শ্যামনগরের উপকুলজুড়ে খাবার পানির জন্যহা-হা-কা-র


মার্চ ২৪ ২০১৯


বৃষ্টির পানি শেষ হয়েছে আরও আগে। গতদুই মাসধরে পুকুরের পানি খাচ্ছি।কিন্তু পানিকমে যাওয়ায়এখন ঘোলাআর দুর্গন্ধযুক্ত পানি খেয়ে প্রাণে বাঁচতেছি।কথাগুলো উপকূলবর্তী শ্যামনগর উপজেলার খাগড়াঘাট গ্রামেরষাটোর্ধ বয়সীআমিরণ বিবির।

তার সাথে থাকা গৃহবধূ তাসলিমা বেগম জানালেন তিন কিঃমিঃ দূরবর্তী কাশিপুর গ্রামথেকে খাবার জন্য পানি নিতে এসেছেন।সাত সদস্যের পরিবারের জন্য সকাল বিকাল দুই বারতাকে এইদীর্ঘ পথপাড়ি দিয়েব্যবহার অযোগ্যপানি টেনেনিতে হয়খাওয়ার জন্য।

 তবে এমন দৃশ্য কেবল ওই খাগড়াঘাট গ্রামে নয়। বরংশ্যামনগর উপজেলার হেঞ্চি, তালবাড়িয়া,কাঁঠালবাড়িয়াসহ গোটা উপকূলীয় জনপদজুড়ে। সর্বত্রই সুপেয় খাবার পানির জন্য রীতিমত হা-হা-কা-র চলছে।

 স্থানীয়দের দাবি উপকূলীয়এ জনপদে গভীর ওঅগভীর নলকূপ সফল না হওয়া, আরডব্লিউএইচ,পিএসএফসমুহ যথাযথভাবে কাজ না করা সহনানাবিধ কারণে এলাকাবাসীর খাবার পানির প্রধান উৎস বৃষ্টির পানি।

 কিন্তু বছরের অর্ধেকটা সময় বৃষ্টির পানি দিয়ে চললেও বাকি সময় তারা পুকুরের পানি ব্যবহার করে।কিন্তু দিনেদিনে পুকুরের পানিও কমে যাওয়ায় এখন কর্দমাক্ত আর দুর্গন্ধময় পানিই তাদের একমাত্র ভরসা।

এদিকে খাবার পানি নিয়ে উপকূলবাসীর  দীর্ঘদিনের সমস্যা নিরসনে এক বছর আগে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পুকুর,দীঘি, জলাশয় পুনঃখনন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর সমুহের সমন্বয়হীনতায় পানি সংরক্ষণসহ নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যেগৃহীত ওইপরিকল্পনা শুরুতে হোঁচট খেতে বসেছে।
যদিও কর্তৃপক্ষেরদাবি দুইএকটি স্থানে সমস্যা হলেও দ্রুতই বাকি প্রকল্পসমুহ পুরোপুরি কাযার্দেশ অনুযায়ী সম্পন্নহবে।

ভেটখালী গ্রামের সুষমামন্ডল ওসুধা রানীজানান আইলারপর থেকে প্রায় চার কিঃমিঃ দুরের শেখবাড়ির দীঘি থেকে তারা গোটা গ্রীস্মকাল জুড়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতো। তিন চার বছর আগে বিদেশী সংস্থা জাইকা’র পক্ষে স্থানীয় ঈশ্বরীপুর ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ) রাস্তা জুড়ে পাইপযোগে বসতবাড়ির সামনে পানি টেনে আনার ব্যবস্থা করে।

কিন্তু এক বছরের মধ্যে পাইপসহ যাবতীয় সরঞ্জামাদি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন আবারও প্রখররৌদ্রের মধ্যেওই দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে খাবার পানি সংগ্রহকরতে হচ্ছে। তবে গতকিছুদিন ধরে পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় এখন কাদাযুক্ত পানি খেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। গরম বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে পানি লবণাক্ত হয়ে যাওয়ার অভিযোগও তাদের।
কাঠাঁলবাড়িয়া গ্রামের প্রভাষক সুভাস মন্ডলএবং মুজিবর রহমানসহ স্থানীয় রাজানান খুটিকাটা,কাঠালবাড়িয়া, কাছিহারানিসহ পাঁচ গ্রামের মানুষেরগ্রীষ্ম কালের একমাত্র পানির উৎস কাঁঠালবাড়িয়া সরকারি দীঘি। কিন্তু পুকুরটি খননের জন্য শুকিয়ে দেয়ায় এখন সাত,আট কিঃমিঃ দূরবর্তী বিভিন্ন পুকুর থেকে পানিসংগ্রহ করতে হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে দুরত্ব ভেদে কলস প্রতিদশ থেকেত্রিশ টাকা পর্যন্ত মজুরী দিয়ে পানি সংগ্রহের কথা জানান তারা।

গ্রামাঞ্চল আর প্রত্যন্ত জনপদে বসবাস করেও টাকা দিয়ে পানি কিনে খাবার প্রায় অভিন্ন অভিযোগ তোলেন ছোটকুপোট, আটুলিয়াসহ আরও অনেক গ্রামের শ্রমজীবী মানুষ।তাদের দাবি‘ভাত রুটিনা খেয়েও এক বেলা থাকা যায়।কিন্তু পানি ছাড়া একমুহূর্ত কাটেনা’। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে পানি বিশত্রিশ টাকায়প্রতি কলস কিনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পুকুরের কর্দমাক্ত,দুর্গন্ধময় আর লবণ পানি খাচ্ছেন বলেও জানান তারা।
কাঁচড়াহাটি গ্রামের প্রভাষ মন্ডল জানায় নিজে দিনমুজরের কাজ করে। কিন্তুএলাকার পুকুরের পানি কমে গন্ধ আর ঘোলা হয়ে যাওয়ায় এখন তাকেও টাকা দিয়ে পানি কিনে খেতে হচ্ছে। এমনদৃশ্য প্রায়গোটা উপকুলজুড়ে। খাবার উপযোগী একটু পানির জন্য তারা গ্রীষ্মের শুরু থেকে লড়াই করছে বলে জানান।

উপকুলবাসীর খাবার পানিরএ সমস্যা দীর্ঘদিনের। খাবার পানি নিয়ে উপকুলবাসীর সমস্যা নিরসনেএক বছরআগে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় পুকুর, দীঘি,জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।যার অংশ হিসেবে উপকূলীয়এ জনপদে প্রথম পযার্য়ে ৫৭টি পুকুরপুনঃখননের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যেখানে নুন্যতম ১৯লাখ থেকে সবোর্চ্চ ৬৮লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতিটি পুকুরের জন্য।
এদিকে খাবারউপযোগী পানির সমস্যা নিরসনে গৃহীত এপরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুতে বিপত্তি দেখাদিয়েছে। জেলাপরিষদের পুকুর দাবি করে প্রকল্প বরাদ্দ দেয়ার পর কিছু পুকুরের মালিকানা দাবি করেছে স্থানীয়রা।তাদের অভিযোগ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে জেলাপরিষদ তাদের পৈত্রিক পুকুর কে সরকারি পুকুর উল্লেখ করে প্রস্তাবনা পাঠায়। ফলে সরকারি উদ্যোগে এসব পুকুর পুনঃখনন নিয়ে সমস্যার সৃষ্টিহচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে ঠিকাদার নিয়োগের পরও ভুরুলিয়ার কাটিবারহল গ্রামে ১৬১ নং সরকারিপ্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন পুকুরটির খনন কাজ শুরতেই বন্ধহয়ে গেছে। জেলা পরিষদ উক্ত পুকুর নিজেদের দাবিকরে পুনঃখননের প্রস্তাবনা পাঠালেও স্থানীয়রা দাবি করেছে এটা তাদের পৈত্রিক পুকুর।

 একই বিদ্যালয়ের সভাপতিশেখ মহিউদ্দীন জানান জেলাপরিষদ শুরুতে এটি তাদের পুকুর বলে দাবি করলেও কাগজপত্র দেখে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে গেছে। ভুল তথ্যে জেলাপরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর তাদের ওইপুকুর সরকারি তালিকাভুক্ত করেছিল। প্রায় অভিন্ন অবস্থাসৃষ্টি হয়েছে কৈখালীর খোসালপুর সরকারি দীঘিকে  কেন্দ্র করে। জেলা পরিষদ সম্প্রতি সেখানে কাজ শুরু করলেও জনৈক আশেক এলাহী উক্ত পুকুর নিজের দাবি করায় সেখানকার খনন কাজওবন্ধ হয়ে গেছে।
একই ভাবে নুরনগরসহ আরও কয়েকটি এলাকায় সরকারি দীঘি নির্ধারণ নিয়ে স্থানীয়দের সাথে মতপার্থক্যের কারণে আপাতত সেসব এলাকায় সরকারি উদ্যোগে পুকুর খননের কাজ বন্ধ হওয়ায় খাবার পানি নিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে বলে জানান কৈখালীর ইউপিসদস্য অসীমকুমার মন্ডলসহ   কাটিবারহল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান।

এদিকে সরেজমিনে কাঠালবাড়িয়া সরকারি দীঘি পরিদর্শনে যেয়ে দেখা গেছে নানা অনিয়মের মধ্যেই শুরু হয়েছে পুকুর পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ। কাজ শুরুর তারিখ থেকে সম্পন্ন হওয়ার মেয়াদকাল এমনকি কাজের ধরন কিংবা প্রাক্কালিত ব্যয়সহ কোন ধরনের তথ্য সংবলিত সাইনবোর্ড সেখানে লাগানো হয়নি।

পুকুরটি খনন কাজ তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা কালিদাস সরকার জানান, তিনি দীর্ঘদিন জেলাপরিষদ থেকে পুকুরটি ইজারা নিয়ে ভোগ দখল করে আসছিলেন।তাই প্রকল্প অনুমোদনের পর কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদার তাকে খনন কাজ তদারকির দায়িত্ব দিয়েছে।

জানা যায় পুকুরটি পূর্বেকার পাড় হতে ১৮ ফুটগভীর হওয়ার কথা। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে পাড়ের উপর দুই,তিন ফুট মাটি ফেলেওই গভীরতা অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা হয়েছে।

 স্থানীয় গ্রামবাসী অনিলমন্ডল, সুধাংশুও আব্দুর রশিদ জানায় কত টাকা বরাদ্দ কিংবা কাজের মেয়াদকাল সম্পর্কিত বিষয়া বলীসহ কোন বিষয়ে কোন সাইনবোর্ড না দেয়ায় তারা কাজ নিয়ে কোন তথ্য দিতে পারছে না।উদ্বোধনের সময়ে এলাকাবাসী খাবার পানির সমস্যা দুর করতে পুকুরটি পুনঃখননের কথা তাদের জানানো হয়েছে।
তবে নামপ্রকাশ না করার শর্তেস্থানীয় কয়েক গ্রামবাসী জানান, প্রায় বত্রিশ লাখ টাকায় ব্যয়েওই পুকুরটি পুনঃখননসহ সেখানে সৌন্দর্য্য বর্ধনের বিষয়ে তারা জেনেছেন।কিন্তু পরবর্তীতেওই প্রকল্পেরবিসয়ে আরকোনকিছুই তাদেরজানানো হয়নি।বিষয়টির মধ্যেশুভঙ্করের ফাঁকির মত নানা বিষয়থাকতে পারেবলেও তারাদাবি করেন।

এদিকে উপজেলা সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান. এতদাঞ্চলের শতকরা সত্তর ভাগ মানুষ পুকুরের পানি পান করে থাকে। স্যালাইন এলাকা হওয়াতে গ্রীষ্মকালে পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় খাবার পানি সংকট প্রবল আকার ধারণ করে। তবে সরকারিভাবে ট্যাংকি সরবরাহ করে বৃষ্টির সময়কার পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয়দের সারা বছরের জন্য প্রয়োজনীয় পানি চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে।

তিনি আরও বলেন ১৬৩৮টি গভীর এবং ৩৫৮টি অগভীর নলকূপ ছাড়াও ৩৯৭ টি ভিএসএসটি, ৪৮৩টি এসএসটি, ১০৯৮টি আরডব্লিউএইচ এবং ৫৬৬টি পিএসএফ’র মাধ্যমে স্থানীয়দের পানির চাহিদা মেটানোর চেষ্টা চলছে।

তারপরও স্থানীয়দের পানিরচাহিদা মেটাতেজেলা পরিষদেরপুকুরসমুহ পুনঃখননের পাশাপাশি ব্যক্তির উদ্যোগেনুতন নুতনপুকুর খননেরপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলেও তিনিউল্লেখ করেন। (তথ্যসুত্র: দৈনিক সাতক্ষীরা)

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন