সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) : একাদশ সংসদ নির্বাচনে কে হবেন নৌকার মাঝি !


মে ১ ২০১৮

সেলিম হায়দার---

আ’লীগ-শরিকদের ১৩ জন,বিএনপি-জামায়াতের একক প্রার্থী মাঠে

সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের আগামী একদাশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নির্বাচনী প্রচারনা জমে উঠেছে। ভোটের আগে মাঠের লড়াইয়ে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা কেন্দ্রে লবিংসহ নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ থেকে শুরু করে উঠান বৈঠক,সভা সমাবেশ ও বিভিন্ন জাতীয় দিবসে প্যানা সেটে জানান দিচ্ছে নিজেদের অস্তিত্বের কথা। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ভ্যান স্ট্যান্ড পর্যন্ত সবখানে আলোচনার মূল বিষয় আগামী জাতীয় নির্বাচন। প্রার্থীদের তৎপরতার পাশাপাশি ভোটাররাও চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীতা নিয়ে। কারা হচ্ছেন কোন দলের প্রার্থী তা নিয়ে। এখন পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের একক প্রার্থী নির্বাচনী ময়দানে থাকলেও সরকারি দল আওয়ামীলীগ ও জোটের শরীকদের একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন লড়াইয়ে মাঠ গরম রেখেছেন।
তবে এক্ষেত্রে আ’লীগ ও তার সমমনা দলগুলো এগিয়ে থাকলেও বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের কর্মকান্ড বিশেষভাবে চোখে পড়ছেনা। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে দলীয়-কর্মকান্ড দৃশ্যমান না হলেও বিএনপির একক প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন। নেতা-কর্মীরা তাকেই দলীয় প্রার্থী দেখতে চান।
এক্ষেত্রে প্রার্থীদের মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে তৃনমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হলেও মূলত ভোটারদের মধ্যে নানা বিষয় কাজ করছে। কারা প্রার্থী হচ্ছেন এবং কাদের ভোট দিলে নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নে নিজেদের মেলে ধরতে পারবেন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। মহাজোট চাইছে আগামী নির্বাচনে আসনটি ধরে রাখতে আর ২০ দলীয় জোট চাইছে আসনটি পুনরুদ্ধারে। এক্ষেত্রে আ’লীগের জন্য আবারো থাকছে শরীক দল ওয়ার্কাস পার্টি। মহাজোটের পক্ষে আসনটি ধরে রাখার ব্যাপারে তারা শতভাগ নিশ্চিত হলেও বড় সমস্যা তাদের প্রার্থীতা নিয়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী অদ্যবধি আসনটিতে আ’লীগের ভাল অবস্থান থাকলেও মোর্চার কারণে গতবার তারা শরীকদের ছাড় দিলেও এবার তারা চাইছে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দলীয় প্রার্থী নিয়ে।
সর্বশেষ দশম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের টিকিটে নৌকা প্রতীক নিয়ে শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী এ্যাডঃ মুস্তফা লুৎফুল্লাহ নির্বাচিত হলেও এবার আ’লীগ আর আসনটি তাদের ছাড় দিতে চাইছেননা। পক্ষান্তরে ওয়ার্কার্স পার্টি ফের জোটগত আসনটি ধরে রাখতে চায়।
এর আগে ৯ম সংসদ নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে চারদলীয় জোটের প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিবকে হারিয়ে নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান। আ’লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের দাবি, ফিরিয়ে দেয়া হোক তাদের নিজ ঘরানার প্রার্থীতা। কেননা,সর্বশেষ রাজনৈতিক অস্থীতিশীলতার মধ্যে আ’লীগ মহাজোটের ব্যানারে নির্বাচনে ক্ষমতায় আসলেও বর্তমানে তাদের অবস্থান ভাল এবং দেশ এখন উন্নয়নের সোপানে আরোহন করছে। এমন নানা দৃষ্টিকোন থেকে ঘুরে-ফিরে ভোটারদের মধ্যে একটাই প্রশ্ন কে হচ্ছেন দলীয় প্রার্থী। বর্তমান এমপি ওয়ার্কার্স পার্টির অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহ? আওয়ামীলীগের দলীয় প্রার্থী না কি অপর শরীক জাতীয় পার্টির সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ দিদার বখত নাকি অন্য কেউ?।
সাতক্ষীরার তালা ও কলারোয়া দুটি উপজেলার ২৪ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ১০৫ (সাতক্ষীরা-১) আসনটি। সর্বশেষ তালিকানুযায়ী এখানকার ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৭ হাজার ৮৯১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার রয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ৮১৮ জন ও পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৩ হাজার ৭৩ জন। আসনটিতে স্বাধীনতা পরবর্তী জামায়াতের অ্যাডভোকেট শেখ আনছার আলী ও জাতীয় পার্টির সৈয়দ দিদার বখত একবার করে ও বিএনপির প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব দু’বার,ওয়ার্কাস পার্টি একবার ও বাকি সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মূলত ঐ সমীকরণ ও নানা কারণে সাতক্ষীরার এ আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ নুরুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত শরিক দল ওয়ার্কার্স পাটির অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহকে প্রার্থীতা দিলে তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। ঐ নির্বাচনে অবশ্য বিএনপি-জামায়াত অংশ না নিলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সরদার মুজিবের সঙ্গে।
এর আগে গত ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক জেলা বিএনপির সভাপতি হাবিবুল ইসলাম হাবিব আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রকৌশলী মুজিবুর রহমানের কাছে পরাজিত হন। জোট প্রথা শুরুর পর আসনটিতে বিএনপিকে জামায়াতের ওপর ভর করে আর ওয়ার্কার্স পার্টিকে আ’লীগের ওপর ভর করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ায় মূলত জোট নির্ভর হয়ে পড়ে আসনটি। তবে আসন্ন নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের বিএনপির প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব মামলা জটিলতায় অথবা যেকোনো কারণে প্রার্থী হতে না পারলে আর বিএনপির মিত্র জামায়াত তাদের জোটবদ্ধ থাকলে এ আসন থেকে তাদের প্রার্থী হতে পারেন,জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ। এদিকে বিএনপি-জামায়াত তাদের হৃত আসনটি পুনরুদ্ধারে গত চার বছরে দৃশ্যত দলীয় কোনো কার্যক্রম চালাতে পারেনি তারা। রাজনৈতিক অস্থীতিশীলতায় তাদের শ’ শ’ নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা মামলায় জড়িয়ে জেল-হাজতবাসসহ আত্মগোপন কিংবা মামলা এড়াতে প্রকাশ্য রাজনীতিতে নিরব রয়েছেন তারা।
অন্যদিকে পাওয়া না পাওয়া থেকে শুরু করে নানা সংকটে অন্তর্কোন্দলে জড়িয়ে আ’লীগও ভাল নেই। তালা উপজেলা আ’লীগের রয়েছেন পরষ্পর দু’গুরুপে। উপজেলা আ’লীগ ও তার অঙ্গ-সংগঠনের সঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির এমপি’র দূরত্ব সেই প্রথম থেকে।
আসনের অপর উপজেলা কলারোয়ার চিত্রও অনুরুপ। সেখানকার আ’লীগের সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ স্বপনের সঙ্গে রয়েছে সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম লাল্টুর চরম দ্বন্দ্ব। সব মিলিয়ে আ’লীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও ওয়ার্কার্স পার্টির এমপি’র সাথে আ’লীগের দুরত্ব আসন্ন নির্বাচনে কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দল নিরসন না হলে এ আসনটিতে একদিকে আ’লীগের জন্য পরাজয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে,তেমনি শরিক দলের প্রভাবে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হতে পারেন আ’লীগের প্রার্থীরা। সে ক্ষেত্রে কপাল খুলতে পারে মহাজোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি কিংবা জাতীয় পাটির প্রার্থীদের।
নির্বাচনী এলাকা ঘুরে জানাযায়,আসন্ন নির্বাচনে আসনটি থেকে আ’লীগের দলীয় মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রে লবিং ও তৃণমূলের প্রচারণায় রয়েছেন,জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান,জেলা আ’লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফিরোজ কামাল শুভ্র,তালা উপজেলা আ’লীগের সভাপতি শেখ নুরুল ইসলাম,কলারোয়া উপজেলা আ’লীগের সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ স্বপন,সুপ্রীম কোর্টের আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতা মোহাম্মদ হোসেন,জেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক সরদার মুজিব,কেন্দ্রীয় যুবলীগের সহ-সম্পাদক রফিকুল ইসলাম,স,ম আলাউদ্দীন মেয়ে জেলা মহিলা আ’লীগের সভাপতি লাইলা পারভিন সেজুতি। শরীক দলগুলোর মধ্যে রয়েছেন, ওয়ার্কার্স পার্টির বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহ,জাতীয় পার্টির সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ দিদার বখত,জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা শেখ ওবায়েদুস সুলতান বাবলু,জেএসডি’র কেন্দ্রীয় নেতা মীর জিল্লুর রহমান ও জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা দেবাশীষ দাস।
অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে যাদের নাম প্রচার পাচ্ছে তারা হলেন,কেন্দ্রীয় বিএনপি’র প্রকাশনা সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিব, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ।
ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট মুস্তফা লুৎফুল্লাহ জানান,২০১৩ সালে বিএনপি-জামায়াত আ’লীগের নেতা-কর্মী খুনসহ যে তান্ডব চালিয়েছিল সেখান থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কঠোর ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। গত ৫ বছরে তার নির্বাচনী এলাকায় গত যেকোন সময়ের তুলনায় যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে।
প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব বলেন,দেশনেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া মুক্তি ও নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে অবশ্যই নির্বাচনে অংশ গ্রহন করব এবং জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
দলীয় অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী তালা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ নূরুল ইসলাম বলেন,আসনটি মহাজোটের দখলে আসলেও বর্তমান ওয়ার্কার্স পার্টির এমপির কাছে উন্নয়ন নিয়ে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির যথেষ্টে ঘাটতি রয়েছে। তাই এবার আর শরিক নয়,আ’লীগের প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এমন প্রত্যাশা এ মনোনয়ন প্রত্যাশীর।
এদিকে আ’লীগের নতুন মুখ হিসেবে মাঠে কাজ করছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন। শেখ হাসিনার উন্নয়নমূলক কর্ম-কান্ডকে তুলে ধরে তার ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে গোটা তালা-কলারোয়াসহ পুরো জেলা। তিনি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য ও ঢাকাস্থ সাতক্ষীরা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি। এছাড়া তিনি নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি ইউনিয়ন ওয়ার্ড এক কথায় তৃণমূল পর্যায়ে নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের সাথে নিয়মিত কাজ করছেন তিনি। অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসেন জানান, আমি মনোনয়ন প্রত্যাশী ও নৌকার পক্ষে কাজ করেযাচ্ছি।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন