জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে


মে ৬ ২০১৮

শহর প্রতিনিধি: জলবায়ু পরিবর্তনজনিত মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা । এরই মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তর গোলার্ধে বরফ গলছে। দেশ জুড়ে দুর্যোগও বাড়ছে।

গবেষণা ভিত্তিক এসব তথ্য তুলে ধরে ‘জলবায়ু পরিবর্তন, শ্যামনগর উপজেলার বিপন্নতা ও ঝুঁকি’ শীর্ষক পুস্তিকা প্রকাশ করে বক্তারা বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তারা বলেন, জলবায়ু তহবিল গঠন, নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের জন্য স্বচ্ছতার সাথে কাজ করতে হবে।

একই সাথে উপকূলের বাঁধ নির্মাণ সংস্কার জোরদার করে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে। শনিবার সকালে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের শহীদ সম আলাউদ্দিন মিলনায়তনে আয়োজিত এই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা আরও বলেন, এ অঞ্চলে ঘুর্নিঝড় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১৯৭০ এর গোর্কি থেকে এ পর্যন্ত ১৪ টি ভয়াল ঘুর্নিঝড় আঘাত হেনেছে। বাংলাদেশের ৭২০ কিলোমিটার উপকূলে জলোচ্ছাস, দুর্যোগ বেড়েই চলেছে। কালবৈশাখী ঝড়ের ছোবল ও তীব্রতা বাড়ছে। বজ্রপাতে গত সাত বছরে দেড় হাজার মানবসন্তানের প্রাণহানি ঘটেছে। পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। পানীয় জলের সংকটও তীব্র হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ বাস্তুত্যাগী হচ্ছে।

‘গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান’ (সিএসআরএল) আয়োজিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জলবায়ু পরিষদের সভাপতি সাবেক উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. নাজিমউদ্দিন।

প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে সিএসআরএলএর প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন। তিনি বলেন, এই পুস্তিকা তথ্যবহুল। এই পুস্তিকা ব্যবহার করে জলবায়ু মোকাবেলায় আরও বেশি বেশি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সূচনা বক্তব্যে সিএসআরএলএর সাধারণ সম্পাদক লেখক গবেষক জিয়াউল হক মুক্তা বলেন, ২০০৯ এর ২৫ মে আঘাত হানা ভয়াল আইলায় ল-ভ- হয়ে যায় দেশের দক্ষিণ জনপদ বিশেষ করে সাতক্ষীরাসহ কয়েকটি জেলা। গৃহহারা আট লাখ মানুষ তাদের সহায় সম্বল নিয়ে টানা দুই বছর রাস্তায় কাটিয়েছে। সে সময় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে জীবন ও সম্পদ। সংযোগ সড়ক বিধ্বস্ত হয়েছে। পানীয় জলের উৎস হারিয়ে গেছে। উপকূলীয় বাঁধ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। কৃষি সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়। মানুষের কর্মসংস্থানও নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় তারা পড়েন খাদ্য সংকটের মুখে। এসব তথ্য তুলে ধরে জিয়াউল হক মুক্তা বলেন, সে সময় বিশেষজ্ঞরা বলেন আগামী ৯৮ বছরে তাপমাত্রা যেন ২ ডিগ্রীর বেশি না হয়। অথচ এই প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আগামি ১০০ বছরে তিন ডিগ্রী বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন এমনটি হলে আইলার চেয়েও ভয়ানক দুর্যোগ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন।

তিনি বলেন, এখন বিপন্নতা মোকাবেলার সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। এর জন্য দরকার স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন, অর্থায়ন, উপকূলীয় বাঁধ রক্ষনাবেক্ষণে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ ভাঙ্গার আগে কিছু করতে পারে না। আবার বাঁধ ভাঙ্গলেও অর্থাভাবে কিছু করতে পারে না। এ অবস্থা থেকে সরে আসার আহবান জানিয়ে তিনি আরও বলেন প্রকৃত ঝুঁকি কোথায়, কারা কারা বিপন্ন হতে পারে এবং সরকার কি কি ব্যবস্থা নিয়েছে তার সমন্বয় হওয়া দরকার।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন আরও বলেন, সরকার জলবায়ু খাতে প্রতি বছর এক বিলিয়ন অর্থাৎ এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন এই অর্থের শতকরা ৭৭ থেকে ৭৮ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। বাকি ২২ -২৩ শতাংশ আসছে বৈদেশিক অর্থ থেকে। তিনি বলেন শিল্পোন্নত দেশগুলির কার্বন নিঃসরন বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে আমরা বিপন্নতার শিকার হচ্ছি। উপকূলে পানিতে লবনাক্ততা বাড়ছে। খাবার পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। এখন নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, এজন্য দরকার তিনটি বিষয়। এক পলিসি প্রণয়ন। দুই অর্থায়ন এবং তিন বাস্তবায়ন। তিনি বলেন এসব বিষয়ে সরকার পূর্নমাত্রায় সচেতন রয়েছে। এরই মধ্যে তিন হাজার কোটি টাকার জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড তৈরি করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশ এখন আর আর দরিদ্র নয় । দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে পৌছেছে। এজন্য বৈদেশিক সাহায্য পাবার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার অর্থ সংগ্রহে তৎপর রয়েছে। জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ঝুঁকি মোকাবেলায় জনসচেতনা বাড়াতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে জেলা প্রশাসন কাজ করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয় ক্ষতি মোকাবেলায় জনপ্রতিনিধি হিসাবে যতোটা সম্ভব আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে। আপৎকালিন তহবিল গঠন করে বাঁধ নির্মানের সুযোগ করে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি ও তা মোকাবেলার কথা জনগনের কাছে পৌঁছাতে হবে। এতে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। তিনি আরও বলেন জেলা পরিষদের ১৩১ টি পুকুর খননের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে পানি উন্নয়ন বোর্ড ১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী এবিএমএ মামুন বলেন শুধুমাত্র প্রকৃতিগত কারণে নয় , স্থানীয় নানা কারণে আমাদের ঝুঁকি বাড়ছে। এসব মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রকল্পের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন জনপ্রতিনিধিরা সরকারের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন উপকূলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা হচ্ছে। সাতক্ষীরার ৩৭৭ কিলোমিটার বেড়ি বাঁধ, ১২১ টি স্লুইস গেট ও ১২৬ টি খালের রক্ষনাবেক্ষণে পাউবো কাজ করে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিষদের সদস্য সচিব ও দৈনিক দক্ষিণের মশাল সম্পাদক অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আবদুল হামিদ, শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহসিন উল মুলক, জেলা পুলিশিং কমিটির সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা, প্রেসক্লাব সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ, জেলা পরিষদ সদস্য এ্যাড. শাহনাজ পারভিন মিলি, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সুভাষ চৌধুরী, সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনিসুর রহিম, প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম কামরুজ্জামান, বুড়িগোয়ালিনী ইউপি চেয়ারম্যান ভবতোষ মন্ডল প্রমুখ। এতে স্বাগত বক্তব্য দেন সিএসআরএলএর সমন্বয়ক প্রদীপ কুমার রায়। অনুষ্ঠানে জলবায়ু পরিষদের সদস্যবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধি ও গনমাধ্যম প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকাশনা অনুষ্ঠানে শ্যামনগরের ১২ টি ইউনিয়ন পরিষদে জলবায়ু ঝুঁকি এবং ঝুঁকি নিরসণে কি কি করনীয় তা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে গুরুত্ব লাভ করেছে বাঁধ নির্মাণ সংস্কার, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, লবন সহিষ্ণু ধান উৎপাদন, চিংড়ির সাথে ধান উৎপাদন, বাঁধ কেটে চিংড়ি চাষ না করা, লবনাক্ত পানি কৃষি জমিতে উঠোনো বন্ধ করা, খাল জলাশয় উন্মুক্ত রাখা, আশ্রয় কেন্দ্র নির্মান, জনসচেতনতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন