সাতক্ষীরার রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনপ্রত্যাশা


ডিসেম্বর ২৩ ২০১৯

Spread the love


অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী
সাতক্ষীরা দেশের শেষ প্রান্তের উপকূলীয় জেলা। বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেসে গড়া ওঠা বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের পুরোটা শ্যামনগর উপজেলাতে বিদ্যমান। চিংড়িচাষকে কেন্দ্র সংঘটিত নানা ঘটনার কারনে পরিবেশ-প্রতিবেশবাদীদের আলোচনায় থাকলেও উৎপাদনশীলতা ও সম্ভবনাময় আর্থিক ক্ষেত্র হওয়ার বাস্তব অবস্থা এখানে বিদ্যমান। প্রবাহমান প্রধান দুই নদী ও সাগরযুক্ত সাতক্ষীরার মাটির উর্ব্বরতা দেশের অন্য যে কোন এলাকা থেকে অনেক বেশি।
মাছ, গোলপাতা, গরান, মোম, মধু নিয়ে বিশাল সম্পদের ভান্ডার সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে ১০ লক্ষাধিক পরিবারের জীবন-জীবিকা আর্বতিত হয়ে থাকে। কৃষি ফসল বিশেষ করে ধান চাষে জেলার প্রায় এক তৃতীয়াংশ জমি চিংড়িচাষ ও জলবদ্ধতার কবলে বছরের বেশির ভাগ সময় থাকলেও জেলার চাহিদার অনেক বেশি ধান উৎপাদন করে কৃষকরা। আম উৎপাদন ও সরবরাহে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা সাতক্ষীরা। বর্তমানে আমা দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন দেশের বাইরে রপ্তানি হচ্ছে বিপুল পরিমাণে। প্রক্রিয়াজাত চিংড়ি রপ্তানির মাধ্যমে জাতীয় রাজস্বের সিংহ ভাগ অর্জনকারী জেলা সাতক্ষীরা। সাদা মাছও দেশের চাহিদার বেশিটা সাতক্ষীরায় উৎপাদিত হয়। আর্ন্তজাতিক স্তরে মাটির টালির প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সাতক্ষীরার কলারোয়া শক্তিশালী অবস্থানে। কুল, খেজুরের গুড় তো আছেই। কাঁকড়া উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র সাতক্ষীরার শ্যামনগর অঞ্চল। কাঁকড়া আজ দেশের অন্যতম রফতানি পণ্য।দেশের হাসপাতালগুলোতে ব্যবহারকৃত ব্যান্ডেজের পুরোটা সাতক্ষীরার নলতায় উৎপাদিত হয়। দেশের বিখ্যাত জামদানি শাড়ির কারচুপি ও চুমকির কাজে নিয়োজিত সাতক্ষীরার বিপুল সংখ্যক নারী। পর্যটনের জন্য সুন্দরবন ভ্রমণে সরাসরি সড়ক পথে সাতক্ষীরা একমাত্র এলাকা। প্রাকঐতিহাসিক নিদর্শনের অবস্থান দেশের অন্য যেকোন প্রান্ত থেকে কম দূরত্ব নয়, বরং সেখানে অনেক ক্ষেত্রে বেশি। মুঘল আমলের বারো ভূঁইয়ার অন্যতম এক ভুইয়ার রাজ্য সাতক্ষীরা অঞ্চলে। আছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির মানুষের জনপদ। এক নান্দনিক স্থাপত্য শিল্প নলতাতে খানবাহাদুর আহসান উল্লাহ (র:) মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে।
সাতক্ষীরার সম্ভবনাময় চিত্র সরকারের উর্দ্ধতন মহলে তুলে ধরার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে এমন দৃশ্যমান ঘটনা বিরল। বিগত সময়ে তৎকালিন বস্ত্রমন্ত্রী সুন্দরবন টেক্সটাইলস মিলস এবং সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ ও নলতায় প্রতিষ্ঠিত সরকারি নাসিং ও ম্যাট প্রতিষ্ঠায় তৎকালিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। অবশ্য ইতোমধ্যে সাতক্ষীরায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। যেমন এল্লাচরে চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্র, শহরের তালতলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিনেরপোতায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ট্রেনিং একাডেমীসহ বিনেরপোতায় কৃষি গবেষণা কেন্দ্রসহ বেশ কয়েটি স্থাপনা। এছাড়া সাতক্ষীরা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনেকগুলো স্থাপনা। স্থাপিত এসব প্রতিষ্ঠান সরকারের রুটিন কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব কাজ বাস্তবায়নে জেলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উল্লেখযোগ্য কোন ভুমিকা আছে এমনটি সাধারন মানুষ মনে করেন না। বরঞ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সাইক্লোন সেন্টার নির্মাণে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনৈতিক খরর অনেক বেশি প্রচার হয়।
সাতক্ষীরা এখন রাষ্ট্র কতৃক প্রকাশিত দরিদ্রতম জেলাগুলোর মধ্যে প্রথম দিকে। সম্ভবনা থাকা স্বত্ত্বেও সরকারি বিশেষ পরিকল্পনার সাথে স্থানীয় দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ সম্পর্কযুক্ত না করতে পারায় এক বিপুল সংখ্যক পুরুষ জনসংখ্যা এলাকা থেকে চলে গেছে দূর দেশে কাজের সন্ধানে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকিতে থাকায় সরকারের বিশেষ দৃষ্টি এখানে আকর্ষিত হওয়া স্বাভাবিক। এ স্বাভাবিক কাজটি ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচিত নীতিনির্ধারক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা করছেন, সাধারন মানুষ এমনটা মনে করেন না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত কাজগুলোর মধ্যে সরচেয়ে প্রয়োজনীয় নাভারণ থেকে মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত রেল লাইন স্থাপন বিষয়ে কোন খবর নেই। অথচ ইতোমধ্যে সরকার স্বপ্রণোদিতভাবে প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন করেছে।
জলাবায়ু পরিবর্তনের ফলে সরকারি বরাদ্দের যে নায্য পাওনা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় বেশির ভাগ অন্য এলাকায় চলে গেছে বিগত সময়। এবারের বাজেটে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকার ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের কর্মসংস্থান, জলবায়ুসহিষ্ণু স্থাপনা নির্মাণের জন্য ব্যাপক অর্থ বরাদ্দ প্রদান করেছে। অথচ সাতক্ষীরার নীতিনির্ধারক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সে খবর রাখেন কি-না সেটা একটি কঠিন প্রশ্ন। সরকার জেলা বাজেটের বিষয়ে বেশ আন্তরিক। কিন্তু সাতক্ষীরা একটি পিছিয়ে থাকা ও জলবায়ু ঝুকিতে থাকা জেলা হিসেবে জাতীয় বাজেটের ন্যায্য হিস্যা সাতক্ষীরার যেটুকু পাওনা সেটুকুর অর্ধেকও আজ অবধি সাতক্ষীরায় আসেনি, উন্নয়ন কার্যক্রম হিসেবে বাস্তবায়িত হয়নি।
সুন্দরবন জাতীয় সম্পদ। এ সম্পদকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় ররাদ্দের সিংহভাগ নিতে একটি জোরালো জনবান্ধন ও পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি। জরুরি দরিদ্রতম জেলার দারিদ্র বিমোচনে সুদূরপ্রসারী কর্মসূচি গ্রহণ। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ-খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজন জোরদার প্রচারণা ও কর্মসুচি গ্রহণ।
রাজনৈতিক ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে জেলাকে সামনে নিতে, এলাকায় কর্মসংস্থানের পথ উম্মুক্ত করে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের এলাকা ত্যাগ বন্ধ করা, জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে পরিকল্পিত পরিবেশবান্ধব উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, ডেল্টা প্ল্যানের সাথে সঙ্গতি রেখে নদ-নদীর স্থায়ী নাব্যতা সৃষ্টি ও জলবদ্ধতামুক্ত জনপদ গড়েতে একটি মাস্টার প্লান তৈরির দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের প্রতি সাতক্ষীরাবাসীর প্রধান চাওয়া।
সাতক্ষীরার জনগণের প্রত্যাশাজেলার নীতি প্রণেতা রাজনৈতিক নেতৃত্ব সরকারের উর্দ্ধতন মহলে সাতক্ষীরার সংকট ও সম্ভবনার ক্ষেত্র তুলে ধরতে জাতীয় সংসদসহ সকল মহলে চিঠি দিয়ে (ডিও) নজরে আনা এবং একই সাথে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সারসংক্ষেপ তৈরি করা এবং তা প্রেরণে যতœশীল হবেনÑজনপ্রতিধি ও রাজনীতিবিদদের প্রতি এমটাই প্রত্যাশা সাতক্ষীরাবাসীর।
সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক দক্ষিণের মশাল

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন