা, লোভ, ডেটা ব্যাংক, অকেজো চিন্তা, মৃত নদী, ধোঁয়াটে আকাশকে পেছনে ফেলে। সাথে খুব বেশি কিছু নেবার দরকার নেই। হাল্কা হয়েই আমরা পথ চলবো আরেকটি পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে। তার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেব।”

মার্কিন ভাষাবিদ ও দার্শনিক নোয়াম চোমস্কির কথা তোমাকে আগে জানিয়েছি। তিনি বলেন, “করোনা ভাইরাসের ভাল দিকটি হচ্ছে মানুষ হয়তো ভাবতে শুরু করবে কেমন পৃথিবী আমাদের চাই। … করোনা-পরবর্তী সময়ে একদিকে যেমন আগমন ঘটতে পারে হিংস্র স্বৈর সরকারের, অন্যদিকে ব্যক্তিগত লোভ ও লাভের বিপরীতে সূচীত হতে পারে সমাজের এমন মৌলিক সংস্কার, যা নিশ্চিত করবে মানুষের প্রয়োজনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানবিক বিধান।

লন্ডনের থিবা মারান্ডোকে তুমি চিনবে না। কোটি কোটি ভাল স্যাপিয়েন্সের একজন সাধারণ সদস্য। সেদিন কথা হচ্ছিলো তার সাথে। কত সহজেই না থিবা বললো, “যদি এক ভাইরাসের কারণে গোটা পৃথিবী থেমে যেতে পারে, তা হলে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রজাতির বিলুপ্তি, বিষাক্ত কিটনাশক, প্লাস্টিক, বন উজাড়, সবুজ পৃথিবীকে মরুভূমি বানানো, দারিদ্র, যুদ্ধ-বিগ্রহ, দুর্বল জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতির বিনাশ ইত্যাদি ইতাদি ইত্যাদির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এত কঠিন কেন হবে?

“আরো একটি ভাল খবর দেব তোমাদের।” এ কথাটি বলতে বলতেই খেয়াল করলাম যে করোনার মুখে হাসি। কথোপকথনের শুরুতে তার মুখের কঠিন অভিব্যক্তি আর নেই।

“রোমের ভ্যাটিকান সিটিতে পোপ পায়াস ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গণিত, পদার্থ বিদ্যা ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা ও জ্ঞানতত্ত্ব চর্চার জন্য পন্টিফিকাল একাডেমি অব সায়েন্সেস (পিএস) ১৬০৩ সালে রোমের প্রিন্স ফ্রেডেরিকো চেসি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘একাডেমি অব লিঙ্কস’ এবং তার প্রধান হিসেবে বিজ্ঞানী গ্যালিলিওকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তারই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে পিএস। অতিসম্প্রতি এই একাডেমির পক্ষ থেকে পাঠানো ৬৭ জন  বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, যাদের অধিকাংশই নোবেল পুরস্কারে ভূষিত, তাদের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে  করোনার এই সময়ে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকার নির্ধারণে তাদের পাঁচ দফায় প্রস্তাব করেছেন, সংকট মোকাবেলায় আশু সাড়া ও কাজ, বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের প্রতি সহযোগিতা সম্প্রসারিত করা, গরিব ও দুঃস্থদের রক্ষা করা, সকল দেশের মধ্যে বৈশ্বিক নির্ভরতা ও সাহায্য নিশ্চিত করা এবং সকলের মধ্যে সংহতি ও সহমর্মিতা শক্তিশালী করা। চার্চের পক্ষ থেকে এলেও অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে বিজ্ঞান ও মানবিকতারপ্রতি চার্চের অঙ্গীকারের স্বাক্ষর পাওয়া যায় এই বিবৃতিতে।”

“করোনা, তোমরা তো ভাল করেই বুঝেছো যে বিজ্ঞান ও মানুষের সহজাত মানবিকতা তোমাদের কিংবা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়। চার্চের পাঠানো উপরের বিবৃতিকে তাই তোমরাসহ সবার জন্য ভাল খবর বলেছি। পৃথিবী ও মানুষের উপর তোমাদের একচ্ছত্র রাজত্বের এই সময় কিভাবে বদলে দিচ্ছে মানুষের হাতে আক্রান্ত পৃথিবীকে, তার জলবায়ু ও প্রতিবেশকে, তা নিচের ছবিটি পরিষ্কার বলে দিচ্ছে।”

“তোমাদের আগমনের আগে পরে এক মাসের ব্যবধানে স্যাটেলাইট থেকে তোলা চীন দেশের পাশাপাশি দুটো ছবি দেখে তোমাদের ভাল লাগবে। বাম পাশের ছবিতে করোনার আগে নাইট্রোজেন ডায় অক্সাইডে চীনের দূষিত ভূমণ্ডল। এক মাসের ব্যবধানে দূষণ-মুক্ত চীনের চিত্র। প্রধান পরিবেশগত সূচকসমূহ যা গত অর্ধ শতাব্দী ধরে ক্রমাগত খারাপের দিকে গেছে, তা বর্তমান লকডাউনের এই সময়ে হয় স্থিত অবস্থা বা উন্নতি করছে। কার্বন নিঃসরণের জন্য প্রধানত দায়ী চীনে ফেব্রুয়ারির প্রথম থেকে মধ্য মার্চ পর্যন্ত সময়ে তা কমে গেছে প্রায় ১৮ ভাগ। ধারণা করা হচ্ছে ইউরোপে ও আমেরিকাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমে যাবে। পৃথিবীতে শব্দ দূষণ কমে গেছে, বায়ু নির্মল। তাই পাখির কল-কাকলীতে চারদিক মুখরিত। ভ্রমর সুন্দর হয়ে ওঠা ফুলে গুঞ্জন করছে।”

সত্যি বলতে কি এতো কথা বলে অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। করোনাও অনেকক্ষণ ধরে চুপ। জিজ্ঞেস করলাম, “কিছুই কি আর বলার নেই তোমার?” জবাব দ্রুতই এলো।

“সারা পৃথিবীতে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে তোমাদের মৃত্যুর কারণ হয়েছি, তোমাদের আতঙ্কিত করেছি। তোমরা নিজেদের গৃহবন্দি করেছো, লকডাউন, শাটডাউনে গেছ। কিন্তু তা কেন, কোন উদ্দেশ্যে করেছি? তোমাদের মানুষের কথাগুলো শুনে আমিতো ভালই আশা-ভরসা পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, আমাদের কারণে মানুষের মৃত্যু, কষ্ট, নানাবিধ সংকট – এসবের বাইরেও আরো গভীর চিন্তা তোমাদের মাথায় ভিড় করছে। তাতো করবেই। চিন্তা করাই তো হোমো সেপিয়েন্সের কাজ। করোনার ‘দুঃসময়’ কেটে যাবার পর অতি দ্রুত তোমাদের মধ্যে ক্ষমতাবান শক্তিধরেরা আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে। মানুষ ও প্রকৃতির উপর তাদের অন্যায় শাসন আবার চাপিয়ে দেবে, এমনসব দুশ্চিন্তা তোমাদের ভাবিয়ে তুলছে। তার কারণও আছে। অতীতে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করেনি। বিপদ কেটে যাবার পর আবার স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। যা তোমাদের বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও চিন্তকদের কঠিন চিন্তায় ফেলেছে, তা হলো, এবারে ভুল করলে মহা বিপদ। গোটা সেপিয়েন্সের বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা। ইতোমধ্যে ট্রাম্প ও তার ভাবশিষ্য ‘ট্রপিক্যালের ট্রাম্প’ হিসেবে পরিচিত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর বেশ কিছু উন্মাদ সিদ্ধান্ত তেমন সম্ভাবনাকে বাস্তব করে তুলছে।”

“আমাদের আরেকটি ক্ষমতার কথা তোমরা জান। তা হলো আমরা  সহজেই  নিজেদের রূপ পরিবর্তন করতে পারি। প্রকৃতি আমাদের সেভাবেই সহজ করে তৈরি করেছে। আমরা আরএনএ ভাইরাস। ডিএনএ’র সাথে তুলনায় আমাদের গঠন খুবই সরল। তাই সহজেই আমাদের গঠনে মিউটেশন হতে পারে। বিরূপ পরিবেশে আমরা সহজেই মিউটেশনের মাধ্যমে রূপ পরিবর্তন করে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার পথ বের করি। আমাদের এই সামর্থ্যের কথা তোমাদের স্মরণ করিয়ে দিলাম এজন্যে যে আমাদের বিরুদ্ধে নতুন ভ্যাকসিন বা আমাদের বিরুদ্ধে ওষুধ বের করেই যে তোমরা রক্ষা পেয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। সাময়িক কালের জন্য তোমাদের মনে হবে তোমরা জিতে গেছো। কিন্তু হে মানবকুল, এবারেও যদি তোমাদের শিক্ষা না হয়, তবে এর পরের বার আমরা আসবো আরও ভয়ংকর হয়ে। তা চলতেই থাকবে যতক্ষণ না পর্যন্ত হোমো স্যাপিয়েন্সরা পৃথিবীর বুক থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত না হয়।”

“তোমরা তো হোমো স্যাপিয়েন্স বা প্রবুদ্ধ মানুষ। সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজাতি। সেজন্যেই পৃথিবী ও তার প্রকৃতি জগতকে তোমরা শাসন করছো। তার সমূহ সর্বনাশও করছো তোমরা। কিন্তু একবার ভেবে দেখ, এই পৃথিবী থেকে তোমাদের বিলুপ্তি ঘটলে প্রকৃতি জগতের কী কোন ক্ষতি হবে? না, কিছুই হবে না। বরং মানুষের হাত থেকে নিস্তার পেয়ে প্রকৃতি স্বউদ্যোগে তার ক্ষতগুলো নিরাময় করে তুলবে। অন্যদিকে সালোক সংশ্লেষণে রত উদ্ভিদরাজি যদি বিলুপ্ত হয়, যদি এই কাজে নিয়োজিত এক কোষী সায়ানোব্যাকটেরিয়া বিলুপ্ত হয়, যদি উদ্ভিদের বংশবিস্তারের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পরাগায়নে সতত নিয়োজিত কীট-পতঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে যায়, তা হলেতো প্রাণময় পৃথিবী বিরাণভূমিতে পরিণত হবে। সেজন্যেই বলছি এবারে দানব হোমো স্যাপিয়েন্সরা যেন অতীতের মত আবারো পৃথিবী শাসনের সুযোগ না পায় সে ব্যাপারে তোমাদের অতি দ্রুত কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। সময় তোমাদের হাতে কম। আমরা করোনাভাইরাস, প্রকৃতি জগতের সবচেয়ে নগন্য এক সত্তা। খুব বেশি সময় ট্রাম্পের মত আগ্রাসী মানুষদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবো না আমরা। তোমাদের বিজ্ঞানীরা আমাদের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন তৈরির জন্য দিনরাত কাজ করছে। আমাদের দ্বারা আক্রান্তদের সারিয়ে তোলার  কার্যকর ওষুধও বের হবে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মেধা, শ্রম ও নিরবিচ্ছিন্ন সাধনায় উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন ও ওষুধ যখনই ট্রাম্পের মত  বা কর্পোরেট পুঁজির মালিকদের হাতে পড়বে, তখনই তারা প্রকৃতির বিপদ সংকেতকে  আর তোয়াক্কা করবে না। আমি ভেবে দেখেছি, খুব বড় জোর ছয় মাস পরাশক্তি তোমাদের মত ভাল মানুষদের কথা শুনবে, তাকে গুরুত্ব দেবে। তাই পৃথিবীর সকল দেশের মানুষ ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মৌলিক সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে হবে। যা মেনে চললে প্রকৃতিজগত ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠবে। আমরা করোনাসহ সকল প্রজাতি মিলেমিশে গড়ে তুলবে সমতার পৃথিবী।”

গভীর মনযোগে করোনার কথাগুলো শুনছিলাম। ঠিক করলাম কথা আর বাড়াবো না। যা বোঝার বুঝে গিয়েছি। তার শেষ কথা কানে ভাসছে। করোনা বললো-

“তুমি বলছিলে দার্শনিক নোয়াম চমস্কি’র কথা। মানুষ অজেয়, করোনা মহামারীতে মানুষ জয়ী হবেই এমন একটা প্রপঞ্চ প্রায় শতভাগ হোমো স্যাপিয়েন্সের আছে। চমোস্কি-র মত দার্শনিকও হয়তো এমন চিন্তার বাইরে নন। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে মানুষের জয়ী হওয়া নয়, প্রকৃতির জয়ী হওয়ার ভাবদর্শনে বিশ্বাসী হয়ে যদি মানুষ লড়াইটি চালায়, তাহলেই মাত্র সমতার পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সেদিন সত্যিকার অর্থেই হোমো স্যাপিয়েন্স হয়ে উঠবে মানুষ প্রজাতি।”

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন : ইউজিসি অধ্যাপক, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সুত্র : বিডিনিউজ২৪.কম

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন