ধরা-ছোয়ার বাইরে সুন্দরবনের দস্যুদের অস্ত্র সরবরাহককারী গডফাদাররা


জুলাই ৭ ২০১৮

নিজস্ব প্রতিনিধি: একটা সময় বনদস্যু বাহিনীর হাতে সম্পূর্ণ জিম্মি হয়ে পড়েছিল সুন্দরবনের পেশাজীবীরা। সরকারের আন্তরিকতায় বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয়ায় ধীরে-ধীরে দস্যু মুক্ত হচ্ছে গোটা সুন্দরবন অঞ্চল।
সম্প্রতি সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে সুন্দরবনের শীর্ষ ২৬টি দস্যু বাহিনী। এই প্রক্রিয়ায় সুন্দরবনে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরমিাণ গোলাবারুদ উদ্ধার হলেও অস্ত্র যোগানদাতা গডফাদাররা গ্রেফতার না হওয়ায় পুরোপুরিভাবে বন্ধ হচ্ছে না সুন্দরবনের দস্যুতা। এসব গডফাদাররাই আবারো নতুন নতুন বাহিনী তৈরি করে সুন্দরবনে অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। ফলে নতুন করে সুন্দরবনের পেশাজীবী জেলে, বাওয়ালী, মৌয়ালীরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
সুন্দরবনের সংশ্লিষ্ট জেলে, বাওয়ালীরা জানায়, সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের (সাতক্ষীরা রেঞ্জ) বনজীবীরা বর্তমানে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ছোটভাই বাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই বাহিনী পরিচালনা করছে শ্যামনগর উপজেলার কালিঞ্চি এলাকার মাজেদ ভাঙ্গির ছেলে জাকির ভাঙ্গি।
এই ছোটভাই বাহিনীর বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৫ জন। তাদের কাছে ডাবল ও সিঙ্গেল ব্যারেল বন্দুক, টুটুবোর রাইফলেসহ প্রায় ১৫টি অস্ত্র রয়েছে।
সুন্দরবনের জেলে বাওয়ালীরা বলছেন, এসব বাহিনীর কেউ সরকারে কাছে আত্মসমর্পণ করলে বা সুন্দরবনে মাঝেমধ্যে প্রশাসনের বিশেষ অভিযানে দস্যুদের দুই-একজন গ্রেফেতার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলওে দস্যুদের অস্ত্র যোগানদাতা গডফাদাররা সব সময় থেকে যায় ধরা-ছােঁয়ার বাইরে। যে কারণে সরকার চাইলেও সুন্দরবন থেকে দস্যুতা একেবারেই নির্মূল হচ্ছে না।
র‌্যাব, পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব গডফাদারদের তথ্য, এদের মধ্যে কেউ কেউ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হলেও আইনের ফাঁক-ফোকরে জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে আসে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন লাগোয়া মুন্সিগঞ্জ, গাবুরা ও রমজাননগর ইউনিয়নের কিছু প্রভাবশালী ব্যাবসায়ীর বিরুদ্ধে বনদস্যুদের নিয়ন্ত্রণ ও অস্ত্র যোগান দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বহু আগে থেকেই। স্থানীয় জেলে বাওয়ালীরা জানায়, কিছু দিন আগে আত্মসমর্পণ করা বনদস্যু আলিফ ও মজনু বাহিনীর অন্যতম গডফাদার ছিল মুন্সিগঞ্জের সিরাজুল, বকুল মেম্বর, কালিঞ্চি এলাকার জামু ও রমজাননগর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য লাল্টু। এদর মধ্য সিরাজুল ও জামু আলিফ বাহিনীর সাথ র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু লাল্টু মেম্বর গত বছর র‌্যাবের কাছে গ্রেফতার হওয়ার পর জামিনে মুক্তি পায়। মুন্সিগঞ্জের বকুল মম্বরকেও একবার আটক করছিল র‌্যাব। বর্তমানে সে ঐ এলাকায় র‌্যাবের সোর্স পরিচয়ে নানা অপকর্ম করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক স্থনীয় এক বনজীবী অভিযোগ করে জানান, অস্ত্র ব্যাবসায়ী রমজাননগর ইউনিয়নর টেংরাখালি গ্রামের লাল্টু মেম্বর র‌্যাবের হাতে আটক হয়ছিল এরপর জামিনে ফিরে আসে। কিছুদিন আগে সে সুন্দরবনে ছোটভাই বাহিনীর কাছে ৪টি অস্ত্র সরবরাহ করছে। সেই অস্ত্রের টাকা নিয়ে ছোটভাই বাহিনীর সাথে তার দন্দ্ব চলছে। ভেটখালি বাজারে লাল্টু মেম্বর ও ছোটভাই বাহীনির প্রধান জাকিরের ভাই ইউনুসের মধ্যে এই টাকা নিয়ে হাতাহাতিও হয়েছে। জেলে বাওয়ালীদর এসব অভিযাগের প্রমাণও মিলেছে অনুসন্ধানে।
লাল্টু মেম্বরের অস্ত্র ব্যাবসার বিষয়টি জানার পর যোগাযোগ করা হয় বর্তমানে সুন্দরবনে থাকা বনদস্যু ছোটভাই বাহিনীর প্রধান জাকিরের সাথে। জাকির বলেন, কিছুদিন আগে লাল্টু মম্বরের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে চারটি অস্ত্র ও একশত পিছ গুলি কিনেছি। সে নিজে সুদরবনে এসে আমাকে অস্ত্র দিয়ে গেছে। সম্প্রতি একটি ব্র্যাশ (অস্ত্র) ও কিছু গুলি কেনার জন্য ১০লাখ টাকা দিয়েছিলাম। কিন্তু সে অস্ত্র না দিয়ে তালবাহানা করায় আমি টাকা ফেরত চাইলে সে আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখাচ্ছে। এ নিয়ে আমার ভাইয়ের সাথে তার হাতাহাতিও হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে লাল্টু মেম্বর বলেন, আমি এলাকার একজন জনপ্রতিনিধি। সুন্দরবনের মূল অস্ত্র ব্যবসায়ীরা আমাকে ফাঁসানোর জন্যই র‌্যাবের কাছে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল। র‌্যাব আমাকে আটক করেছিল। বর্তমানে আমি জামিনে বাড়িতে আছি। ছোটভাই বাহিনীর প্রধান জাকিরের সাথে নৌকার টাকা নিয়ে পূর্বের একটি লেনদেন আছে। এটি জাকির দস্যুতা করতে যাওয়ার আগের ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে শ্যামনগর থানাতে বসাবসি হয়েছিল। তার অভিযোগ মিথ্যা আমি কোন অস্ত্রের ব্যাবসা করি না। প্রতিপক্ষরা আমাকে ফাঁসাতেই তাকে দিয়ে এসব অভিযোগ করাচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে মুন্সিগঞ্জের সাবেক ইউপি সদস্য বকুল বলেন, আমি সুন্দরবনে কোন ব্যাবসা করি না। বনদস্যুদের সাথেও আমার কোন সম্পর্ক নেই। প্রশাসনের সাথে আমার সু-সম্পর্ক থাকায় অনেকে আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ করে। এলাকার কোন জেলে বাওয়ালী বিপদে পড়লে আমি তাদের সগযোগিতা করি। এমনকি প্রশাসনের কেউ সুন্দরবনে অভিযান চালালেও তারা আমার সহযোগিতা নেয়। তবে সুন্দরবন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে সুন্দরবনে নিজেদের ব্যবসা ও অধিনস্থ জেলে বাওয়ালীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেই দস্যু বাহিনী গঠন ও অস্ত্র সরবারহ করে লোকালয়ের ব্যবসায়ী গডফাদাররা। বনদস্যুদের মধ্যে কেউ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে আবারো নতুন নতুন বাহিনী তৈরি করছে মূলত তারাই। বিভিন্ন সময় এসব অস্ত্র ব্যাবসায়ি গডফাদাররা পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টর্গাডরে হাতে গ্রেফতার হলেও আইনের ফাঁক ফোকরে বেরিয়ে এসে আবারো তাদের কার্যক্রম চলমান রাখে। ফলে সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সুন্দরবনের দস্যুতা একেবারেই বন্ধ হচ্ছে না।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন