জাসদ প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে তরুণদের প্রতি –


নভেম্বর ১ ২০২০

শিরীন আখতার

৩১ অক্টোবর ২০২০ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ-এর ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে যারা ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ বা ‘নিউক্লিয়াস’ গঠন করেছেন, ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত যাঁরা পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ে কাজ করেছেন, ১৯৬৬ সাল থেকে যাঁরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফাকে স্বাধীনতা আন্দোলনের টুল বা উপায় হিসেবে গ্রহণ করে নিবেদন করেছেন জীবনের সর্বস্ব, শিক্ষা-গণতন্ত্র-প্রগতি ও প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো যাঁরা বুদ্ধিমত্তার সাথে টেনে এনেছেন ‘স্বাধীনতা’র দিকে, যাঁরা ‘ফেব্রুয়ারি ১৫ বাহিনী’ বা ‘জয়বাংলা বাহিনী’র উত্তরাধিকার হিসেবে নিউক্লিয়াসের রাজনৈতিক-সামরিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স-বিএলএফ’ বা ‘মুজিব বাহিনী’ গঠন করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন ও বিজয়ী হয়েছেন— তাঁরাই গঠন করেছেন জাসদ। এঁদের প্রায় সকলেই ছিলেন ছাত্র, তরুণ ও যুবক। জাসদ গঠনকারী নিউক্লিয়াসের ছাত্র-তরুণ-যুবকগণ ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান প্রবর্তন করেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধা দিয়েছেন, জাতীয় পতাকা তৈরি-প্রদর্শন-উত্তোলন করেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনাক্রমে জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন করেছেন। অন্য কোন দল নয়। ১৯৭২-১৯৭৫ সময়কালে সমগ্র বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের লাল ঝাঁন্ডার এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল; লড়াই চলেছিল দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী এ পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলেন। এ সময় প্রায় ৯৮ ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন এই তরুণগণ। তারুণ্যের জয়গানে দীপ্ত ছিল রাজপথ। শহরে- গ্রামে-গঞ্জে জ্বলে উঠেছিল অগ্নিমশাল। শ্রমিক-কৃষক-তরুণ-যুবগণ হাতে হাত মিলিয়ে লড়াই-সংগ্রাম শুরু করেছিলেন চোরাকারবারী-মুনাফাখোর-মজুদদারদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লক্ষ শহীদদের লাশ, সে লাশের গন্ধ আকাশ-বাতাস তখনও ভরেছিল। অস্ত্র হাতে তরুণগণ লড়াই ছেড়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারেননি। ক্ষমতা নির্মাণ করে জ্ঞান, সে জ্ঞান আবার ক্ষমতাকে যুক্তি ও ভিত্তি দেয়। বাংলাদেশের গত ৪৯ বছরের বড় একটা সময়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯৬ সালের জুন পর্যন্ত পাকিস্তানপন্থার সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র একটা ইতিহাস তৈরি করেছিল— যেখানে প্রজাতন্ত্রের জনক বঙ্গবন্ধুর সমান্তরাল নেতৃত্ব হিসেবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি জিয়াউর রহমানকে উপস্থাপন করা হয়েছিল শিক্ষাঙ্গণগুলোতে ‘স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া— লও লও লও সালাম’ শ্লোগান দিয়ে।প্রশ্ন হতে পারে, নিউক্লিয়াসপন্থিরা স্বাধীনতার জন্য যদি এত কাজ করে থাকেন তাহলে বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে তারা জাসদ গঠন করলেন কেন? এখানে নির্দ্বিধায় বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের পর আগের দশ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের রূপকার ও নিয়ামক ভূমিকায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদেরকে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল আওয়ামী রাজনীতির অর্থ ও ক্ষমতালিপ্সুরা। ফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ‘বিপ্লবী জাতীয় সরকার’ গঠিত হতে পারেনি আর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে নিউক্লিয়াস ও ছাত্র-তরুণ-যুবকদের কোনো প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করতে পারেননি; বিপ্লবোত্তর দেশে যেরকম হয়— সমাজের সেরকম আমূল পরিবর্তন হয়নি। বরং স্বাধীনতার পর থেকে জনপ্রশাসন, সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনী থেকে শুরু করে সংস্কৃতি-রাজনীতি পর্যন্ত সবকিছু পাকিস্তানপন্থার করায়ত্ব হয়েছিল। অনেক দুঃখভরে ফিদেল ক্যাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন— মহামান্য, আপনি শেষ, আপনি পুরোনো জনপ্রশাসন বহাল রেখেছেন। পরিতাপের বিষয়, পুনর্বাসিত পাকিস্তানপন্থা প্রথমে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে; পরে কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমকে হত্যা করেছে ও জাসদ-ধ্বংসে নিয়োজিত হয়েছে।নিউক্লিয়াসপন্থিদেরকে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার পাশাপাশি জাসদ গঠনে ভূমিকা রেখেছে আওয়ামী রাজনীতির সাথে নিউক্লিয়াসপন্থিদের মতাদর্শগত বিতর্ক ও ভিন্নমত— জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্লেষণ ও অবস্থান।বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৫ বছর ধরে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও জাসদকে অপরাপর দলকে সাথে নিয়ে লড়তে হয়েছে গণতন্ত্রের জন্য। নব্বইয়ের ছাত্র_গণঅভ্যুত্থানে_যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি তারা কিছুটা হলেও মুক্তিযুদ্ধের স্বাদ পেয়েছিল। সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াই ছিল মুক্তিযুদ্ধে গড়া বাংলাদেশ ফিরে পাওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এবারও সে তরুণ-যুবকগণ রুখে দাঁড়িয়েছিলেন; এঁদের সাথে ছিলেন বুদ্ধিজীবী-নারী-শ্রমিক-কৃষক-সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। অভূতপূর্ব এ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য তরুণগণ আবারও ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আপোষহীন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সেনাশাসনকে পরাজিত করে গণতন্ত্রের ঝান্ডা উড়িয়েছিলেন।কিন্তু গণতন্ত্রের নামে ১৯৯০ সাল থেকে ক্ষমতায় একবার মুক্তিযুদ্ধের দল একবার রাজাকারের দল— এই মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা চলতে থাকে, যে খেলায় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে গণতন্ত্রে অবিশ্বাসী রাজাকারের দল জামাত ও সামরিক স্বৈরাচারের গর্ভজাত দল বিএনপি জঙ্গিবাদ বিকশিত করতে থাকে। এরা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দকে জানে মেরে ফেলার মিশন নিয়ে মাঠে নামে।২০০২ সাল থেকে জাসদের প্রয়াসে, ২০০৩ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ও জাসদের সমান্তরাল প্রয়াসে, ২০০৪ সালে ১৪টি দলের যুগপৎ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়, ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই ১৪ দলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে, ২০০৭-২০০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেনের ষড়যন্ত্রকাল উৎরিয়ে, ১৪ দলের সাথে অপরাপর দল নিয়ে ‘মহাজোট’ নামের নির্বাচনী সমঝোতা করে, ২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হয় ১৪ দল ও মহাজোটের সরকার। বিএনপি-জামাত জোট ১৪ দল ও মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পরিচালনা করে ৯৩ দিনের আগুনসন্ত্রাস; হত্যা করতে থাকে শিশু ও শ্রমিকসহ জনপরিবহনে ভ্রমণকারী সাধারণ নাগরিকদের।১৪ দল ও মহাজোট সরকার এখন তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায়। জামাত-বিএনপি কিছুটা কোনঠাসা হয়েছে; কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। এদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে; কিন্তু লড়াইয়ের মাঠে সামনে আনতে হবে দুনীতি-লুটপাট-দলবাজি-অনাচার-অত্যাচার-নিপীড়ন-ধর্ষণ প্রতিরোধে সুশাসন ও আইনের শাসনের সংগ্রাম ও সকল ধরনের ভেদ-বিভেদ-অসমতা-বৈষম্যের বিরুদ্ধে সমাজ পরিবর্তনের সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম।আবারও এ সংগ্রামে প্রয়োজন তরুণ ও যুব সমাজের অংশগ্রহণ_ বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো লড়াইয়ের সামনের কাতারে থেকেই পরাজিত করতে হবে সকল অত্যাচার-ধর্ষণ-নিপীড়নের হাত। তারুণ্যের জোরালো শক্তিশালী লৌহকঠিন ঐক্যের বন্ধন যদি তৈরি করা না যায় তাহলে মার খাবে গণতন্ত্র। পদদলিত হবে সমাজ পরিবর্তনের কলাকৌশল। তাই আজ ঐতিহাসিকভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে তারুণ্যের অভিযাত্রা। তারুণ্যের এই অভিযাত্রা শুরু করতে চায় জাসদ।অতীতে জাসদ ইতিহাস চর্চার সময় পায়নি; আর জাসদ ইতিহাসের গৌরব নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না; জাসদ চায় বর্তমানের সমস্যা মোকাবেলা করে ভবিষ্যৎ-যাত্রা। এ যাত্রায় জাসদ তরুণদের সাথে পেতে চায়; এখানে তরুণদের উপলব্ধি করতে হবে সামাজিক আন্দোলন দিয়ে অনেক কিছু অর্জন করা যায়, ক্ষমতা অর্জন করা যায় না; আর ক্ষমতা না থাকলে আমূল পরিবর্তন করা যায়না। ক্ষমতা অর্জন করতে, ক্ষমতাহীনদের ক্ষমতা দিতে, অবশ্য-দরকার হলো রাজনৈতিক আন্দোলন। এ r জাসদ তরুণদের স্বাগত জানায়; জাসদ তরুণদের যে কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে সবসময় প্রস্তুত; জাসদ রাজনীতির অ্যাজেন্ডায় তারুণ্যের দিকনির্দেশনা চায়।(লেখক: সংসদ সদস্য, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ও প্রধান উপদেষ্টা, জাতীয় শ্রমিক জোট-বাংলাদেশ।)

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন