একাত্তরের রঙ্গ ব্যঙ্গ


এপ্রিল ৬ ২০১৮

সফিয়ার রহমান---

যুদ্ধ নিঃসন্দেহে অমানুষের পরিচয়। যুগে যুগে যত যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে তার ভয়াবহতা যেমন আছে তেমনি কিছু রঙ্গ রসিকতাও হয় যা যুদ্ধ পরিবর্তীতে চায়ের আসর জমে ওঠে। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের দেশেও এমন কিছু ঘটনা ঘটে ছিল যা দাদী নানীরা তাদের নাতি নাতনিদের এখন গল্প আকারে বলে শোনায়।
গল্পগুলো সত্য তবে ক্ষেত্র বিশেষ নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
একাত্তরের যুদ্ধের সময় পাকিস্থানী আর্মিরা যে এলাকা দখল করে রাখত সেখানে বাঙ্গালীদের অবাঁধে চলাফেরা করতে হলে তৎকালীন আঞ্জুমান অফিস থেকে পাকিস্থানীদের পক্ষে আছি এই মর্মে আইডেনটিটি কার্ড বা পরিচয় পত্র দিত। এটা জীয়ন কাটি হিসাবে জীবন বাঁচাত। পাকিস্থানী সাধারণ সৈন্যেরা অধিকাংশ গজ মূর্খ ছিল। তারা বলত ডান্ডি কার্ড। যশোর জেলার ঝিকরগাছা বাজারের কপোতাক্ষ নদের রেল ব্রীজের উপরে আর্মি টহল দিত। সাথে থাকত গন্ডমূর্খ রাজাকার, মুজাহিদ, আলবদর। গ্রাম গঞ্জ থেকে যেই বাজারে আসত তার ডান্ডি কার্ড দেখাতে হতো। না থাকলে মার, নির্যাতন তো থাকতোই, সন্দেহ হলে অনেক সময় ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলত।
একদিন কাশেমপুরের ইচড়েপাঁকা দীন মোহাম্মদ রেশন কার্ড নিয়ে ডিলারের কাছ থেকে চাল আটা তুলতে এল। পাকা উপাধি পাওয়ার কারণ মূর্খ হলেও উপস্থিত বুদ্ধি ছিল খুব বেশি। এলাকার লোকে তাকে উপাধি দিল, “ইচড়েপাঁকা” দীন মোহাম্মদ।
প্যাকেট হাতে দীন মোহাম্মদকে দেখার সাথে সাথে এক পাঞ্জাবী সৈন্য ডাক দিল এ ……….. বাঙ্গালী এদার আও। দীন মোহাম্মদ লক্ষ্মী ছেলের মত কাছে চলে এল। তোম ডান্ডি কার্ড কই হায়? দীন মোহাম্মদ মনে মনে বলল, সর্বনাশ কার্ড তৈরিতো করিনি, এখন উপায়! তাড়াতাড়ি প্যাকেট থেকে রেশন কার্ড বের করে দিল। পাঞ্জাবী সৈন্য গোঁপ পাকিয়ে, চোখ রাঙ্গিয়ে বলল, এ ………….. কিতনা ডান্ডি কার্ড হ্যায়? দীন মোহাম্মদ হাসি হাসি মুখ করে বলল, “স্যার এ ……….. হোল ফ্যামিলিকা ডান্ডি কার্ড হ্যায়”। সৈন্য তো গ-মূর্খ, পাশে তখন রাজাকার নেই। সৈন্য বলল, হোল ফ্যামিলিকা ডান্ডি কার্ড, ঠিক হ্যায় যো”। দীন মোহাম্মদ উপস্থিত বুদ্ধিতেই সে যাত্রা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেল।
বিশু মোড়ল যশোর জেলার মনিরামপুর থানার এনায়েতপুর গ্রামে বাড়ি। এখনো জীবিত আছেন। সকাল বেলা পান্তা ভাত আর খেজুরের গুড় হলে যথেষ্ট। সারাদিন মাঠে কাজ করে বেড়ায়। যুদ্ধের সময় একদিন গ্রামে পাকিস্থানী সৈন্যসহ রাজাকারেরা চলে এল। যে যেভাবে পারে জীবন বাঁচাতে পালায়ে গেল। বিশু মোড়ল বাড়ীর কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ তাকে ঘেরাও করে ধরল। ধরেই বুঝতে পারল, দিন মজুর খেটে খাওয়া মানুষ। তবুও পুকুর পাড়ের সেই ব্যাঙ ও দুষ্টু ছেলেদের মত দুষ্টামী শুরু করে দিল। গাছের সাথে বেঁধে গুলি বিহীন রাইফেল নিয়ে গুলির প্রস্তুতি নিল। গাছের সাথে পাথরের মত বিশু মোড়ল দাঁড়িয়ে আছে। বিশু মোড়লের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা একবার সমস্বরে অ্যা—করে কেঁদে উঠেছিল। পাঞ্জাবীদের তাড়া খেয়ে চুপ করে বসে আছে। স্ত্রী চিকন সুরে একবার কান্নার চেষ্টা করে ছিল। রাজাকারের থাপ্পড় খেয়ে মাথা দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে বসে আছে। অপলক চোখে চেয়ে থাকা ছাড়া করার কিছুই নেই। এবার রাইফেল বুকে চেপে ধরে ঘোড়াকল কট করে টান দিল। গুলির শব্দ হল না। হাসির রোল উঠল। তবে বিশু মোড়লের দ’ুকান দিয়ে চো ……….. করে শব্দ বের হল। সেই থেকে বিশু মোড়ল কালা হয়ে স্বাধীন দেশে এখনো বেঁচে আছে।
এনায়েতপুর গ্রামে বক্স নামের একজন আঁধা পাগল ছিল। সারাদিন খাওয়ার ধান্দায় এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়াত। একদিন এনায়েতপুর বাজারে বসে আছে এমন সময় পাকিস্থানী সৈন্যরা তাকে ধরে ফেললো। উর্দুতে যা কিছু জিজ্ঞাসা করে, না বুঝে শুধু বলতে থাকে, স্যার নৌকায় ভোট দিছি। স্যার নৌকায় ভোট দিছি।। মনে করেছে এতেই সে রক্ষা পাবে। সৈন্যরা বাংলা কথা বললেও বুঝতে পারে এ নৌকায় ভোট দিয়েছে। রাজাকারদের হুকুম দেয় ইনকো মুমে (মুখে) লাথ মার। লাথি খেতে খেতে মুখ ফুলে গেল। এবার হুকুম দিল গান্ধা মাট্টি মুমে মারদো (পঁচা কাদা মুখে মাখাও)।
আচ্ছামত কাঁদা মাখিয়ে ছেড়ে দিল। বক্স বাড়ি ফিরে এলে নিজের ছোট সন্তানেরাও ভূত মনে করে ভয়ে চিৎকার করে ওঠলো।
মদনপুর গ্রামের আব্দুল গফুর। এখন শিক্ষকতা করেন। গফুর মাষ্টার বললে সকলেই চেনে। যুদ্ধের সময় গফুর মাষ্টার যুবক। যুদ্ধে যাওয়ার সময় কিন্তু এত ভীত ছিল যে সারাদিন ঘরের ভিতর লুকিয়ে থাকত। গ্রাম গঞ্জে তখন প্রায়ই রাত হলে গুজব ছড়াত রাজাকার এসে গেছে। আর যায় কোথায়। যে যে দিকে পারে ভোঁ দৌড়। তখন গ্রাম গঞ্জে স্যানিটারী পায়খানার ব্যবস্থা ছিল না। খড় গাদা, বিচালি গাদা, ঝোপ ঝাড়ের পাশেই পায়খানা করে রাখত। গফুর মাষ্টার প্রায়ই দৌড়ে খড় বিচালি গাদার পাশে পালাত। ভয় কেটে গেলে দেখা যেত গফুর মাষ্টারের গায়ে পায়খানা লেগে আছে। মাষ্টারের মা সেই রাতে গালি গালাজ করে গোসল করায়ে তবে ঘরে তুলতো।
মদনপুর গ্রামের কাদের সরদার পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথে করে সকাল বেলা গরু ছাগল নিয়ে মাঠে ঘাস খাওয়াতে যেত। তখন ফসল উঠার পর মাঠ পড়ে থাকত, ঘাস জম্মাতো। শুকনো বিলের মধ্যে কয়েক গ্রামের হাজার হাজার গরু ছাগল ছেড়ে দিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘাস খাওয়াতো রাখাল ছেলেরা। একদিন বিকেলবেলা বিলের ধারের রাস্তা দিয়ে পাঞ্জাবী সৈন্যসহ রাজাকারের দল যাচ্ছে। কাদের সরদার দেখতে পেয়ে ওরে বাবারে বলে দিল দৌড়। সাথে তার সহকর্মীরাও দৌড় ধরলো। রাখাল দৌড় দিলে তার গরু ছাগল ও কিছুই না বুঝে দৌড়াতে থাকে। সমস্থ বিলের গরু ছাগল আর রাখালেরা প্রাণপণে গ্রামের দিকে দৌড়াচ্ছে। চৈত্রের ধুলায় মানুষ পশু চেনা যাচ্ছে না। রাজাকারেরা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে খিল খিল করে হাসছে। পাঞ্জাবী সৈন্যরা অনর্গল গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। তাতে দৌড়ের বেগ আরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। গুলির শব্দে গ্রামও জনশূণ্য হয়ে গেল। অস্থিরতার মধ্যে রাত এসে শেষ হয়ে গেল। সকাল বেলা পরিস্থিতি শান্ত হলে দেখা গেল বিলের মধ্যে কয়েকটা গরু ছাগল গুলি খেয়ে মরে পড়ে আছে।
কাদের সরদারের সমবয়সী সাত্তার সরদার। জন্মের পর মাকে হারায়। মা বিষাক্ত সাপের কামড়ে রাতে মরে ছিল। সকালবেলা সাত্তার সরদার মৃত মায়ের বুকের দুধ খেয়ে ছিল। এই জন্য নাকি পাগলাটে এবং গোয়ার স্বভাবের হয়েছে। যুদ্ধের সময় সাত্তার কিশোর বয়সের। একদিন শেষ বিকেলে বাঁশগাছে উঠে গরুর জন্য বাঁশের পাতা ভাঙছে। এ কারণে বাঁশগাছ বেঁকে এসেছে। মনের আনন্দে গুন গুনিয়ে গান গাইছে আর পাতা ভাঙছে। এমন সময় দেখে একটা গেছো সাপ তার দিকে এগিয়ে আসছে। সাত্তার সাপের খুব ভয় পেত। কারণ তার মা সাপের কামড়ে মারা গিয়েছে। উরি— উরি— শব্দ করতে করতে বাঁশের শেষ মাথায় সরে আসছে। গাছ ক্রমে মাটির দিকে নুইয়ে আসছে। এক সময় ধপ করে মাটিতে এসে পড়ল। ঐ সময় একদল রাজাকার ঐ পথ দিয়ে অতি গোপনে গ্রামের স্কুলের মাঠের দিকে এগুচ্ছিল। সাত্তারকে সঙ্গে সঙ্গে ধরে ফেললো এবং স্কুলের মাঠে নিয়ে গাছে উল্টো করে ঝুলিয়ে বেদম মার দিয়েছিল। পরে গ্রামের লোকের অনেক অনুনয় বিনয়ের পরে পাগল প্রমাণ করায় ছাত্তার এযাত্রা মাফ পায়। এখনও সাত্তার সরদার আমাবস্যা পূর্ণিমায় রাজাকারের মার খাওয়া ব্যথা অনুভব করে। আজও বলে বেড়ায় সাপের হাত থেকে মুক্তি পেলেও রাজাকারের হাত থেকে সেদিন মুক্তি পায়নি।
একাত্তরের যুদ্ধের সময় বিহারীদের সাথে যোগ দিয়ে কিছু বাঙালি বিহারী সেজেছিল। ঐ সময় ঝিকরগাছার পুরন্দপুরের রউফ ছিল পেশায় নাপিত (নরসুন্দর)। ওর ভীমরতি ধরল, বিহারীদের সাথে যোগ দিয়ে মুজাহিদ হয়ে গেল। কালো প্যান্ট শার্ট পরে রাইফেল কাঁধে নিয়ে বাংলাকে উর্দ্দুতে রূপ দিয়ে কথা বলতে শুরু করল। রাস্তা দিয়ে কেউ গেলে ডাক দেয় ভাইও এদারছে আও। গুল্লি¬ করে গা ইত্যাদি। বেনেয়ালী স্কুলে অধিকাংশ সময় থাকে। একদিন রাতে মুক্তিসেনা রকেট জলিলের অতর্কিত আক্রমনে দিশেহারা হয়ে বুদিহাটা বিলের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে জীবন বাঁচায়। দেশ স্বাধীনের পর মাথা খারাপ হয়ে যায়। লোকে ক্ষ্যাপাত ‘গুল্লি করেগা’ বলে। পিছন দিক থেকে কাছে গিয়ে গুল্লি করেগা বললে পাগলামী শুরু করে দিত। যতদিন বেঁচে ছিল সবাই গুল্লি করেগা রউফ বলে ডাকত।
যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হল। বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য আসতে লাগল। রিলিফ চুরিও হতে লাগল। যশোর জেলার আঞ্চলিক ভাষায় এই চুরিকে বলে মেরে খাওয়া। গম, কম্বল যে যতটুকু সুযোগ পাচ্ছে মেরে খাচ্ছে। আছর আলী বাজার থেকে শুনে এসেছে চীন ভেটো দিয়েছে। বাড়ী এসে প্রতিবেশীদের সামনে বলল, দেশ চলবে না, চীন ভেটো দিয়েছে, তাও মেরে খেয়ে ফেলেছে।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন