কলারোয়ায় মহান বিজয় দিবসের সকল অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ


ডিসেম্বর ১৭ ২০১৯

কলারোয়ায় উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে মহান বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননার অভিযোগে মহান বিজয় দিবসের সকল অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। সোমবার (১৬ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ১২টায় কলারোয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদরে কার্যালয়ে সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা ও যুদ্ধকালীন গেরিলা কমান্ডার আব্দুল গফ্ফার আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জনের ঘোষণা দেন। এসময় বীর মুক্তিযোদ্ধারা কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দায়ী করে বলেন, উপজেলা প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে আজ বিজয়ের দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করেছে অবিলম্বে কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
যুদ্ধকালীন গেরিলা কমান্ডার আব্দুল গফ্ফার সাংবাদিকদের বলেন, কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরএম সেলিম শাহনেওয়াজ মহান বিজয় দিবস পালনের অনুষ্ঠানে আমাদের কোন দাওয়াত দেয়নি। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রশাসক হিসেবে যেন মর্যাদা পায় সেই ব্যবস্থা করেছেন। মহান বিজয় দিবসে কলারোয়ার সকল মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান ও অবমাননা করায় আমরা বিজয় দিবসের সকল কর্মসুচি বর্জন করলাম। এসময় তিনি বলেন, উপজেলার সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কলারোয়া উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত বিজয় দিবসে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানসহ সকল কর্মসুচি বর্জনের জন্য উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মত কমান্ডারের সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বা কাজ করতে পারবো না।
কলারোয়া উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা জানান, মহান বিজয় দিবস পালন উপলক্ষে কলারোয়া উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুতি সভার আয়োজন করে। প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হিসেবে সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হলে সভায় আমি উপস্থিত হই। তিনি বলেন, বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কমিটি, উপ-কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে উপজেলা প্রশাসন আমাকে একটি কমিটির সদস্য হিসেবে রাখে। এখনও আমি সেই কমিটির সদস্য হিসেবে আছি। সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বলেন, আমরা বিজয়ের মাসে উপজেলার সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে আমরা উৎসব পালন করি। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের কাছে গর্বের দিন। এইদিনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জীবিত মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা প্রদান করা হয়, এছাড়া তোপধ্বনি, শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরে পুস্পমাল্য প্রদান, আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোচনাসভাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাদের প্রতিনিধিদের রাখা হয় এবং জানানো হয়। অথচ এবার উপজেলা প্রশাসন নিজেদের বসার জন্য উন্নত মানের ব্যবস্থা করলেও যারা এ দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধা করে স্বাধীনতার পতাকা আনলো সেসব মুক্তিযোদ্ধাদের বসার ব্যবস্থা করেছে মাঠের একপাশে অতি নিন্ম মানের। যা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অশ্রদ্ধা করা হয়েছে বলে মনে করেছি। এসময় তিনি আরো বলেন, যে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন দেশের পতাকার জন্য যুদ্ধ করেছে, শহীদ হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে সেই পতাকা উত্তোলনের সময় কলারোয়ায় দীর্ঘ দিনের প্রথা রয়েছে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের একজন প্রতিনিধিকে সেখানে দাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু কলারোয়া উপজেলা প্রশাসন পতাকা উত্তোলনসহ কোন অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ না জানিয়ে আজ মহান বিজয় দিবসের সকল অনুষ্ঠান থেকে বিজয় উৎসব থেকে বঞ্চিত করেছে। ভরাক্রান্ত মনে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, বিজয় দিবসের এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধা, যদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের যে সংবর্ধনা দেয়া হয় সেই অনুষ্ঠানের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার একজন প্রতিনিধি দিয়ে প্রাক্তন কমান্ডার হিসেবে আমার কাছে জানতে চায়, কত জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন, কত জন মুক্তিযোদ্ধা মারাগেছে, কতজন জীবিত আছেন, কতজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা কি উপহার নেয়ার জন্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যাই? এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অসযোগীতার কারনে আজ মহান বিজয় দিবসের দিনে কলারোয়া উপজেলার সকল বীর মুক্তিযোদ্ধারা সকল অনুষ্ঠান বর্জন করেছেন। এঘটনার জন্য তিনি কলারোয়াবাসীর কাছে দু:খ প্রকাশ করেন এবং অবিলম্বে মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননার জন্য সরকারের উর্ধতন কতৃপক্ষের হস্থেক্ষেপ কামনা করেন।
এদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননার ঘটনায় সমর্থন জানিয়েছেন, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড, স্থানীয় সসেচনমহলসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। তারা এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানান।


এদিকে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানাতে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নিজ কার্যালয়ে কলারোয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রশাসক আরএম সেলিম শাহনেওয়াজ জানান, মহান বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের কোন ঘাটতি ছিলো না। প্রতিবারের ন্যায় এবারও আসন বিন্যাস করা হয়েছে। তারপরও যদি কোন সমস্যা হয়ে থাকে সে বিষয়ে জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হতো। তিনি মহান বিজয় দিবস বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠান জানিয়ে বলেন, কোন ভুল হয়ে থাকলে সকলে মিলে সমাধান করা সম্ভব ছিলো কিন্তু সকালে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পর কি সমস্যা হয়েছে এটা আমার বোধগম্য নয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, আমি ঘটনা জানার পর মাননীয় সংসদ সদস্য (সাতক্ষীরা-১) এড. মুস্তফা লুৎফুল্লাহ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লাল্টুসহ প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে যায় সেখানে আমি আয়োজনে কোন ভুল হয়ে থাকলে দু:খ প্রকাশ করেছি। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দসহ সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠানে ফিরে আসার অনুরোধ করেন কিন্তু ঠিক কি কারনে অনুষ্ঠান বর্জন করেছে বিষয়টি বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, এঘটনার পর আমি বিষয়টি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক (ডিসি) স্যার অবহিত করেছি। তবে একাধিকবার তিনি শ্রদ্ধার সাথে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে ফিরে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন বলে জানান। মনিরুল ইসলাম মনি

কলারোয়ায় ইউএনও’র প্রেস ব্রিফিং
এদিকে কলারোয়া প্রতিনিধি জানান, কলারোয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান বর্জনের বিষয়ে সোমবার বিকেলে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে প্রেস ব্রিফিং করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের প্রশাসক আরএম সেলিম শাহ নেওয়াজ। তিনি বলেন, অন্য সকল বারের তুলনায় এবার মহান বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান অনেক সুন্দর পরিবেশে সম্পাদন করা হয়। সকালের সকল অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে অনুষ্ঠেয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান তারা বয়কট করেন। তাদের কাছে অনেক অনুনয় নিবেদন ও ভুল স্বীকার করা সত্ত্বেও তারা অনুষ্ঠানে যোগ দেন নি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরও জানান, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সকল অনুষ্ঠান নির্ধারণ ও পালন করা হয়েছে। কারো প্রতি কোনো অসম্মান প্রদর্শন করা হয়নি। তারপরেও বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ দ্বিতীয় পর্বের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি বর্জন করেন। তিনি সাংবাদিকদের এ বিষয়ে প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের দাবি জানান। এসময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আকতার হোসেন, কৃষি অফিসার মহাসীন আলি, সিনিয়র মৎস্য অফিসার রবীন্দ্রনাথ মন্ডল, পরিসংখ্যান অফিসার তাহের মাহমুদ সোহাগ, আইসিটি সহকারী প্রোগ্রামার মোতাহার হোসেন, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমান, উপজেলা সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন, আজাদুর রহমান খান চৌধুরী, আব্দুর রহমান, শেখ জুলফিকারুজ্জামান জিল্লু, এমএ সাজেদ, আসাদুজ্জামান আসাদ, সরদার জিল্লুর প্রমুখ।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন