করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা: একটি বিস্ফোরণোন্মুখ টাইমবোমা


এপ্রিল ২৩ ২০২০

নুরুল আলম মাসুদ

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলা, কৃষির বাণিজ্যকীকরণ, জনগণের খাদ্য অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অনুপস্থিতি এবং রাজনীতিতে খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ফলে দীর্ঘকাল ধরেই এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারি কেবল সঙ্কটকে আরও উদগিরণ করেছে মাত্র

ইতোমধ্যে সারা পৃথিবীর দেড় লাখেরও বেশির মানুষের জীবন সংহারি এবং ২৩ লাখেরও বেশি সংক্রামিত করা করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে নিজেকে জাহির করেছে। লকডাউনের মধ্যে পড়েছে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ। যদিও করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে সামনে এসেছে, এটি সমানভাবে একটি বিশাল অর্থনৈতিক সংকট; যা  অনুসরণ করবে মন্দা, খাদ্যাভাব এবং অস্থিতিশীলতা। ইতোমধ্যে  জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা (এফএও) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বিশ্বজুড়ে জারি করা লকডাউনের জেরেই অনভিপ্রেত খাদ্যের সংকট তৈরি হতে পারে। খাবারের অভাব এখন বোঝা না গেলেও লকডাউনের পর খাদ্যের প্রকট অভাব দেখা দিতে পারে। দেখা দিতে পারে দুর্ভিক্ষ। বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশের জন্য এই সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। পিপিআরসি ও বিআইজিডি করা এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, “চলমান সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিপর্যয়ে পড়েছেন দেশের মাঝারি, অতিদরিদ্র মানুষ। এতে নতুন এক দরিদ্র শ্রেণির সৃষ্টি হচ্ছে। শহরাঞ্চলে ৮২ শতাংশ ও গ্রামে ৭৯ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। তারা খাবারের জন্য ব্যয় কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। শহরাঞ্চলে মানুষের খাবারের পরিমাণ কমে গেছে ৪৭ শতাংশ, গ্রামে কমেছে ৩২ শতাংশ।” জরিপের সারাংশ বলছে পরিস্থিতি এমন যে, এ মাসের শেষের দিক থেকে দেশের বিপুলসংখ্যক নিম্নআয়ের মানুষ বড় ধরনের খাদ্য সংকটে পড়বে।

তবে, বিশ্বব্যাপী নয়া উদারবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো “করোনাভাইরাস”কে ঘিরেই হুট করে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিবে বলে যে “নতুন আতঙ্ক” আমদানি করছে তা একদমই ভিত্তিহীন। বাস্তবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলা, কৃষির বাণিজ্যকীকরণ, জনগণের খাদ্য অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অনুপস্থিতি এবং রাজনীতিতে খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ফলে দীর্ঘকাল ধরেই এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। আর করোনাভাইরাস মহামারি কেবল সঙ্কটকে আরও উদগিরণ করেছে মাত্র। মনে রাখতে হবে, সরকারি তথ্য মোতাবেকই দেশের প্রায় পৌনে ৪ কোটি মানুষ (দরিদ্র ২১.৮ শতাংশ) পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ করতে পারতেন না। আর প্রায় ২ কোটির (অতি দরিদ্র ১১.৩ শতাংশ) কাছাকাছি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার কেনার জন্য প্রয়োজনীয় আয় করতে পারতেন না। তারমানে, খাদ্য নিরাপত্তার  সঙ্কট আগ থেকেই ছিলো। বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সূচক ২০১৯ অনুযায়ী ১২৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৩তম- আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিন্ম।  করোনাভাইরাস দুর্যোগ আমাদের এই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিকে আরও ঘনীভূত এবং দীর্ঘমেয়াদী করবে। দুই হাজার ৬৭৫ জনের ওপর পরিচালিত ব্র্যাকের সাম্প্রতিক এক জরিপে  দেখা যায়, জরিপকালীন ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে কোনো খাবার ছিল না। ২৯ ভাগের ঘরে ছিল এক থেকে তিন দিনের খাবার-এর তথ্য সেই ইঙ্গিতই বহন করছে।

বাংলাদেশের মোট খাদ্য চাহিদার ৯৫ শতাংশের যোগানদাতা কৃষকের মধ্যে খানা হিসেবে তাদের ৮৮.৪৮ শতাংশই প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, এপ্রিল ও মে মাস কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় মৌসুম;  এই মৌসুমে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন কৃষিপণ্য বাজারে আসার কথা ছিলো। কিন্তু চলমান লকডাউন পরিস্থিতিতে কৃষকের উৎপাদিত বেশিরভাগ ফসলই মাঠে নষ্ট হচ্ছে। দেশের চালের প্রায় ৬০ শতাংশ যোগান আসে বোরো থেকে- সেটিও শ্রমিক না পাওয়ায় কাটতে না পারা এবং আসন্ন পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে দেশের ডেইরি, পোল্ট্রি  খাতে। ক্ষুদ্র উৎপাদকদের এই অর্থনৈতিক ক্ষতি সন্দেহাতীত ভাবে তাদেরকে আরও দারিদ্র্য অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে,  যা আগামী সময়ে দেশের কৃষিজ উৎপাদন কমিয়ে দেবে। 

একই সাথে, করোনাভাইরাসের কারণে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাত তৈরি পোষাক শিল্প এবং প্রবাসী আয়ে ব্যাপক ভাবে ধাক্কা লাগবে। বেকারত্বের শিকার হতে পারেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক কোটিরও বেশি প্রবাসী রয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তাদের মধ্যে আড়াই লাখ প্রবাসী বিদেশ থেকে ফেরত এসেছে। এরা আবার বিদেশে ফেরত যেতে পারবে কিনা সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আবার নতুন করেও কোথায় কেউ যেতে পারছে না। ফলে, বেকার প্রবাসীরাও আমাদের মোট বেকারত্বের মিছিলে যোগ দেবে। 

কোনো সন্দেহ নেই, ২০০৮ সালের মন্দার চেয়েও আমরা আরও বড় একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। কোভিড-১৯ মহামারির সাথে আসা বিশ্বব্যাপী খাদ্য ব্যবস্থার চরম অস্থিরতা বিগত মন্দার চেয়ে আরও বেশি দুর্বিপাক তৈরি করবে। অতি-উদারবাদী বৈশ্বিক খাদ্য বাণিজ্য মানুষের বর্তমান চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়- তা আমরা সেনাশাসিত সরকারের সময়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। সেই সময় খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং হাতে টাকা থাকলেও বিদেশ থেকে চাহিদা মতো খাদ্য কিনতে না পারার অভিজ্ঞতা থেকেও আমাদের সরকারগুলো কৃষি এবং খাদ্য উৎপাদন সম্পর্কিত নিওলিবারেল প্রকল্পসমূহ নিয়ে কোনো ধরনের সংরক্ষণমূলক কার্যক্রম তো গ্রহণ করেইনি বরং কৃষিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হ্রাস এবং বাণিজ্যিকীকরণের জন্য কাজ করছে।

আগাম বন্যার হাত থেকে হাওরের ধান রক্ষা করা যাবে কিনা তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছে কৃষক। ঢাকা ট্রিবিউন

জনগণের খাদ্যের অধিকারের নিশ্চয়তা এবং খাদ্য সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার প্রদানসহ জননীতিতে মৌলিক পরিবর্তন না হলে বর্তমান বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সঙ্কট সম্ভাব্যভাবে ক্ষুধার সংকটে পরিণত হতে পারে। করোনাভাইরাস হয়তো একটা সময় হেরে যাবে, কিন্তু খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার এবং সাধ্যের মধ্যে খাদ্য পাবার নিশ্চয়তা রাষ্ট্র কতটা নিশ্চিত করতে পারবে তা বারবার সামনে চলে আসছে। এ জন্য মহামারির মধ্যেও রাষ্ট্র নাগরিকদের খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কিছু নীতিগত প্রস্তাবনা তুলে ধরছি: 

লকডাউন চলাকালীন নাগরিকদের খাদ্য অধিকারের নিশ্চয়তা 

মহামারির মধ্যেও নাগরিকদের মানবাধিকারে গ্যারান্টি রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হয়। তাই করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে মানুষের খাদ্য অধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষত: দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, গৃহকর্মী,ভাসমান মানুষ, রিক্সাশ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, ছোট দোকানি, হিজড়া-সম্প্রদায়সহ সকল অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং ঝুকিপূর্ণখাতে কর্মরত শ্রমিককে সরাসরি খাদ্যভর্তুকি প্রদান করা। প্রচলিত ত্রাণ কার্যক্রমের বাইরে এইসব মানুষের জন্য পারিবারিক রেশন প্রদান করা যেতে পারে। একই সাথে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী চার কোটি মানুষের জন্য সপ্তাহভিত্তিক নিঃশর্ত নগদ অর্থসহায়তা করা যেতে পারে। শহুরে দরিদ্র এবং গৃহহীন জনগোষ্ঠীর কোয়ারেন্টিন পালন নিশ্চিত করতে হলে, তাদেরকে অবশ্যই নিরাপদ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ পর্যাপ্ত খাবার দিতে হবে।

আভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন জোরদার করা

একটিখাদ্য সার্বভৗম এবং শক্তিশালী দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থাই বাজার মূল্যের অস্থিরতার বিরুদ্ধে সেরা সুরক্ষাকবচ হতে পারে। এ জন্য চলতি বোরো মৌসুমে সরাসরি কৃষকের মাঠ থেকে সরকারিভাবে ধান ক্রয় করতে হবে। শ্রমিকের অভাবে যেন ধানকাটা ব্যাহত না হয়- সে জন্য সরকারিভাবেই শ্রমিক যোগানের ব্যবস্থা করতে হবে। উৎপাদন চলমান রাখতে কৃষি উপকরণ ভর্তুকি সরাসরি প্রান্তিক কৃষকের ব্যাংক হিসাবে প্রেরণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু গত মার্চে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৬০ শতাংশ কম, দেশের ফসলের সবচেয়ে বড় এই মৌসুমে মাঠে আলু, সবজি ও সরিষা রয়েছে, যেগুলোতে সেচ দিতে হচ্ছে। এক্ষেত্র ক্ষুদ্র কৃষকদের যারা নিজেরাই শ্যালো মেশিনে ইরিগেশন করে, তাদেরও ডিজেল ক্রয়ের জন্য জরুরিভাবে নগদ সহায়তা দিতে হবে।

স্বানীয়ভাবে কৃষক বাজার নির্মাণ এবং সহায়তা

গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খাদ্য উৎপাদনকারীদের নেতৃত্বে স্থানীয়ভাবে বাজার গড়ে তুলতে হবে এবং দলীয় ক্যাডার এবং দালাল/ফড়িয়াদের নিয়ন্ত্রেণর বাইরে এইসব বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এইসব বাজারের মাধ্যমেই কৃষক স্থানীয় কৃষি উপকরণের যোগান দেবে একই সাথে নিজেদের উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে শহুরে ভোক্তাদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ তৈরি করতে হবে। বিকেন্দ্রীকৃত পদ্ধতিতে কৃষিপণ্য বিনিময়ের সুবিধার্থে স্থানীয়ভাবে ক্রয়বিক্রয়ের বাজারস্থাপনে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। এর সাথে সাথে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত সুবিধার্থে ক্ষুদ্র কৃষক এবং ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীদের ছোট শহর এবং নগরকেন্দ্রগুলোতে প্রবেশের সুযোগ করে দিতে হবে।

জাতীয় খাদ্য মজুদ জোরদার করা 

কৌশলগতভাবে জাতীয় খাদ্য মজুদ জোরদার করতে হবে। খাদ্যের মূল্য নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে অবশ্যই কৌশলগত জাতীয় সংরক্ষণাগার স্থাপন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। সরকারিভাবে এই বছর ১৯ লাখ মেট্রিক টন ধানচাল ক্রয় করার কথা বলা হয়েছে, যা মোট উৎপাদনের মাত্র ১০ শতাংশ। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখার স্বার্থে সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কমপক্ষে ২৫ লাখ মেট্রিক টন ধানচাল ক্রয় করা প্রয়োজন। অর্থকরী ফসল হিসেবে পেঁয়াজ, গম, সরিষা, মসুর, ছোলা, মটর, খেসারি তোলার সময়েই লকডাউন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কৃষিপণ্যের বাজারজাতের জন্য কোনো ব্যবস্থা সরকার নেয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, আলু তোলার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকার কারণে ১০৮ লাখ টন আলু তোলার যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তার মধ্যে ৯৭.৬ লাখ টন তোলা হয়েছে। তবে পেঁয়াজ তোলার সময়ে লকডাউন শুরু হওয়ার কারণে ২৩.৮ লাখ টন পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তোলা হয়েছে মাত্র ৯.৭৩ লাখ টন। এক্ষেত্রে সরকারকে এই সকল ফসল ক্রয় এবং মজুদের সীমা বাড়াতে হবে। প্রধান খাদ্য নয় এমন শস্য আমদানি এবং জৈব জ্বালানি উৎপাদনে স্থগিতাদেশ প্রবর্তন করতে হবে।

কৃষিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি

বাংলাদেশের কৃষিতে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিকরণ এবং পুঁজি যোগান হলেও তা ক্ষুদ্র কৃষকের নাগাল পায়নি। এমনকি কৃষিতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা রয়েছে। প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের আকার বাড়লেও কৃষিখাতে বরাদ্দ কমছে। আসন্ন মন্দা মোকাবিলায় কৃষিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত: দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উৎপাদন বাড়াতে; দ্বিতীয়ত: গ্রামভিত্তিক কৃষি অর্থনীতি এবং প্রবৃদ্ধি তৈরিতে; তৃতীয়ত: করোনাভাইরাস সংকটের কারণে বেকরত্ব মোকাবিলায় কৃষিতে কর্মসংস্থান তৈরির করার জন্য কৃষিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ জোরদার করতে হবে। জাতিসংঘ ২০১৯-২৮ সালকে পারিবারিক কৃষি দশক হিসেবে ঘোষণা করেছে। পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে পারিবারিক কৃষিতে বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় কৌশল প্রণয়ন করত হবে। 

কৃষিজমি সুরক্ষা

প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদী রাখা যাবে না। কিন্তু, জমি থাকলে তবেই আবাদের প্রশ্ন আসবে। সরকারি হিসাব মতে, প্রতি বছর কৃষিজমি এক শতাংশ হারে কমছে। কৃষিজমি সুরক্ষার জন্য সরকার ২০২৫ সালে “কৃষিজমি সুরক্ষা এবং ভূমি ব্যবহার আইন” তৈরি করেছে। কিন্তু, দুঃখজনকভাবে আইনটি এখনো খসড়াতেই থেকে গেছে, আলোর মুখ দেখেনি। অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে কৃষিজমি অকৃষিতে ব্যবহার রোধ করতে হবে এবং কৃষিজমি সুরক্ষা এবং ভূমিব্যবহার আইন প্রণয়ণ করতে হবে।

স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা

খাদ্য নিরাপত্তাহীনদের ক্ষমতায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বৈষম্যহীনতা, সমতা এবং সুশাসনের নীতির ভিত্তিতে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কোভিড-১৯ সংকটে জনগণের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে রাষ্ট্র ও সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, মজুদদারি, ত্রাণ চুরি কিংবা মানুষের খাদ্য অধিকারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। খাদ্য সুরক্ষা এবং সামাজিক ন্যায় বিচারের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর সাথে সামঞ্জস্যতা নিশ্চিত করতে জবাবদিহিতা কার্যকর করতে হবে। প্রশাসন এবং সরকারদলীয় সংগঠনের মাধ্যমে সরকার কোভিড-১৯ মোকাবিলা করতে চাইছে। কিন্তু, এই সংকটকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করে সকল স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণে জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কোভিড-১৯ মহামারি বৈশ্বিক পুঁজিবাদী খাদ্যব্যবস্থার অন্যায্য, অস্থিতিশীল, অসমচরিত্রকে স্পষ্ট করে দিয়ে বিশ্বব্যাপী খাদ্যব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়াটি পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করেছে। এক্ষেত্রে, জমিও অন্যান্য উৎপাদনশীল সম্পদের ন্যায্যবন্টনই হবে মহামারি ও খাদ্য সংকট এড়ানোর অব্যর্থ উপায়। মানুষের খাদ্য পাওয়ার অধিকারকে জোরালোভাবে গুরুত্ব না দিলে বৈশ্বিক মহামারির মধ্যে খাদ্য সংকট হবে বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা একটি টাইম বোমার মতো।

নুরুল আলম মাসুদ

সাধারণ সম্পাদক, খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি), বাংলাদেশ

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন