শ্যামল সেই ইচ্ছেটুকু খুঁজে পেয়েছেন তাই পৃথিবীর রহস্যের কাছে পায়ে হেঁটে যেতে তাঁর দ্বিধা নেই


মে ১১ ২০১৮

স ম তুহিন

কাজী মুহম্মদ অলিউল্লাহ স্যার বাংলা পড়াতেন একটা বড় কলেজে। ভাষার পরে বিশেষ করে উপভাষা নিয়ে কাজ করেছেন। অনেক মেধা আর মানসিক পরিশ্রমের চিহ্ন তার ‘সাতক্ষীরার উপভাষা স্বরূপ ও স্বাতন্ত্র্য’ বইটি। অনেকেই বলেন এ কাজটি অনেক টিকে থাকা কাজের মধ্যে একটু বেশি রকমের ভাব নিয়ে টিকে থাকবে। কবিতা লিখতে কষ্ট হয় বলে কবিতা লেখেন না, চেষ্টাও করেন না। তারমানে অন্য যে কোনো কাজের চেয়ে কবিতা লেখা বা সাজানো অনেক কঠিন কাজÑঅনেকবার শুনেছি এ কথা তাঁর মুখে। যদি তিনি কবিতা লিখতেন, তাহলে ভালো কিছু কবিতা আমরা পেতাম, আমার ধারণা। কবিতা সবাই লিখলেও কবিতার সাথে মিশে যেতে পারে না কিংবা কবিতা ধরতে পারে না বেশিরভাগ কবিতার লেখক। এমনকি কবি হিসেবে সবাই চেনে এমন কবিতা লেখকও কবিতা কী, কবিতার বাঁকবদল, কোন সময়ের কবিতা কেমন হবে…ইত্যাদি বিষয়গুলো ঠিক ঠিক ধরতে পারেননি, এমন উদাহরণের উপস্থাপন করা যাবে অনেক। আমার মনে হয়, কাজী মুহম্মদ অলিউল্লাহ স্যার কবিতাটা ধরতে পারেন (একাডেমিক ধাঁচের প্রচলিত বর্ণনার বাইরেও আলাদা-আলাদা ভঙ্গিমায় বুঝিয়ে দিতে পারার অনবদ্য ক্ষমতা তাঁর সহজাত, তাই এমন বলা)

কথা বলতে বলতে স্যার বলেছিলেন, একটা মিছিল বা প্রোসেশন-এ অনেক লোক থাকে। অনেক মাথা-মুখ, শরীর থাকে। সামনে থেকে কাউকে কাউকে দেখা যায়, পেছন থেকেও দেখা যায় কিছু জনকে, আবার ধার থেকেও দেখা যায় বেশ কিছু জনকে। একেবারে উপর থেকে চোখ মেললে অন্য রকমের ছবি দেখা যায়Ñ সব মাথাগুলোর ছবি।

স্যার যেটা বলতে চেয়েছিলেন, সম্ভবত এ রকমÑ যে কোন এলাকায়, যে কোনো দেশে শিল্প-সাহিত্যের কোনো একটা আন্দোলন সমবেত প্রচেষ্টার একটা মিছিল বা প্রসেশন। যে যে কোণ থেকে যেভাবে দেখবে সে সেভাবেই মনে মনে ধরে নিতে পারবে, ঐ প্রসেশনটা কী বলতে চেয়েছিল। কী বলার জন্যে তারা চলছিল সময়ের সাথে, সময়ের রাস্তা ধরে। সবাই ছিল। কেউ সামনে কেউ পেছনে কেউ ধারে। একটু সময়ের হেরফেরে কেউ দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়…। আমাদের খুজে নিতে হয়, কষ্ট করে খুজে নিতে হয়Ñ

স্যারের বলা কথার ধার ঘেঁষা এমন কিছু কথা ঔপন্যাসিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে বলেছেন, সুপরিচিত মননশীল লেখক গোলাম মুরশিদÑ ‘সবাই স্বীকার করবেন না, কিন্তু ভাগ্য বলে একটা কথা আছে। সেই ভাগ্যক্রমে কেউ কেউ তরতর করে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে যান। ডান হাতে, বাঁ হাতে পুরস্কার নিতে থাকেন। আবার কেউ কেউ উজান ঠেলে প্রতিকূল ¯্রােতে প্রাণপণ বৈঠা টেনেও জনপ্রিয়তা অথবা জনস্বীকৃতির প্রত্যাশিত বন্দরে পৌঁছাতে পারেন না। তাঁর কপালÑ শ্যামলদা দূর্ভাগ্যক্রমে এই দ্বিতীয় দলের নিবন্ধিত লোক।১

কয়েকদিন আগে সকালে দেখি চকচকে স্ট্যাম্প পড়ে আছে রাস্তায়।

রেভিনিউ স্ট্যাম্প, তুলে নিলাম। মনে পড়ে গেল ছেলেবেলায় একবার একটা টিঠি পাঠাতে খামের ওপর সেঁটে দিয়েছিলাম বাড়িতে থাকা রেভিনিউ স্ট্যাম্প। বাছাইয়ের সময় বোধহয় পোস্টমাষ্টার কাকা সেটা দেখেছিলেন। পোস্টম্যানকে দিয়ে ডেকে নিয়ে বুঝিয়েছিলেন কোন্ স্ট্যাম্প কোন্ কাজে ব্যবহার করতে হয়। তখন ভালোভাবে বুঝিনি। এখনও বুঝি এমন না। তবে এটা বুঝি সব স্ট্যাম্প সব কাজে লাগে নাÑ

অন্যরকম একটা রেভিনিউ স্ট্যাম্প আছে, সেটি শুধুমাত্র জীবনের সাথে সেঁটে নেওয়া যায় বা যেতে পারে। অমৃতা প্রীতমের আত্মজীবনী ‘রেভিনিউ স্ট্যাম্প’। আধুনিক ভারতীয় সাহিত্যে অমৃতা প্র্রীতম জনপ্রিয় এবং বিশেষ উল্লেখযোগ্য একটি নাম। সাহিত্যিক হিসেবে বৈপ্লবিক চেতনা ও দৃঢ়তায় সমাজকে যতটা না শৃঙ্খল-মুক্ত করতে পেরেছেন, তার চাইতে নিজের একক বিদ্রোহে নিজেই বিধ্বস্ত হয়েছেন অনেক বেশি। তবে কোনো কৃত্রিমতা বা আড়াল দিয়ে তিনি নিজেকে কখনও ঢেকে রাখেন নি, রাখার চেষ্টাও করেন নি এবং তার এই অকপট স্বীকারোক্তিই অমৃতা প্রীতমের সাহিত্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট, সম্ভবত এরই জন্যে বিতর্কিত হয়েও সাহিত্যিক হিসেবে তিনি আজও অনেক জনপ্রিয়।

ছেলেবেলায় চিঠির খামে না জেনে রেভিনিউ স্ট্যাম্প সেঁটেছিলাম, সেটি আমার এক বন্ধুর কাছে পাঠাতে চেয়েছিলাম। নিছক অফিসের কাজের জন্যে ছাড়া এখন আর কাগজে লেখা চিঠি কেউ কাউকে লেখে না। সে এক অন্যরকম অনুভূতি। এ অনুভূতি এখন রূপান্তরিত হয়েছে এস এম এস কিংবা চ্যাটিং-এ। কলম ধরে না লিখলে লেখকদের ভাব আসে না, অনেকে বলেন। এখন অনেক লেখকই অভ্যস্ত হয়ে গেছে কম্পিউটারের কী-বোর্ডে। কী-বোর্ডের সামনে না বসলে তাদের এখন আর ভাব আসে না। কাজে লাগে এমন যা কিছু প্রযুক্তির হাত আসছে যা কিছু আসবে সে সব হাতে হাত মিলিয়ে অভিনন্দন জানানোই ভালো। স্ট্যাম্প বদলের পর চিঠিটা গিয়েছিল আমার বন্ধুর কাছে।

বন্ধুত্ব নিয়ে সন্দিপন চট্টোপাধ্যায়-এর ডায়েরিতে ১৯৯৩ সালের ৩০ জানুয়ারির পাতায় চোখ রাখি ‘বন্ধুতা ব্যাপারে এক-একজনের একটা নিজস্ব খেলা আছে। শতরঞ্চের ওপর চার আনা দান ফেলে কেউ বলে, ‘এই ষোলো আনা ফেললাম।’ বিশ^াস করে যারা ষোলো আনা খেলে (অনেকে ডাবল দেয়), তারা পরে বুঝতে পারে, তারা ষোলো আনা খেলেছে মাত্র চার আনার ওপর। এদিকে সেই বাকি বারো আনা তো নিস্কর্মা হয়ে বসে থাকতে পারে না। তারা, ইন স্পাইট অফ দেমসেলভস প্রতারক বন্ধুটির সঙ্গে অবুঝ অপ্রণয় শুরু করে। এই কারণেই তাঁর সমসাময়িক বন্ধুরা কেউ জীবনানন্দের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পেরেছিলেন, এমন শোনা যায়নি। কারণ, উনি চার আনা ফেলতেন। শক্তি কিন্তু বছরে একবার দেখা হলেও ষোলো আনা বন্ধুত্ব দিয়ে গেছে। সুনীলও ষোলো আনা দেয়, তবে তার বন্ধুত্ব আঠারো আনা। দু আনা নিজের কাছে থেকে যায়।’২

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বন্ধু সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখতে যান নার্সিংহোমে। ১৪ জুলাই ২০০১ তারিখে ডায়েরির পাতায় লেখা ‘কাল শ্যামলকে (সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়) দেখতে গিয়েছিলাম। সিঁথির নার্সিংহোমে। লোকে বলল চিনতে পারছে। আমি টের পেলাম, পারছে এবং পেরেছে।’ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয় ২৪ সেপ্টেম্বর ২০০১।*

সাহিত্যিক বন্ধু শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আরও লিখেছেন

‘… শ্যামল হচ্ছে সেই লেখক যার যে কোনো এক্সপেরিমেন্ট বিনা পরিকল্পনাতেই ভূখ- জয় করে নিতে পারে। ওর লেখক সত্ত্বাকে বোঝাবার জন্য বই পড়বার দরকার নেই, ওর পিছু পিছু ঘুরে বেড়ালেই হবে। একদম শ্যামলের মতো আনপ্রেডিকটেবল। কোনো তত্ত্ব দিয়ে বেশিক্ষণ একটা কুকুরকে বেঁধে রাখা যাবে না। পরের মুহূর্তেই আরেকটা আরেকভাবে চিৎকার করবে। এতে বিপদও আছে। কোনোভাবেই কুকুরটাকেই বুঝতে পারা যায় না ঠিক করে যাতে ধরা পড়ে চিহ্নিত করার মত অপরাধচিহ্ন। ওর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী লেখাগুলো ছোট ছোট। ‘কুবেরের বিষয় আশায়’-এর মত। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ সবচেয়ে ফালতু। ওর কিন্তু ধারণা সেটাই সবচেয়ে ভালো। যে কাজটা বিমল মিত্রের সে কাজটা শ্যামল করতে গেল কেন বুঝলাম না। তবে খুব পরিশ্রম করে ইসলামি ব্যাপারগুলো জেনেছে। চাল টিপে দেখলেই বুঝতে পারা যায়। এ চালে কোনো পাইল নেই, না খুদ, না কাঁকর।

আমার মনে হয় ঐতিহাসিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস যেমন আর লেখার দরকার নেই, তেমনি দরকার নেই আড়াইশ, তিনশ, পাঁচশ পাতার ভল্যুম। কেবল পাতার পর পাতা লিখেই যাব এমন মানত না থাকলে দু’শ পাতার উপন্যাস মানে মহাকাব্য লেখা হল। হ্যাঁ, আমি কখনও দু’শ পাতাও লিখিনি। সেটা কেবলমাত্র কুঁড়েমির জন্য নয়, দৃষ্টিভঙ্গির জন্যও।৩

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে বলেছেন, লিখেছেন অনেকে। আবার তার গল্প নিয়ে গল্প বলেছেন মানে সমালোচনা করেছেনও অনেকে, সে সব সমালোচনা সোনায় মোড়ানো। সব লেখা হয়তো সবার পড়া হয়ে উঠবে না। ছোট পরিসরে তাই আমরা এ লেখাটা পড়ে নিতে পারি
‘হালফিল বাংলা গল্পের অনেকটাই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। শুধু ঘরের ভেতরে নয়, একেবারে খাটের ওপরে। মনস্তত্বের গুপ্ত গহ্বরে তার চলাফেরা। এ নিয়ে কিছু ভাল গল্প লেখা হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু তার সংখ্যা সামান্য। এ ধরণের অধিকাংশ লেখা লেখকের অভিজ্ঞতা ও উপকরণ-সংগ্রহের দূর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে। ফলে গল্পগুলোকে ছক-বাঁধা ও কৃত্রিম বলে মনে হয়। এসব লেখকের ভেতর কেউ কেউ অবশ্যই শক্তিমান।

যে-ভঙ্গি, বিষয়বস্তু এস্টাব্লিস্মেন্টের প্রিয় শ্যামল তাকে পরোয়া করেন না। এস্টাব্লিস্মেন্টের নির্দিষ্ট কিছু থিয়োরি থাকে। সেই থিয়োরীর মাপের সঙ্গে পোষমানা লেখক মানিয়ে চলতে চান। এ থিয়োরী কখনো রুগ্ন বিকৃত মানসিকতাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করে তোলে, আবার কখনো দেশকালের অনুপযোগী তত্ব-কে প্রকাশ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। শ্যামল এসব থিয়োরী মানেন না। তাই নিজেকে চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখেন না তিনি।

বাঙলা গল্পের প্রধান ধারা একদিন গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়িয়েছে। রবীন্দ্রনাথের পদ্মাপাড় থেকে বিভূতি-মানিক-তারাশঙ্করের হাটে ঘাটে তার সাবলীল পদসঞ্চার। সে-ধারাই নতুন স্বাদে ও বিন্যাসে শ্যামলের গল্পে ধরা দিয়েছে। উপকরণের জন্য তাঁকে বানিয়ে-তোলা মানসিক সমস্যার কাছে হাজির হতে হয়নি।

স্বাধীনতার আগে গ্রাম শহরে বিচ্ছেদ এখনকার মতো এমন প্রবল ছিল না। বেড়া ছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু এপার-ওপার যাতায়াত খুব কঠিন হয়ে দেখা দেয়নি। এখন কলকাতার আধিপত্যে বাঙলা সাহিত্য থেকে গ্রাম প্রায় নির্বাসিত হতে চলেছে। গ্রাম জীবন নিয়ে গল্প-উপন্যাস লেখা হয়ত চলছে আজও, কিন্তু তার স্পন্দনে স্বাভাবিকতা কমেছে। অথচ গ্রামের রঙ এখনো বাঙলার মানচিত্রের অনেকটাই দখল করে আছে। এ গরিষ্ঠ জনম-লীকে শ্যামল অস্বীকার করেন নি। তিনি সরাসরি তার ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। এমন লেখকের পক্ষে এস্টাব্লিস্মেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকা কঠিন।

এখানে কিন্তু এমন সিদ্ধান্ত করা হচ্ছে না যে গ্রাম-জীবন নিয়ে লিখলেই লেখা ভালো হবে। আসলে আমাদের শহরকেন্দ্রিক জীবন-বৃত্তের একটু বাইরেই বানিয়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় কোন অস্তিত্বই নেই। অথচ অসংখ্য ইচ্ছাশক্তি সেখানে ভালোমন্দের কাটাকুটি খেলে। এবং সব কিছুর কাটাকুটির পর হাতে থাকে মানুষ। এসব মানুষকে শ্যামল দেখেছেন নানাভাবে। কোনো অনুকম্পার চোখ দিয়ে নয়। গুরুমশায়ের ভঙ্গিতে শেখাতেও বসেন নি কিছু। অর্থনৈতিক কোনো শস্তা সমাধানেও পৌঁছোতে চান নি তিনি। যে-জবিনকে কেন্দ্রে রেখে মহাকাল অতি ধীরে পাশ ফেরে, শ্যামল নিস্পৃহ আবেগে তার আবর্তনকে ধরে রাখতে চেয়েছেন তাঁর লেখায়।

‘লক্ষণ তখনো দেখছিল, ছেচতলান নিচেই ঘন ঘাস হয়েছে। সবুজ আর বিনবিনে। সাদা ন্যাড়া উঠোনের লাগোয়া এই সবুজ জায়গাটুকুতে ঘরের চাল ধুয়ে নাগাড়ে বৃষ্টির জল এসে পড়ে। সেখানটায় মাথা দিয়ে সে শুয়ে আছে। চোখের পাশেই ঘাসের গোড়া। পরিস্কার দেকতে পাচ্ছিল লক্ষণ। সিধে সিধে সব ঘাস দাঁড়ানো। সবাই তার চোখের সমকক্ষ। সেই পরিমান লম্বা। ঘাসগুলো যে বাড়ছে তার আওয়াজও শুনতে পাচ্ছিল লক্ষণ।’ (লক্ষণ মিস্ত্রির জীবন ও সময়)

শুনতে পান শ্যামলও। প্রাকৃতিক শক্তির মতো অনিবার্য জীবনপ্রবাহের স্বরগ্রাম তাঁর কানে পৌঁছোয় অনায়াসে। তাই নিস্পৃহবাবে লিখতে পারেন, ‘যখন এখানে এভাবে থাকতেই হবে তখন আর পাম্পসু খুঁজে লাভ নেই বুঝে যেকানে ছিল টিক সেখানেই ক্ষীরোদ একটুও না নড়ে বসে গেল। কোথাও অন্ধকারের ছিটেফোঁটা নেই। বাদা ভর্তি জ্যোৎ¯œা। ডোঙ্গার চড়ে পোড়ো গায়েন ইচ্ছে করলেই ফিরতে পারে এখন।’ (রাখাল কড়াই)

এ নিস্পৃহতা কিন্তু একেবারেই লোকঠকানো। তাই দেখে মানুষ মুগ্ধ হয়। অর্থাৎ ঠকে। শ্যামলের নিস্পৃহ নীলপর্দা সরিয়ে আগুনের গোলাগুলোকে চিনে নিতে সময় লাগে। অথচ একটু সরালেই দেখতে পাওয়া যাবে, দাক্ষী দুটি যুযুধান পুরুষকে বন্ধ দরজার বাইরে রেখে ‘পা’ গুটিয়ে অন্ধকার মেঝেয় ধামাটা খুঁজে বেড়াচ্ছে’ (দখল)। তার উন্মুখ প্রতীক্ষা সাপের সান্নিধ্য খুঁজছে।

শ্যামলের গল্পে সাপ ঘুরে ফিরে দেখা দেয়। এ মসৃণ সুন্দর ভয়ঙ্কর সরীসৃপটি নানা পাকে পাঠককে জড়িয়ে ধরতে চায়। কোন এক অতলস্পর্শী রহস্য জীবন অথবা মুত্যুর রূপ ধরে দূরে যায়, আমাদের অন্ধ নিয়তি ! সাপের ছিলায় ভাগ্যের তীর কোন্ দিকে ছুটে যায় ?

আর তার পাশেই থাকে ‘গত জন্মের রাস্তা’।

শৈশবকে কেন্দ্রে রেখে দুটি পৃথক জীবনবোধের ধনুকে গুনপরানো সহজ নয়। সাপের ছিরাও সেখানে হার মানে। কিংবা সাপের চিলা বলেই হয়ত। শহুরে মন। এমন জীবন অস্বীকার তো করবেই। নব-ভালোবাসার বৃত্তে না ফিরলেও বাঘা কিন্তু ঠিক ফিরে আসে। কুকুর কিনা !

শ্যামল ব্যঙ্গ করেন কম। করেন যখন, তখনো কাঠখোট্টা হতে পারেন না। নিপুণ শল্য চিকিৎসকের মতো তাঁর ছুরির ফলা কখন হৃদ্পি-ের গভীরে ঢুকে যায়, ঠাহর পাওয়া যায় না। অপারেশনের আগে অনুরাগের আরকে তিনি অ্যানাস্থাসিয়া সেরে নেন। তাই ‘গত জন্মের রাস্তা’য় নব’র চলে যাওয়া আর বাঘার ফিরে আসার মধ্যে কোনো চোখ বেঁধানো চমক থাকে না। প্রমীলাকে নিয়ে হাজরা যকন বাদা দিয়ে করো খরো চলে যায়, তখন ‘অন্য বছর এই সময় বাদায় এক হাঁটু জল থাকে। এখন প্রায় শুকনো। পৃথিবী তার নিজের সুখে মাঠ ঘাট ছাড়িয়ে ঠা-া খাচ্ছিল। চাঁদ তার পচন্দ মত জায়গা তেকে জ্যোৎ¯œা ঢালছিল। হাজরার পেছন পেছন প্রমীলা। সামনেই নবীনবাবুদের আবাদ। দুধারে শুঁটকো শুঁটকো ধান চারা। চরাচর জুড়ে ধামা-ওলাটানো কুয়াশায় ওরা মুছে গেল’। (অন্নপূর্ণা)

প্রমীলা যাবে হিগ্গাড়ির বাজারে। রাতের বেলা ব্যাপারিদের কাছে দেহের মজুরি খেটে পয়সা এনে উপুসী স্বামী সন্তানকে খাওয়াবে সে। হাজরা তার চলনদার। অথচ এ-হাজরাই সীতাকু-ে যাবে না পাছে চোর সম্বন্ধীর সান্নিধ্যে এসে সে-ও চোর বনে যায়। জীবনের গভীর থেকে উৎসারিত এ ব্যঙ্গ। প্রচলিত কোনো হাস্যরসের কাপে একে এঁটে দেওয়া শক্ত।

কত ধরণের মানুষ। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে গল্প আছে। প্রত্যেকটি গল্প আলাদা। উপলব্ধি আলাদা। এক সমতলে বাস করেও বিভিন্ন জীবন ধাপে ধাপে উঠে গেছে। নেমে গেছে। সেখানে কখনো দেখা দেয় বিপিন। কখনো গনেশ। এই সব মানুষ পরিচিত দুঃখসুখের রঙ মেখে অপরিচিত হয়ে দেখা দেয়।

আমাদের জামায় মোড়া ভদ্রতা থেকে মাত্র পনেরো মাইল দূরে এমন জীবন অজ¯্র ফলে আছে। সকালের পয়লা রেলগাড়ীতে তরিতরকারির সঙ্গে তার কিছু চালানও আসে কলকাতায়। ততক্ষণে অবশ্য তার রঙ যায় পাল্টে। প্যাকেটে গুঁড়ো মশলার কারি বানিয়ে তার টাটাকা স্বাদ পাওয়া তখন অসম্ভব। শ্যামল তাই সেই টাটকা স্বাদের কাছে আমাদের সোজা চালান দিতে চান। সরেজমিনে।

পথগুলো কাছাকাছি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে দূরে দূরে চলে গেছে। কখনো কখনো একে অপরকে জড়িয়েও গেছে। সাপের মতন। সে-পথে শুধু হাজরা-প্রমীলা হাঁটে না। রিক্সা চালায় অমৃতও। অমৃত ভগবান দেখে বেড়ায়। ভগবান কোথায়? অমৃতের ভগবান কোনো গুহানিহিত তত্বে বাস করেন না। তার ভগবান প্রসারিত পৃথিবীতে, প্রকৃতির আলোছায়ায় বিছিয়ে থাকেন। চন্দনেশ^রের মাচানতলায় গিয়ে ‘অমৃত দেখল এখানে ভগবানের কোন শেষ নেই। যতই এগোয় ততই বেড়ে যায়। মনটা কিসে তরে যাচ্ছে। … বাতাসে কিসের সুবাস। … অমৃত একবার ফিরে তাকাল। পেছনেও সেই একই ছবি। হলুদ ফুল। গুঁড়ো গুঁড়ো পরাগ-মাখানো কেশরগুলি ফুরের লাল জন্মভূমি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ভোরের বাতাসে দুলছে। মাচানের পর মাচান ফেলে এসেছে অমৃত। তার শেষে রিক্সাখানা কত ছোট দেখাচ্ছে। সিটে সাদাপানা একটা মানুষ বসে। ধুতি পাঞ্জাবি পরেছে। এখান থেকে কুচো-পাখির চেয়ে ছোট দেখাচ্ছে শ্যামলবাবুকে। মানুষটা বড় ভাল। তাঁর জন্যেই ওর আজ এখানে আসা হল’। (চন্দনেশ^রের মাচানতলায়)

সহজ সুন্দর সহাস্য ভগবান অমৃতকে দেখা দেন এমন আয়োজনহীন অবহেলায়। মন্ত্রের মতো অমোঘ তার আবেদন। অথচ অমৃতের শ্যামলবাবু কিন্তু যাতয়াতে ষোল মাইল বিনে ভাঢ়ায় ওই রিক্সায় চড়ে পটলের চাষীদের দাদান দিতে গেছেন।

এখানেই শ্যামলের জিৎ। তিনি ইচ্ছে করলেই দূরে বসে থাকতে পারেন। অকুস্থল থেকে তাঁকে হয়ত কুচো-পাখির থেকেও ছোট দেখায়। তাই বলে তিনি কখনো মিলিয়ে যান না। চলমান জীবনের দ্রুতমন্থর ছবি তাই তাঁর ফ্রেমে ধরা পড়ে অনায়াসে। প্রবহমান ¯্রােত থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেন বলেই তাঁর তট-স্থ দৃষ্টি এমন গভীরতায় পৌঁছে যেতে পারে।

‘এ জীবন কলকাতা থেকে খুব দূরে নয়। মাত্র পনেরো মাইল। আমার জন্য এই পৃথিবীটুকু আলাদা করা ছিল। ইস্ জীবনের কতখানি ব্যয় করার পর তবে আমি এলাম। আগে যদি জানতাম সবাই একে একে খসে যাবে। শেষ অবধি ওই শিরীষ গাছের ছায়াটুকু এত আপন মনে হবে’। (কন্দর্প)

ঈশ^রের তাড়াহুড়ো নেই। একেকটি প্রাণ মাখানো পৃথিবী তৈরি করতে তিনি কাটিয়ে দিতে পারেন অনন্তকাল। তাকে ইচ্ছে দিয়ে মুড়ে দিতেও সময় লাগে অনেক।

শ্যমল সেই ইচ্ছেটুকু খুঁজে পেয়েছেন। তাই পৃথিবীর রহস্যের কাছে পায়ে হেঁটে যেতে তাঁর দ্বিধা নেই। আর এ জন্যেই তাঁর বিস্ময় কখনো শেষ হতে চায় না : ‘তুই কে দাক্ষী ? তুই আসলে কে?’

এ জিজ্ঞাসা সন্তোষ টাকির। হয়ত শ্যামলের। এবং আমাদেরও।৪

১. ঔপন্যাসিক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়: আলোকিত মুখচ্ছবি: গোলাম মুরশিদ: অবসর, ফেব্রুয়ারি ২০১৭। পাতা- ১২২।

২. সন্দিপন চট্টোপধ্যায়ের ডায়েরি: অদ্রীশ বিশ^াস সম্পাদিত: প্রতিভাস, কলকাতা: পাতা-১৫৭

৩. সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডায়েরি: সম্পাদনা- অদ্রীশ বিশ^াস: প্রতিভাস, কলকাতা: পাতা- ১৯২
৪. শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প (ভূমিকা): ড. বিষ্ণু বসু: শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পসংগ্রহ: তিন সঙ্গী, কলকাতা, এপ্রিল ১৯৮০।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন