মানবাধিকারের সংস্কৃতি নেই বলে বিচারহীনতা বেড়েছে: সুলতানা কামাল


ডিসেম্বর ৩১ ২০১৯

Spread the love

সাবেক তত্তা¡বধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এড. সুলতানা কামাল বলেছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধ করে ৯ মাসে বিজয় অর্জন করেছি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মানবিক মর্যাদার কথাটি পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানকে বলা হয় পৃথিবীর অন্যতম ভালো সংবিধান। সেটা বলা হয়, এ কারণে এখানে মানুষের মৈলিক অধিকার, মানববাধিকারসহ সব কিছু স্পষ্টভাবে লিখে দেওয়া হয়েছে। এখন বলা হচ্ছে, এসডিজিতে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। কিন্তু সংবিধানে সেটা অনেক আগেই বলা হয়েছে। বাংলাদেশের কোন পরিচয়ের মানুষ কোনভাবে পিছিয়ে থাকবে না। সেটা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছিলো। রাষ্ট্রের যে অন্যতম উপাদান জনগণ। আমরা সেটা ভুলতে বসেছি। শুধু যে রাষ্ট্রের পরিচালনার দায়িত্ব আছে, তারা না আমরাও নিজেরাও ভুলে গেছি যে আমরা রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান। একটি ভুখন্ড দিয়ে রাষ্ট্র হতে পারে না। আমরা আত্মবিস্মৃত হয়ে গেছি। আত্মবিস্মৃতি হওয়ার বিভিন্ন অর্থ আছে। যদি এটা করে থাকি তাহলে আমরা একুশের চেতনার সাথে বিশ^াস রাখতে পারিনি। আমরা একুশের চেতনা বলতে আমরা কি বলেছিলাম, আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে চাই। আমার পরিচয়টা আমি ধরে রাখতে চাই। আমার পরিচয়ের উপর আক্রমণ, আমি হতে দেব না। নিজেকে রক্ষা করার বিরাট একটি আকুতি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি শুরু করলাম ভাষা আন্দোলন। সেটি শুধু নিজের জন্য করলাম না, সবার জন্য করলাম। সে কারণে সেটা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেলো। এর পরে বিভিন্ন আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি।
সোমবার বিকেলে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের স. ম আলাউদ্দিন মিলনায়তনে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন সাতক্ষীরা জেলা শাখার আহবায়ক এড. আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্ব করেন।
সুলতানা কামাল আরও বলেন, যে শহরের মানুষ কারো মৃত্যুতে বিচলিত হয় না, সে শহরে মানুষ বাস করতে পারে না। আমরা যদি সেটাকে সেভাবে দেখার চেষ্টা করি, যে দেশে মানববাধিকার লঙ্ঘন হতে থাকে এবং বিনা বিচারে মানুষ মারা যাচ্ছে, সে দেশে কিভাবে মানুষ বাস করে। মানুষকে বসবাস করতে হলে সেই পরিস্থিতি বলবার চেষ্টা করতে হবে। বর্তমানে আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে ঢুকে গেছি, রাজনীতির মধ্যে যদি সংস্কৃতি না থাকে এবং সংস্কৃতির মধ্যে যদি রাজনীতি না থাকে তাহলে মনস্য জীবন যাপনের জন্য যে পরিস্থিতি প্রয়োজন হয় সেটা তৈরী করতে পারিনি। যারা রাজনীতি করে সরকারে যায় তারা মানুষের হয়ে জনগণের হয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায়। আমার যে সংস্কৃতিতে বাস করি, সেটা হয়ে গেছে এখও সামন্ত সংস্কৃতি। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি আমরা এখনও যেতেই পারিনি। আমরা গণতন্ত্রের কথা বলেছি, মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সমস্ত পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের দিকে। কিন্তু জনগণের মানববাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারিনি।
সুলতানা কামাল আরও বলেন, একটি এলাকায় ১০টি দরিদ্র পরিবার আছে, সেখানে দুটি কার্ড এসেছে। সেখানে কাকে সেই কার্ড দুটি দেব। সেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রতি করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। বিপদে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমি বলে বেড়াচ্ছি, আমার দেশের জন্য এতো উন্নতি করেছি এবং এটি যেন সরকারের অনুগ্রহ। সরকার আমাকে অনুগ্রহ করে দিয়েছে। আমরা যা কিছু পাই, মনে করি- আমি যে পেয়েছি এটাই অনেক। যতটুকু আমরা পেয়েছি সেটাই অনেক। এটা নিয়ে সন্তষ্ট থাকি।
অন্য একজন কেন পায়নি সেটা বলতে গেলে যদি আমারটা নিয়ে যায়- সে কারণে আমরা কিছু বলতে যাই না। আমাদের আত্ম-মর্যাদা ঘাটতি পেয়েছে। আমরা যেখানে পাকিস্তানের মতো প্রতাব সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র জনতা যুদ্ধ করে দেশটাকে স্বাধীন করলাম। সেই মানুষগুলি আজকে নিজে কিছু পেয়ে চুপ থাকছে এবং অন্যের অধিকারের কথা বলছে না। কথা বলার অধিকার হারিয়ে ফেলেছি। যারা কথা বলছি না, তারাও কী বিপদের বাইরে আছি? চুপ করে থাকলেও তাদের স্বার্থে ঘা লাগলে আমাকে এসে ধরবে। চুপ করে থাকলেও দিনে দিনে আমরা শুন্য হয়ে যাবো।
এড. সুলতানা কামাল আরো বলেন, ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে যদি কয়েক লক্ষ মানুষ দুর্বৃত্তপনা করে সব কিছু নিয়ে নেয় তারপরও আমরা ‘নেই’ হয়ে যাবো। এখন বাঁশের চেয়ে কুঞ্চি শক্ত হয়ে গেছে। এখন বিমান বন্দরে প্লেন নামতে পারেনা। সেখানে কেউ গেলে সবাই ঘিরে ধরে। আমাদের দেশে কোন অনুষ্ঠান হলে সেখানে চেয়ারে লেখা লাগে-এমপি ছাড়া কেউ বসবেন না। আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির পরিচয় কোথায় যাচ্ছে। এই একটা জাতি নারীদের ফতোয়া দিয়ে পিটিয়ে মারে, শিশুদের পিটিয়ে মারে, কেউ কিছু বলে না-দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে এবং ভিডিও করে ভাইরাল করে। আন্তর্জাতিক ফোরামে যাওয়ার পর আমাদের শুনতে হয়। তোমাদের দেশে অনেকে উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু এসব দিকগুলোতে তোমরা কতটা পিছিয়ে আছো। মানববাধিকারের সংস্কৃতি নেই বলে বিচারহীনতা বেড়েছে। বিচারহীনতা হচ্ছে বলে দিনের পর দিন মানববাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় বেড়ে যাচ্ছে। এটি বিষাক্ত চক্রের মতো। এটি বন্ধ করতে পারছি না। সেজন্য আমাদের সকলের একত্রিত হয়ে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিটা এমন হয়ে গেছে, মানববাধিকারের কথা বললেই তারা ভাবে তাদের বিপক্ষে কথা বলছে। মানববাধিকারের সাথে যারা সরাসরি জড়িত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে একটি বৈরী প্রতিক্রিয়া এবং বৈরী প্রতিক্রয়ার প্রতিফলনে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে চলে আসে। সেই জায়গায় আমাদের অবশ্যই পরিস্কার করতে হবে। মানববাধিকার এমন একটি বিষয়ে সাংবিধানিকভাবে রক্ষা করতে বাধ্য। মানববাধিকার এগিয়ে নেওয়া যাওয়াটা তার সাংবিধানিক এবং নৈতিক দায়িত্ব। এটি যদি তারা না করে, সেটা তাদের ব্যর্থতা। সেই জায়গায় আমাদের শক্ত হতে হবে।
বাংলাদেশে মানবাধিকারের লঙ্ঘনের প্যাটার্ন একেবারে এটাই দাঁড়িয়েছে। আমার কাছে অনেকগুলি আবেদন এসেছে। এতগুলো বিষয়ে আমার একারে পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। সেটা সমাধান করতে হবে সবাইকে। এক সাথে দাঁড়াতে হবে। সেজন্য মানববাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন যাত্রা শুরু করেছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বলেন, মানবাধিকার যে ভাঙুক সেটা রাষ্ট্রকে ধরতে হবে। কাউকে ধরে নিয়ে যদি গুম করে সেটা যদি রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা রাষ্ট্রীয় বহিভূত বাহিনী যদি করে সেটাও দোষণীয়। রাষ্ট্রীয় বর্হিভূত বাহিনী করে তবে সেটা তদন্ত করে সেই ঘটনার সুরাহা করা সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা গেছে তাদের বলতে চাই-আমরা আপনাদের হাত ধরে দায়িত্ব দেয়নি। আপনারা আমাদের কাছে হাত জোড় করে বলেছেন-আমাদের সেবা করার সুযোগ দিন। আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে। সৎ ভাবে, স্বচ্ছভাবে সেবা করেন। আমাদের আস্থা দিয়েছি। আনুগত্ব দিয়েছি। আপনার যে আইন কানুন দিয়েছেন সেটা মেনে চলছি, এই কারণেই আপনাদের উপর এই দায়িত্ব অর্পণ করেছি। এটা আমার নিজের কথা নয়। বন্ধবন্ধু তার নিজের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতি লিখেছেন। বন্ধবন্ধুর কন্যাকে তার পিতার কথাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন, যারা স্বৈরাচার, তারা এমন ভাব করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেন জনগণের নয়, বিশেষ গোষ্টির। এই বিষয়টি তাকে মনে করিয়ে দিতে চাই। তিনি (প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা) নিজেই বইটি পড়েছেন। এখনও পড়েন। চোখের পানি দিয়ে পড়েন। হৃদয়ের আকুতি দিয়ে পড়েন। আমরাও পড়ছি। সেটা আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই। আপনি স্বচ্ছ ও জবাব দিহিতাভাবে দেশ পরিচালনা করেন। আপনার পিতার নির্দেশ অনুযায়ী দেশ চালাতে চান। তাহলে বিষয়টির প্রতি মনযোগি হবেন। যদি সেটা না হয়। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন না হলে আপনার দ্বার দুষ্টের পালন ও শীষ্টের দমন হয় আপনি কিন্তু মহা বিপদে পড়বেন। সেই বিপদ থেকে আপনাকে কেউ উদ্ধার করতে পারবে না। কাজেই বিষয়টি আমাদের নিজেদেরই বার বার বলতে হবে মনে করতে এবং মনে করিয়ে দিতে হবে। মনে করার এবং মনে কিরয়ে দেওয়ার জন্য মানববাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন যাত্রা শুরু করেছে। আমরা এক সাথে এই কাজটি করতে পারবো। আমরা এতোগুলো মানুষ যখন কাজ করেছি তখন কোথাও না কোথাও আমাদের একটি শক্তি দাঁড় করাতে পারবো। আমাদের হাতে সেই ক্ষমতা আছে। আমাদের অন্তরে যদি সেই শক্তি থাকে, প্রতিজ্ঞা থাকে, আমরা সে কাজ অবশ্যই পারবো।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উত্তরণ পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু আহমেদ, প্রফেসর আব্দুল হামিদ, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনিসুর রহিম, সাতক্ষীরা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড.এস এম হায়দার, সিনিয়র আইনজীবী এড. আবুল হোসেন, সাবেক পিপি এড. ওসমান গনি, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ আহমেদ বাপী, সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জী, এম. কামরুজ্জামান, রঘুনাথ খাঁ, সমাজ সেবক আবুল কালাম বাবলা, নারী নেত্রী জোসনা দত্ত, ফরিদা আক্তার বানু, জেলা পরিষদ সদস্য এড. শাহনেওয়াজ পারভীন মিলি, এড. আজাদ হোসেন বেলাল, এড. আল মাহমুদ পলাশ, এড. কাজী আব্দুল হামিদ, রাজনৈতিক আলি নুর খান বাবুল, কাজেম আলী, প্রভাষক ইদ্রিস আলী প্রমুখ।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন