বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ হাফিজুর রহমান আর নেই


ফেব্রুয়ারি ১৩ ২০১৭

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ও খুলনা জেলা  সভাপতি প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া (৭৬) আর নেই। রবিবার বেলা পৌনে ৩টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কমরেড হাফিজুর রহমান জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও পাট-সুতা-বস্ত্রকল সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গেল বছর ১৬ সেপ্টেম্বর কমরেড হাফিজুর রহমান ভূইয়াকে দিল্লির বিএলকে হাসপাতালে লিভারের টিউমার অস্ত্রপচার হয়। সেখান থেকে ফিরে এসে পরবর্তীতে চেক-আপের উদ্যেশে ২৮ ডিসেম্বর দিল্লির হাসপাতালে ভর্তি হতে দেশ ত্যাগ করেন। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ১৩ জানুয়ারি  তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গত শুক্রবার একই অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ১ কন্যা, ২ পুত্র, পুত্রবধূ, জামাতা ও নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।আজ সোমবার ঢাকায় ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে ঢাকায় শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর তাঁর মরদেহ খুলনায় আনা হবে। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় খুলনার শহীদ হাদিস পার্কে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার জন্য রাখা হবে। সেখানে শ্রদ্ধা ও জানাযা শেষে পর্যায়ক্রমে খালিশপুর প্লাটিনাম ময়দান, দৌলতপুর শহীদ মিনার চত্বর, আলীম-ইস্টার্ণ চত্বর, ফুলতলা পার্টি অফিস, ফুলতলা উপজেলা ডাবুর মাঠে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও জানাযা শেষে উপজেলা সরকারি কবরস্থানে সমাধিস্থ করা হবে।এদিকে কমরেড হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর খবর খুলনায় ছড়িয়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল এলাকায় শ্রমিকরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। প্রয়াত কমরেডের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে খুলনা জেলা ওয়ার্কার্স পার্টি, আওয়ামী লীগ, ১৪ দলসহ খুলনার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।কমরেড হাফিজুর রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবনী : তিনি খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামে সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬০-৬১ সালে দৌলতপুর বিএল কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক অঙ্গণে প্রবেশ এবং ছাত্র অবস্থায় ফুলতলার প্রবীন রাজনীতিবিদ কালিপদ ঘোষের হাত ধরে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় ভাষানী ন্যাপের রাজনীতি করতেন। ১৯৬৩ সালে আযমখান কমার্স কলেজ থেকে বিকম পাশ করেন এবং ১৯৬৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম কম পাশ করে কর্মজীবনের শুরুতে বটিয়াঘাটা ডেউয়তলা হাই স্কুলে ৬ মাসের জন্য প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে কমরেড নজরুল ইসলামের প্রেরণায় ১৯৬৬-র ৮ জানুয়ারি, শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হয়ে খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে চাকুরিতে যোগদান করেন। চাকুরির সুবাদে ওই মিলের এমপ্লয়ীজ ইউনিয়নে বার বার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। এছাড়া আলিম ও ইষ্টার্ণ জুট মিলস মজদুর ইউনিয়নে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বহুবার বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ পদোন্নতি দিতে চাইলেও তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সার্থে পদোন্নতি নেননি, এমনকি ৮০ দশকের প্রথম দিকে ডিজিএম পদে লোভনীয় পদোন্নতি প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭০ সালের প্রথমদিকে পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন। দেশ স্বাধীনের পর লেলিনবাদি কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে ইউপিপি-তে এবং পরবর্তিতে ইউপিএলবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন। ১৯৮৫ সালে ওয়ার্কার্স পার্টির এক অংশের কেন্দ্রীয় সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন, এরপর ১৯৯২ সালে ৩ পার্টির ঐক্য কংগ্রেসের মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির খুলনা জেলা সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সদস্য হন। ২০০৮ সালে পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৫ সাল থেকে অদ্যাবধি পার্টির খুলনা জেলা সভাপতি ছিলেন। তার বর্ণাঢ্য আন্দোলনমুখর জীবনে রক্ষীবাহিনীর হাতে নির্মম নির্যাতন ও কারাভোগসহ বিভিন্ন সময় ও মেয়াদে ৫ বার কারাভোগ করেন। শ্রমিক নেতৃত্ব ছাড়াও জাতীয় সংসদ ও উপজেলা পর্যায়ে একাধিকবার নির্বাচনে অংশ নেন। বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন কমিটির সদস্য, পাট-সুতা-বস্ত্রকল সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহবায়ক, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও খুলনা-যশোর পাট শিল্প সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক, বিল ডাকাতিয়া সংগ্রাম কমিটি, পানি ঠেকাও ফুলতলা বাঁচাও আন্দোলন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান আন্দোলন, খুলনা শিল্প কারখানা রক্ষার ও মুজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন, বিভিন্ন সময় সা¤্রাজ্যবাদ ও সম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলন, স্বৈরাচারী-দুঃশাসনের আন্দোলন এবং রাষ্ট্রায়ত্ব পাট কলের শ্রমিক আন্দোলনের রূপকার হিসেবে খালিশপুরসহ দেশব্যাপী আন্দোলনের চালিকা শক্তি হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার হাত ধরে ফুলতলা এম এম কলেজ, ফুলতলা মহিলা ডিগ্রী কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। জামিরা বাজার আসমোতিয়া স্কুল এন্ড কলেজ, ফুলতলা রি-ইউনিয়ন হাই স্কুল, দামোদর মুক্তময়ী হাই স্কুল, ফুলতলা মহিলা ডিগ্রী কলেজ ও ফুলতলা এম এম কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি, ফুলতলা লিটল এ্যাঞ্জেল কিন্ডার গার্টেনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এদিকে রূপান্তর পরিবারের পক্ষে নির্বাহী পরিচালকদ্বয় স্বপন কুমার গুহ এবং রফিকুল ইসলাম খোকন এক শোক বার্তায় কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁর বিদেহী রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন। সেই সাথে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।

শোকবার্তায় বলা হয়, কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়ার মৃত্যুতে মেহনতি মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে, খুলনাবাসীর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্বের যে শূণ্যতার সৃষ্টি হলো তা’ পূরণ হবার নয়।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন