বাংলা চলচিত্রের মহারানী সুচিত্রা সেন


এপ্রিল ৬ ২০১৯


বি, সরকার : ৬ এপ্রিল ৮৯তম জন্ম বার্ষিকী, যার ঝলমলে অভিনয়ে একদিন জ্বলে উঠত রূপালী পর্দা। বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশক অবধি মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা চলচিত্রের কালজয়ী নায়িকা। তিনিই সূচিত্রা সেন। বাংলা চলচিত্রের এই কালপর্বের অবিসংবাদিত জুটি উত্তম-সুচিত্রা। শাশ্বত বাঙালী নারীর রূপ-সৌন্দর্যের আঁধার সুচিত্রা, যা উত্তম-সুচিত্রা অভিনিত বাংলা ছায়াছবিতে ছড়ানো রয়েছে।
১৯৩১ সালে ৬ এপ্রিল পাবনা শহরে জন্মগ্রহন করেন সুচিত্রা সেন । পিতা স্কুল শিক্ষক করুনাময় দাসগুপ্ত, মাতা ইন্দ্রিয়া দাসগুপ্ত। সূচিত্রার বাবা মায়ের দেওয়া নাম রমাদাস গুপ্ত। শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা বাবার ছত্রছায়ায় রমা লেখাপড়ার পাশপাশি পাবনা শহরে সাংস্কৃতি পরিমন্ডলে বড় হয়ে ওঠেন। সে কালের ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়ীর পুত্র দেবনাথ সেনের সঙ্গে ১৯৪৭ সালে রমাদাস গুপ্তের বিয়ে হয়। স্বামীর উৎসাহ আর নিজের শিল্পী হওয়ার বাসনা রমা সেন বাংলা চলচিত্রে নাম লেখালেন। তখন তিনি রমাসেন থেকে হলেন সূচিত্রা সেন। নান্দনিক সৌন্দর্য আর অনাবদ্য নৈপুন্য সূচিত্রা সেন বাংলা চলচিত্র জগৎকে মনমুগ্ধ করে, বাংলা চলচিত্র জগতেরর ইতিহাসে মাইলফলক হিসাবে চিহ্নিত করলেন। ।
সূচিত্রা সেনের প্রথম ছবি শেষ কথা (১৯৫২), ১৯৭৩ সালে উত্তম-সূচিত্রা বক্স অফিস হিট সাড়ে চুয়াত্তর মুক্তি পেল। পরের দু’দশক সূচিত্রাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সাপ মোচন (১৯৫৫), সবার উপরে (১৯৫৫), সাগরিকা (১৯৫৬), পথে হল দেরি (১৯৫৭), অগ্নি পরীক্ষা (১৯৭৪), হারানো সূর ছায়াছবিতে শ্বাশত বাঙালি রমনির রুপ মাধুর্যের আধার দর্শকদের মনে দোলা দেয়। আজকের দর্শকদের মনে দোলা দেয় সাগরিকা ছবিতে সাগরিকার ভূমিকায় তার অনবদ্য অভিনয় মহানায়ক উত্তম কুমারের বিপরীতে সূচিত্রার অভিনয় তুলনাহীন।
দ্বীপ জ্বেলে যায়(১৯৫৯) সপ্তপদী (১৯৬১), বিপাশা (১৯৬১) প্রত্যেকটি ছবিতে সৌন্দর্য আর অভিনয় মাধুর্যে সুচিত্রা সেন অপূর্ব। উত্তম ছাড়াও সৌমিত্র, বসন্ত চৌধুরীর বিপরীতে নায়িকা হিসাবে তিনি অভিনয় করেছেন। ১৯৬৩-তে সাত পাকে বাঁধা ছবিতে গরীব শিক্ষক স্বামী সুখেন্দুর (সৌমিত্র) প্রেমের গোলক ধাঁধাঁ আর মায়ের আভিজাত্যের অহংকারের টানা পোড়নে আর সংঘাতময় পরিমন্ডলে অর্চনার চরিত্রে সুচিত্রা সেনের অভিনয় অসাধারন। এই অভিনয় তার অনবদ্য অভিনয়ের স্বীকৃতি স্বরুপ। সুচিত্রা সেন প্রথম বারের মত অভিনেত্রী হিসেবে মস্কো চলচিত্র উৎসবে আন্তজার্তিক পুরস্কার লাভ করেন। আটপৌরে ঘরের অসাধারণ রমণীর চরিত্রে রূপায়নে সুচিত্রা সেন যেমন অনবদ্য, পাশাপাশি আভিজাত সমাজের ব্যক্তিময় কাঙ্খিত প্রেয়সীর চরিত্রেও সমান পারদর্শী। এছাড়া সুচিত্রা সেন শিল্পী (১৯৬৫) রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত (১৯৫৮) সূর্যতোরন, (১৯৬৫) উত্তর ফাল্গুনী (১৯৬৩) দেবী চৌধুরানী (১৯৭৪) দত্তা (১৯৭৬), আলো আমার আলো, চোখের বালি সহ অনেক চলচিত্রে অভিনয়ে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলা ছায়াছবির জগৎ ছাড়িয়ে হিন্দি ছায়াছবির জগতেও সূচিত্রার অভিনয় পূর্ণতা অনবদ্য। দিলীপ কুমার এর বিপরীতে দেবদাস (১৯৫৫) ছবিতে পার্বতী চরিত্রের অভিনয়ের মাধ্যমে সূচিত্রার হিন্দি চলচিত্রে প্রবেশ। পার্বতী চরিত্রের সূচিত্রার অপূর্ব অভিনয়ের সুবাদে তিনি মুসাফির (১৯৫৭), চম্পাকলি (১৯৫৭), বম্বে কা বাবু (১৯৬০) মমতা (১৯৬৬) আঁখি (১৯৭৬) ইত্যাদি ছবিতে নায়িকা হিসাবে অভিনয় করেন। ১৯৭০ সালে স্বামী দেবনাথ সেনের মৃত্যুর পরেও তিনি অভিনয় ছাড়েননি।
সিনেমার পর্দা ও পর্দার বাইরে রোমাঞ্ছ এই দুয়ে মিলে সূচিত্রা সেন ছিলেন তার সময়ের সর্বাধিক আলোচিত নারী। তখনকার দিনে ছায়াছবির জগতে আরধ্য নারী হয়ে উঠছিলেন তিনি। সেকালে মেয়েরা তাঁর সাজ সজ্জা অনুকরন করত। তাঁর ফ্যাশন চাল-চলন সবই অনুকরণ করার প্রতিযোগিতা চলত সে যুগের আধুনিক মেয়েদের মধ্যে। ১৯৭৮ সালে হঠাৎ করে অভিনয় জগৎ থেকে দুরে চলে গেলেন রূপালী পর্দার মহারানী। ১৯১৪ সালের ১৭ জানুয়ারী তিনি আমাদের মাঝ থেকে চিরবিদায় নেন।
তিনি ছিলেন উপমহাদেশের চলচিত্র গগনের উজ্জ্বল নক্ষত্র। আর দুই বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ের মানস পটে চির ভাস্বর হয়ে রয়েছেন তিনি। ৬ এপ্রিল তাঁর ৮৯তম জন্ম বার্ষিকী। সূচিত্রা সেনের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী।
লেখক: বি, সরকার (কলামিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক) মোবাইল- ০১৭৪৬-৬৬৫১২৮. ০১৯২২-১৪৯৪৮২. ঊসধরষ- হশংংধৎশবৎ২৪@মসধরষ.পড়স হশংংধৎশবৎ@ুধযড়ড়.পড়স

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন