নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় বেশ কিছু পরিবর্তন আসছে। নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সব সরকারি কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি কম পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সর্বনিম্ন পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের নিট পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে বেতনস্কেলের সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর করা হবে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রোববার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদনের পর এসব তথ্য জানা যায়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো চালু হতে যাচ্ছে। নতুন স্কেল ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও এর বিভিন্ন অংশ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
সব গ্রেডে মোবাইল ভাতার সুযোগ
নতুন বেতন কাঠামোর অন্যতম পরিবর্তন হলো মোবাইল ভাতার পরিধি বাড়ানো। এখন থেকে প্রথম থেকে ২০তম—সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারী এ সুবিধার আওতায় আসবেন।
এত দিন নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তারা, বিশেষ করে পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত থাকা কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। সরকারি দপ্তরে ই-মেইল, অনলাইন মিটিং, ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অ্যাপনির্ভর কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় প্রায় সব স্তরের কর্মচারীকেই মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে মোবাইল ভাতার আওতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা পাবেন বেশি সুবিধা
নতুন বেতনস্কেলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন (ওআরওপি) ব্যবস্থা এখনই পুরোপুরি কার্যকর করা হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি এবং এর জন্য বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর পরিবর্তে আপাতত পেনশন বৃদ্ধির জন্য একটি নতুন ফর্মুলা অনুমোদন করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় যাদের পেনশন কম, তাদের বৃদ্ধির হার বেশি হবে।
পেনশন বৃদ্ধির প্রস্তাবিত হার হলো—
- ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন হলে বৃদ্ধি ১০০ শতাংশ।
- ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বৃদ্ধি ৭৫ শতাংশ।
- ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বৃদ্ধি ৬৫ শতাংশ।
- ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে বৃদ্ধি ৬০ শতাংশ।
- ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি হলে বৃদ্ধি ৫৫ শতাংশ।
এর ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসর নেওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা নতুন ব্যবস্থায় বেশি সুবিধা পাবেন।
তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন আগের তুলনায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।
তবে এই বেতন বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হবে না। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের তুলনামূলক কম আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের মতে, একসঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের চাপ এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নিয়েই ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা
নতুন বেতনস্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য নতুন একটি ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রতি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারী মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অতিরিক্ত পরিচর্যা এবং তাদের পরিবারের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সুবিধা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ সুবিধা পাবেন
নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীসহ অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী এর আওতায় আসবেন।
সব মিলিয়ে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন সুবিধা পাবেন প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ।
সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতনস্কেল বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ প্রতিনিধি: 












