রঙ্গ রসে ‘ফণী’ ফের যেনো না দেখি —————–সুভাষ চৌধুরী


মে ৪ ২০১৯


সনাতন ধর্মবলম্বীরা সর্পদেবী মা মনসাকে তুষ্ট করতে তার পূজো দেন প্রতিবছর। আমিও তাদেরই একজন হয়ে মা মনসা দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
আজ যে নাগ নিয়ে কথা বলতে চাই তার নাম ফণী। অভিধান ঘেটে জানলাম যার ফণা তুলবার ক্ষমতা আছে সে ফণী। ফণা বিশিষ্ট এই প্রাণির নাম ফণী। এই ফণী নামের সাথে আমাদের তেমন পরিচয় না থাকলেও আগেই বলেছি ফণী অর্থাৎ সর্পদেবীকে পূজো দেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। তবে এখনও রাস্তার ধারে দেখি কন্টকযুক্ত ফণী মনসার ঝাড়। সংসদ বাংলা অভিধান বললো ফণী মনসা আসলে নাগমাতা।
হঠাৎ এমনই এক ফণীর আগমন ঘটেছিল এই উপমহাদেশে। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ফণী কুন্ডলী পাকিয়ে ফণা তুলেছিল। আমরা ভয় পেয়েছিলাম। ক্ষিপ্রবেগে ফণী প্রথম ছোবল মারে ভারতের ওডিশ্যায়। এরপর তামিলনাড়–, অন্ধ্র , পশ্চিমবঙ্গ সবখানে আঘাত করে তার শেষ লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ। ভারতে আঘাত হানার আগে আবহাওয়াবিদরা বলেন তার শক্তি নাকি ১৮৯১ ও ১৮৯৬ সালে আঘাত হানা সুপার সাইক্লোন অপেক্ষা বেশি। বলা হয়েছিল বাংলাদেশে ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানা আইলার শক্তি অপেক্ষা তা ছিল দ্বিগুন। ভারতের আকাশ আট টেলিভিশন খবর দিয়েছে যে ভারতে ফণীর শক্তির মদমত্ততা এতোটাই বেশি ছিল যে সেখানে গোটা রেলবগি শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়েছিল। কিন্তু যে ফণীর গায়ে এতো জোর , যার শক্তি একটি গোটা বিল্ডিং উপড়ে তুলে ফেলতে পারে যে ফণী রেলের বগি ধরে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে সেই ফণী বাংলাদেশে এসে সত্যিই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। যেনো হাত পা ভেঙ্গে পড়েছিল। কেনো।
এই ফণী নিয়ে কথা শুরু হয় চারদিন আগে থেকে । সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে ফণী মোকাবেলায় নানা কৌশল ফন্দি ফিকির চলতে থাকে। কিভাবে ফণীকে মোকাবেলা করা হবে তা নিয়ে সরকার এমনকি দেশের মানুষের কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। সরকার সর্বত্র নির্দেশনা দিয়ে মাঠে নামায় সরকারি বাহিনী , স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। মেডিকেল টীম, বিপদ মোকাবেলা টীম। পুলিশ ,বিজিবি, কোস্টগার্ড , আনসার, জনপ্রতিনিধি, রেডক্রিসেন্ট , প্রশাসনের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে এমন কোনো সংস্থা নেই যারা ফণী মোকাবেলায় কাজ করেনি। গত ১ মে থেকে শুরু হয়ে যায় ফণী মোকাবেলায় আমাদের আনাগোনা। শেষতক বলবো ফণী মোকাবেলায় আমরা সফল হয়েছি । আর ফণী ব্যর্থ হয়েছে আমাদের দিকে ফণা তুলে কঠিন ছোবল মারতে। তারপরও স্বীকার করতে হবে দেশের কয়েকটি স্থানে ফণী সত্যিই কিছু কিছু ক্ষতি করে দিয়ে গেছে । বিশেষ করে বাড়িঘর ভাংচুর হয়েছে। দোকানপাট উড়িয়ে নিয়ে গেছে । ফসল নষ্ট করে দিয়ে গেছে।
এই ফণী নিয়ে নানা কথা। কে এই ফণী । কেনো এই ফণী। ফণী বাংলায় এই বানান লিখলেও ইংরাজীতে লেখা হয়েছে ঋঅঘও । আর এ নিয়ে শুরু হয়ে গেল বিপত্তি। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয় ফণী না ঋঅঘও (বাংলা উচ্চারণে ফেণী অথবা ফাণি ) তা নিয়ে শুরু হয়েছে বাকযুদ্ধ । অবশেষে মল্লযুদ্ধ । আর এই মল্লযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত রুপ নিয়েছে শক্তি প্রদর্শনে। ফলাফল দুই পক্ষে নয়জন আহত হয়েছেন। তাহলে বলা যায় ফণীর গায়ে শক্তি না থাকলেও ফণী আর ফানির যুদ্ধ কিন্তু শক্তি প্রদর্শন করে দেখিয়ে দিল আমরা ফণি অপেক্ষা বেশি শক্তি রাখি। কথায় কথা আসে। আজ ফণী উপদ্রুত এলাকা গাবুরা যাবার পথে কেউ কেউ একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নাম উচ্চারণ করে বললেন জানেন তারা প্রস্তুত ছিল বলে ফণী আঘাত করতে সাহস করেনি। রসিকতা করে অনেকে বললেন ফণী ভয় পেয়েছে তো তাই পালিয়েছে। কারও কারও ভাষায় ফণী নাম তো হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবহৃত নাম। সূতরাং তার স্থান ভারতে হওয়াটাই শ্রেয়ঃ। তাদের প্রশ্ন ফণী কেনো বাংলাদেশে আসবে । অবশ্য এর জবাব পাওয়া গেলো এই ভাবে যে বাংলাদেশই তো ফণী নামকরণ করেছে। এর জন্য ভারত দায়ী হবে কেনো। সূতরাং বাংলাদেশে আসার অধিকার তো ফণীর আছেই। দুর্বল ফণী পালিয়েছে এমন খবর নিয়ে যখন রঙ্গ রস চলছে তখন যশোর থেকে ফোন এলো আমার কাছে। জানতে চাইলাম আপনার এলাকার ফণীর খবর কি। তিনি বললেন আমরা ফণীকে খুঁজছি । তাকে দেখিয়ে দেবো কত ধানে কতো চাল। আর আমি বললাম কোথায় ফণী। সকাল থেকেই তো দেখছি ঝলমলে রোদ। রাতের আঁধারে ফণী অবশ্য কিছুটা ভয় দেখিয়েছিল । টালমাটাল দমকা হাওয়া দিয়ে । সাথে ছিল বৃষ্টি। ফণী আমাদের বেড়ি বাঁধগুলি ধসে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তা পারে নি। ওই যে বললাম কারা যেনো প্রস্তুত ছিল তাই। এই ফণী নিয়ে কত কথা শুনছি । কেউ বলছেন ফণী বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় ঢুকে নতুন বাইপাস রোড দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছে। তাই সে এই পথ ধরে সোজা চলে গেছে উত্তর স্থল ভাগে। আর স্থল ভাগে ফণী যে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না তাতো আমরা জানি। কারণ জলেই ফণীর জন্ম। আর স্থলেই ফণীর মরণ। এই জন্যই বোধ হয় যশোর থেকে বলা হয়েছিল ফণী কই , আমরা তাকে খুঁজছি।
ফণী তোমাকে বলে দিলাম বাংলাদেশে তুমি নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ ভূখন্ডে তোমাকে পেলে কিন্তু তোমার খবর আছে। তার থেকে সাবধান হয়ে যাও। আর কখনও বাংলাদেশে আসার চিন্তাটি করোনা। এই তোমাকে বলে দিলুম।
—- সুভাষ চৌধুরী , ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, দৈনিক যুগান্তর ও এনটিভি

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন