সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন কেবল যোগাযোগের উপায় নয়, আমাদের জীবনের দৈনন্দিন অভ্যাস, চিন্তা, সংস্কৃতি ও সমাজমনস্তত্ত্ব গঠনের অন্যতম শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ—সবই আজ তথ্য, বিনোদন, মতপ্রকাশ ও সামাজিক আন্দোলনের শক্ত মাধ্যম। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মগুলো যেমন অসীম সম্ভাবনার, তেমনি কিছু ক্ষেত্র গভীর সংকটেরও জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক হচ্ছে অশ্লীলতা ও যৌনউদ্দীপক কনটেন্টের বিস্তার।
অশ্লীলতার সংজ্ঞা: সমাজভেদে ভিন্ন, প্রভাব একটাই
অশ্লীলতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা সহজ নয়। কারণ এটি সংস্কৃতি, ধর্ম, নৈতিকতা ও সামাজিক মানদণ্ড অনুসারে ভিন্ন হতে পারে। তবু সাধারণভাবে বলা যায়, যে কোনো ছবি, ভিডিও, লেখা বা অডিও যদি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, নগ্নতা প্রদর্শনকারী বা অশোভন আচরণকে প্রলুব্ধকারী হয়, তা সমাজের নৈতিক মানদণ্ডে অগ্রহণযোগ্য। অনেক দেশে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’ অনুযায়ী অশ্লীলতা নির্ধারণ করা হয়—অর্থাৎ সাধারণ মানুষ যা অগ্রহণযোগ্য মনে করে সেটিই অশ্লীল।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অশ্লীলতার বিস্তার কেন এত দ্রুত?
আজকের ডিজিটাল যুগে অশ্লীলতা যেন অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। তার কারণগুলো স্পষ্ট—
-
দ্রুত জনপ্রিয়তা ও ভাইরাল হওয়ার লোভ
-
ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন করা যায়
-
কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতা
-
নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি
-
শিশু-কিশোরদের অনিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার
-
নজরদারি ও আইনি প্রয়োগের দুর্বলতা
ফলে অশ্লীল ছবি, আংশিক নগ্ন ভিডিও, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা, গালিগালাজ, অনৈতিক নাচ-গান, ‘রিভেঞ্জ পর্ন’, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ, সেক্সটিং—সবই এখন সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর এর গভীর প্রভাব
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অশ্লীলতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে মানুষের মনস্তত্ত্বে। বিশেষত নারী, শিশু ও কিশোর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
-
মানসিক ক্ষতি: লজ্জা, অপমান, ট্রমা, উদ্বেগ, সামাজিক কলঙ্ক।
-
নৈতিক অবক্ষয়: পরিবারে মূল্যবোধের ভাঙন, ভোগবাদী মানসিকতার প্রসার।
-
শিশু-কিশোরদের বিকৃতি: অনুপযুক্ত কনটেন্টের কারণে আচরণগত সমস্যা, কৌতূহল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অনলাইন কার্যক্রম, সহজে প্রভাবিত হওয়ার প্রবণতা।
-
সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি: ব্ল্যাকমেইল, রিভেঞ্জ পর্ন, প্রতারণা ইত্যাদি।
শুধু আইন নয়—সমাজব্যাপী নৈতিক সংস্কার প্রয়োজন
অশ্লীলতা নিয়ন্ত্রণের জন্য কেবল আইনই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কৌশল:
ব্যক্তিগত পর্যায়ে
-
অশ্লীল কনটেন্ট এড়িয়ে চলা
-
সন্দেহভাজন লিঙ্ক না খোলা
-
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষিত রাখা
-
অনৈতিক কনটেন্ট দেখলে রিপোর্ট ও ব্লক
পরিবারে
-
সন্তানকে নৈতিকতা ও অনলাইন নিরাপত্তা শেখানো
-
ইন্টারনেট ব্যবহারে গাইডলাইন নির্ধারণ
-
পরিবারে খোলামেলা আলোচনা—শিশু যেন ভয় না পায় কথা বলতে
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে
-
অনলাইন এথিকস, ডিজিটাল সেফটি, সাইবারবুলিং প্রতিরোধ শিক্ষা
-
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ
-
কিশোরদের সঠিক কনটেন্ট চেনার ক্ষমতা বৃদ্ধি
সামাজিক ও সংগঠন পর্যায়ে
-
সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন
-
পেজ/গ্রুপে কঠোর কনটেন্ট নীতিমালা
-
কমিউনিটি মডারেশন জোরদার
-
সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা
রাষ্ট্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা
-
অশ্লীল কনটেন্ট অপসারণে দ্রুত ব্যবস্থা
-
অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
-
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো
-
আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয়
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের এগিয়ে দিয়েছে, সমাজকে আরও উন্মুক্ত, সচেতন ও সংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন নৈতিক সংকটও তৈরি করেছে। অশ্লীলতার বিস্তার রোধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও এটি মূলত সামাজিক ও নৈতিক আন্দোলন—যেখানে ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, কমিউনিটি এবং রাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে তবেই সফলতা পাওয়া সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে সুস্থ, নৈতিক ও নিরাপদ রাখতে হলে আমাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে হলে আজই উদ্যোগী হতে হবে।
আব্দুর রহমান 



















