সাইফুল্লাহ লস্কর স্মরণে : আমাদের সাইফুল্লাহ ভাই


ডিসেম্বর ৪ ২০১৮


ফরিদ আহম্মেদ :

ঠিক কবে কখন সাইফুল্লাহ্ ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়েছিল তা আজ আর মনে পড়ে না। তবে ছাত্রজীবনে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার সুবাদে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল এবং ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে আমার কর্মজীবনে প্রবেশের পরেও তাঁর সাথে উষ্ম আন্তরিকতার সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। তাঁর সঙ্গে জীবনে বহুবার দেখা হয়েছে, বহুবার তাঁর বাসায় আতিথ্য গ্রহণ করেছি, অনেক আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর সাথে অংশ নিয়েছি। মৃদু ভাষী, সদা হাস্যময়ী, বিনয়ী, ভদ্র, মার্জিত স্বভাবের এই মানুষটির সঙ্গে আমার শুধু নয় এই অঞ্চলের গোটা শ্রমজীবি মানুষের গড়ে উঠেছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যা তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সাইফুল্লাহ্ ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ জানতে পারি পত্রিকার পাতা থেকে, পরে তাঁর সংগঠন কৃষক সংগ্রাম সমিতির নেতাদের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে খবরটি নিশ্চিত হই। তাঁকে নিয়ে অনেক স্মৃতি, অনেক কথা আজো মনে পড়ে। পেশাগত ক্ষেত্রে কর্মব্যস্ততার কারণে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলেও তাঁর সাথে কখনো দেখা হলেই উষ্ম আন্তরিকতার সম্পর্ক অনুভব করতে পেরেছি।

সাইফুল্লাহ্ লস্কর দীর্ঘ সময় ধরে এদেশের কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। তিনি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বহু কৃষক আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে বৃহত্তর খুলনা জেলাতে বিল ডাকাতিয়া আন্দোলন, দক্ষিণাঞ্চলে ঘের মালিকদের বিরুদ্ধে অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ বিরোধী আন্দোলন, খাস জমিতে ভূমিহীন কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন উল্লেখযোগ্য ু; যশোর জেলায় বিল ডহুরী, বিল খুকশী, বিল বুড়–লী, আগরহাটি-ভায়না বিলের আন্দোলন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য আন্দোলন সংগঠিত হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদ ও তাঁর সহযোগী দেশীয় শাসক-শোষক গোষ্টির পরিকল্পনায় পরিচালিত প্রতিবিপ্লবী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালে যশোর-কেশবপুর-চুকনগর-তালা-পাইকগাছা পর্যন্ত গণবিক্ষোভ মিছিল সংগঠিত হয়। তিনি এই আন্দোলনে অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

ষাট-এর দশকে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হিসাবে পাকিস্তানের শাসক-শোষক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে পরিচালিত ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তীকালে তিনি পর্যায়ক্রমে ন্যাপ, কৃষক সংগ্রাম সমিতি ও জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের রাজনীতির সাথে সক্রিয় ছিলেন। এই সময়ে ঐ অঞ্চলের সংঘঠিত প্রতিটি কৃষক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন ও নেতৃত্বদানকারীর ভূমিকা পালন করেন। ঐ অঞ্চলে গড়ে উঠা ভূমিহীন কৃষকদের খাস জমিতে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা গ্রহণ করে ভূমিদস্যু স্থানীয় জোতদারদের বিরুদ্ধে কৃষক-জনতার প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন সদালাপি, মার্জিত, ভদ্র এবং কর্মীদের প্রতি দরদী মানুষ। তিনি সর্বদা ভোগ-বিলাসকে পরিহার করে সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্থ ছিলেন। তিনি আজীবন বাম প্রগতিশীল মতাদর্শকে ধারণ ও লালন-পালন করেছেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তির পক্ষের একজন নিষ্ঠাবান নেতা। তিনি ছিলেন আজীবন সাম্রাজ্যবাদ ও তার এদেশীয় এজেন্ট সামন্ত-মুৎসুদ্দী শ্রেণীর বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াকু ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী আপোষহীন ভূমিকার কারণেই স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিদস্যুদের সহযোগীতায় সাম্রাজ্যবাদের দালাল ক্ষমতাসীন শাসক-শোষক গোষ্ঠির পরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয় শক্তি নির্মমভাবে তাঁকে খুন করেছে। তাঁর মৃত্যুতে এ দেশের কৃষক-জনতা হারিয়েছে তাদের এক আপোষহীন নেতাকে আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তি হারিয়েছে তাদের একজন মহান সহযোদ্ধাকে। এদেশের সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য এ মৃত্যু এক অপূূূূূরণীয় ক্ষতি। এই সময়ে রাষ্ট্রশক্তি শুধু সাইফুল্লাহ্ লস্করকে হত্যা করেনি, হাজার হাজার মানুষকে বিচার বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন পন্থায় হত্যা করছে। সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস পরিচালিত হচ্ছে। এই হত্যাকান্ড শুধু আমাদের দেশেই নয়, সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন দেশে এই রাষ্ট্রীয় শক্তির দ্বারা হত্যাকান্ড সংগঠিত হচ্ছে। এর কারণ কি ? এর কারণ নিহিত আছে বর্তমরুন বিশ্বে প্রচলিত পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বিদ্যমান অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে।

সমগ্র পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা আজ গভীর অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বিদ্যমান এই সাধারণ সংকটকে পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদগণ মন্দা হিসাবে অভিহিত করছেন। প্রথম বিশ্ব মন্দার সূচনা হয় ১৯০৩-০৫ পর্বে। এই মহামন্দার পরিণতিতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয় ; ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের মাঝদিয়ে রুশদেশে শ্রমিকশ্রেণী বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। ২য় মহামন্দা শুরু হয় ১৯২৯ সালে। ১৯৩৩ সালের দিকে মন্দা কিছুটা লাঘব হয়েছে বলে ধরা হয় ; বাজারে কিছুটা চাঙ্গা ভাব দেখা দেয়। কিন্তু আবার গভীর মন্দা সব কিছুকে গ্রাস করে। এই মন্দার পরিণতি ঘটে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে। ১৯৩৯ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে পূর্ব ইউরোপের ৭টি দেশে শ্রমিকশ্রেণী বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। বিগত ২টি মহামন্দার কোনটাই কেবল ক্রমাগত অবনতির ফল ছিল না। উভয় মন্দার সময়কালেই অর্থনীতির উত্থান ঘটেছিল। তবে তা ছিল সাময়িক ; যা অর্থনৈতিক মন্দার প্রাথমিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ও নতুনভাবে আঘাত হানে এবং গোটা অর্থনীতিকে গ্রাস করে। পল ক্রুগম্যানের মতে, “বিশ্ব এখন ৩য় মন্দার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এটা ভেবেই আমি চরমভাবে ভীত। বর্তমান মন্দার গতি প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে এটা অতীতের মহামন্দা থেকেও আরো দীর্ঘতর ও ভয়াবহ হবে। কিন্তু অর্থনীতিকে এর চরম মূল্য দিতে হবে এবং সর্বোপরি কোটি কোটি লোক বেকার হয়ে পড়বে যা অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে। প্রাথমিকভাবে নীতির ব্যর্থতার কারণেই ৩য় মন্দার সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবী জুড়ে সব সরকার মূল্যস্ফীতি দ্বারা আবিষ্ট রয়েছে। অথচ যেখানে প্রধান সমস্যা হলো মুদ্রা সংকোচন।”

পল ক্রুগম্যান আরো বলেন, “ কিন্তু ভবিষ্যত ইতিহাসবিদরা আমাদের বলবেনÑএটাই ৩য় মন্দার শেষ ছিল না, ঠিক যেমন ব্যবসার একটু ভাল অবস্থা যা ১৯৩৩ সালে শুরু হয়েছিল তা মহামন্দার শেষ ছিল না। যাই হোক না বেকারত্ব বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদী বেকারত্বের চরম অবস্থা যা ধ্বংসাত্মক বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে তাও খুব আগের ঘটনা নয়। এই বেকারত্ব দ্রুত হ্রাস হয়ে আসার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ খুব ভালভাবেই এই ঘরানার মুদ্রা সংকোচন কৌশলের ফাঁদে পড়েছে। সংকটের এই ঘোলাটে দৃশ্যের মাঝেও আপনারা নিশ্চয়ই প্রত্যাশা করবেন যে নীতি নির্ধারকেরা এটা অনুধাবন করবেন তারা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য যথেষ্ট কাজ এখনো করেননি। কিন্তু না কয়েক মাস ধরে আশ্চর্যজনকভাবে পুনরুদ্ধারের জন্য নগদ টাকা ও ভারসাম্য বাজেটের সেই পুরানো পন্থার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।”

পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার নীতি নির্ধারকেরা মন্দা কাটিয়ে উঠার ঘোষণা দিলেও বিশ্ব অর্থনীতির বাস্তব চিত্র ভয়াবহ সংকটের নির্দেশ করছে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার সর্ববৃহৎ অর্থনীতি মার্কিন অর্থনীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১০-২০১১ সালের জন্য ৩.৮৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট পাশ করেছে। এই বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১.৫৬ ট্রিলিয়ন ডলার যা যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ১০.৬%। বাজেটে সামরিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০৮.৩ বিলিয়ন ডলার। ২০০৯ সালের শেষ কোয়ার্টারে মার্কিন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৫.৯% দেখানো হয়েছে। ২০০৭ সালে মন্দা শুরু হবার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বেকার হয়েছে ৮৩ লক্ষ ৬০ হাজার জন। ২০১০ সালের ফেব্র“য়ারীতে বেকারত্বের হার দাঁড়ায় ৯.৭% যা বর্তমান মাসে ২ অংকের সংখ্যাতে পৌঁছাবে বলে বলা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ ১২ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১৪০ টি ব্যাংক দেউলিয়া হয়। নতুন বছরের প্রথম মাসে আরো ৩৫ টি ব্যাংক দেউলিয়া হয়েছে।

পুনরুদ্ধারের কথা বলা হলেও ইউরোপের অর্থনীতিতেও সংকট এবং মন্দা অব্যাহত রয়েছে। ২০০৯ সালের শেষ কোয়ার্টারে ইউরোপের কোন কোন দেশে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি দেখানো হলেও অর্থনীতিতে বাস্তবে মন্দা ও সংকট অব্যাহত রয়েছে। ২০০৯ সালে সামগ্রিকভাবে ইউরো জোন এর অর্থনীতি ৪% সংকুচিত হয়। ২০০৯ সালে জার্মান অর্থনীতি ৫%, ফ্রান্স ২.২%, নেদারল্যান্ড ৪%, অষ্ট্রিয়া ৩.৬% ও চেক প্রজাতন্ত্র ৪.৩% সংকুচিত হয়। এই সময়ে আইসল্যান্ড ও গ্রীসের অর্থনীতি দেউলিয়া হয়ে পড়ে। গ্রীসের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ হাজার কোটি ডলার। গ্রীসের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ১২.৬%। সর্বশেষ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১১ হাজার কোটি ইউরো ঋণ প্রদানের প্রতিশ্র“তি দিয়েছে গ্রীসকে। গ্রীসের পর এবার হাঙ্গেরীতে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ঝুঁকিতে আছে স্পেন, পর্তুগাল, ইটালী, আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেন। ইউরোপের বৃহৎ অর্থনীতি জার্মানী, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অর্থনীতি ঋণের বোঝায় জর্জরিত। ব্রিটেনের ঋণের পরিমাণ ৯.২, জার্মানীর ৫.২ ও ফ্রান্সের ৪.৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এ পর্যায়ে জাপানের অর্থনীতি ধারাবাহিক মন্দার প্রক্রিয়ায় ২০০৮ সালে বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে আবারো মন্দায় পতিত হয়। ২০০৯ সালে জাপানের অর্থনীতি ৫.২% সংকুচিত হয় এবং বছরের চতুর্থ কোয়ার্টারে প্রবৃদ্ধি ১.১% এ দাঁড়ায়। জাপানের জাতীয় বিমান সংস্থা ‘জাপান এয়ার লাইন্স’ ২৬ বিলিয়ন ডলার ঋণগ্রস্থ হয়ে দেউলিয়া ঘোষিত হয়। জাপানের বড় গাড়ী কোম্পানী টয়োটা ও নিশান যান্ত্রিক ত্র“টির কারণে বাজার থেকে বিপুল সংখ্যক গাড়ী তুলে নিতে বাধ্য হয়। এই সময়ে জাপানে ‘উদ্ধার’ ও ‘উদ্দীপক’ কর্মসূচী অব্যাহত থাকে। ২০০৯ সালে বৈশ্বিক মন্দার প্রভাব মোকাবেলায় চীন ৫৮৫ বিলিয়ন ডলারের উদ্দীপক কর্মসূচী গ্রহণ করে প্রবৃদ্ধি ৮.৭% করতে সক্ষম হয়। এই সময় আভ্যন্তরীন বাজারে গাড়ী বিক্রয়ের ক্ষেত্রে চীন প্রথম স্থান অধিকার করে। চীনের গাড়ী বিক্রয়ের পরিমাণ ১ কোটি ৩৬ লক্ষেরও বেশী ছিল। ২০০৯ সালে রুশ অর্থনীতি সংকটে পড়ে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় ও তার অর্থনীতি সংকুচিত হয় ৭.৯%।

সারা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অর্থনৈতিক এই নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার সংকটকে গভীরতর করছে। বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রধান প্রধান পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো স্বীয় বাজার ও প্রভাব বলয় রক্ষা এবং বিস্তারের লক্ষ্যে পরস্পর জোটবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে স্ব স্ব স্বার্থ রক্ষার উপায় খুঁজছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বর্তমান পর্যায়ে (ক) মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে জোট, (খ) জার্মান-ফ্রান্সের নেতৃত্বে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং (গ) রাশিয়া-চীনের নেতৃত্বে সাংহাই-৬ গঠন করে জোটবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হচ্ছে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের দ্বারা পরিচালিত বিশ্বব্যাংক, আএমএফ, ডব্লিউটিও, জি-৭, জি-২০, জাতিসংঘ ও তার অধীনস্থ বিভিন্ন সংস্থা আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও বিশ্বযুদ্ধের বিপদের দিকটি সামনে আসছে। অন্যদিকে সারা বিশ্বব্যাপী শ্রমের সাথে পুঁজির দ্বন্দ্বের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের সংকটের বোঝা জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের সংকট লাঘবের চেষ্টা করছে। অপরদিকে শ্রমিকশ্রেণী ও জনগণ মজুরী-বেতন- ভাতা, পেনশন, জনকল্যাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার বিরুদ্ধে তাদের মধ্যে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ বৃদ্ধি পেয়ে একের পর এক আন্দোলন-সংগ্রাম, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও ধর্মঘট সংঘটিত করে চলেছে। তাই বিশ্বব্যাপী কার্যকরী ৩ মৌলিক দ্বন্দ্ব (ক) শ্রম-পুঁজির দ্বন্দ্ব, (খ) আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব ও (গ) সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা নির্যাতিত দেশ, জাতি ও জনগণের সাথে সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্ব-এর তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে একদিকে বিশ্বযুদ্ধের বিপদ অন্যদিকে বিশ্ববিপ্লবের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমাদের বাংলাদেশ একটি নয়াউপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক শক্তি হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ বিশেষত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় এদেশের শাসক- শোষক গোষ্ঠি ধারাবাহিকভাবে গণবিরোধী জাতীয় স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ কার্যকরী করে চলেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ হিসাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে সামনে নিয়ে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ পুঁজিবাদী চীনের মোকাবেলার লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশ মালাক্কা প্রণালী সংলগ্ন ভারত মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত বঙ্গোপসাগরীয় রাষ্ট্র হওয়ায় এখানকার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে তার যুদ্ধ পরিকল্পনা কার্যকরী করার প্রয়োজনে বাংলাদেশকে ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করতে চায়। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শক্তি ও বিপ্লবী শক্তির উপস্থিতি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার বিপদের কারণ হিসাবে চিহ্নিত করে একে নির্মূল করতে চায়। তাই আমাদের দেশের শাসক-শোষক গোষ্ঠি মার্কিন সাম্রজ্যবাদের পরিকল্পনায় গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তিকে সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার ও বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে খুন করে চলেছে। একে প্রতিহত করতে হলে দেশের সকল গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে ; সারা বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণী, শান্তিকামী ও নিপীড়িত জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে সাম্রাজ্যবাদকে নির্মূল করতে হবে। বিশ্বশান্তি ও মানবজাতির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে এর কোন বিকল্প হতে পারে না। এ পথেই সাইফুল্লাহ্ ভাই তাঁর সমগ্র জীবন নিবেদিত রেখে প্রয়াত হয়েছেন। তাই তিনি জনগণের প্রকৃত অগ্রসেনাণী।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন