সাতক্ষীরায় কর্মশালায় জেলা ও দায়রা জজ সাদিকুল ইসলাম তালুকদার গ্রাম আদালত কম খরচে স্বল্পসময়ে ন্যায় বিচার পাওয়ার জনপ্রিয় মাধ্যম


জুন ২৮ ২০১৮

নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরা জেলা জেলা ও দায়রা জজ মো. সাদিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব নয়, নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে বিচার কাজ পরিচালনা করাই বিচারকের কাজ। বিচার করার ক্ষমতা মহান আল্লাহ প্রদত্ত উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন নিজের বিবেক বিবেচনা ও প্রাপ্ত তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে বিচার কাজ পরিচালনা করতে হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন গ্রাম আদালত এখনকার সময়ে স্বল্প খরচে স্বল্প সময়ে ন্যায্য বিচার পাবার উপযুক্ত মঞ্চ। বাংলাদেশ গ্রাম আদালত দিনের পর দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। উল্লেখ করে তিনি বলেন তৃণমূল পর্যায়ের এই আদালতে দরিদ্র মানুষ বিশেষ করে নারী এবং বিভিন্ন পেশার পিছিয়ে পড়া সাধারন মানুষ স্বল্পতম সময়ে খুব কম খরচে বিচার লাভ করছেন। এই বিচার ব্যবস্থাকে আরও বেগবান করতে আরও কাজ করতে হবে।
বুধবার বিকালে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘জেন্ডার ও গ্রাম আদালত বিষয়ক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সচেতনতামূলক এক কর্মশালার সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন জেলা ও দায়রা জজ মো. সাদিকুল ইসলাম তালুকদার। তিনি আরও বলেন গ্রাম আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালতকে প্রভাবিত করা সহজ নয়। কারণ বাদি বিবাদি এবং বিচার সংশ্লিষ্ট সকলেই স্থানীয় এবং একজন আরেকজনের সাথে পরিচিত। ফলে কোনো ভুয়া তথ্য সেখানে প্রভাব ফেলতে পারে না। ছোটখাট অপরাধের বিচার করে দেশের বিচার আদালতের ভার কমানোর আহবান জানিয়ে তিনি বলেন সকলকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। যিনি বিচার করবেন তিনি যেনো আইন সম্পর্কে সচেতন থাকেন এমন মন্তব্য করে জেলা ও দায়রা জজ বলেন গ্রাম আদালতের বিচারক যদি কোনো দলের হয়েও থাকেন তবু তার কর্তব্য বিচারক হিসাবে দল নিরপেক্ষ থাকা। কোনো পক্ষ কোনো ভাবেই যেনো রাজনৈতিক কারণে বিচার বৈষম্যের শিকার না হন সে বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে। তিনি বলেন এভাবে গ্রাম আদালতের বিচারকগন যদি সাধারনের আস্থা অর্জন করতে পারেন তাহলে মানুষ যেমন ন্যায় বিচার পাবে, তেমনি গ্রাম আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা আরও প্রতিষ্ঠিত হবে। জেলা ও দায়রা জজ আরও বলেন সংবাদকর্মীদের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। তারা মানুষের কথা তুলে ধরেন। তবে তাদেরকে আইন সম্পর্কে ভাল ধারনা থাকতে হবে। যে কেউ কিছু একটা বলে দিল আর সেটা লিখে দিলাম এমনটি যাতে না হয় সেজন্য তাকে আইন জানতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি সাতক্ষীরা দুই একটি ঘটনা তুলে ধরে সিনিয়র সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন প্রয়োজনে ‘সংবাদ ও আইন’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। তিনি কর্মশালায় অংশগ্রহনকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আরও বলেন গ্রাম আদালত যতো বেশি শক্তিশালী হবে ততই স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা করে শান্তির পথ প্রশস্ত হবে।
স্থানীয় সরকার উপ পরিচালক শাহ আবদুল সাদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় আরও বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেরিনা আক্তার ও সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ। জেন্ডার স্পেশালিস্ট কামরুননেসা নাসরিনের সঞ্চালনায় কর্মশালায় উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সহকারি পুলিশ সুপার ( হেড কোয়র্টার) মো. হুমায়ুন কবির, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব সম্পাদক আবদুল বারী, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তারাময়ী মুখার্জী, সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট এড. গোলাম মোস্তফা, সচেতন নাগরিক সমাজের তৈয়ব হাসান বাবু, ঈশ্বরীপুর ইউপি চেয়ারম্যান এড. আবদুস শোকর আলি, কাশিমাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান ডা. এসএম আবদুর রউফ, জালালপুর ইউপি চেয়ারম্যান মফিদুল হক লিটু, রতনপুর ইউপি চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম, মহিলা পরিষদ সম্পাদক জোসনা দত্ত, বিভিন্ন ইউনিয়নের সংরক্ষিক মহিলা আসনের নারী সদস্য ও সাধারন সদস্য, ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের সাতক্ষীরা অফিস প্রধান শরিফুল ইসলাম প্রমূখ।
বিশেষ অতিথি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন বলেন গ্রাম আদালতকে নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করতে হবে। এই আদালতের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো ভুল তথ্য দিয়ে গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভূক্ত মামলা উচ্চ আদালতে পাঠানোর প্রবণতা রোধ করতে হবে। তিনি বলেন আমাদের সমাজে কিছ দুষ্টু প্রকৃতির মানুষ রয়েছেন যারা প্রভাব সৃষ্টি করে গ্রাম আদালতকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে থাকেন। ফলে সহজে যে বিচার পাওয়া সম্ভব ছিল তার পথ জটিল করে ফেলে তারা। এদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন গ্রাম আদালতকেও প্রমান করতে হবে যে মানুষ ন্যায় বিচার পেয়েছে।
বিশেষ অতিথি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মেরিনা আক্তার বলেন যেসব বিষয় গ্রাম আদালতের এখতিয়ারভূক্ত পুলিশ সে মামলা গ্রহন করে না। তিনি বলেন অনেকেই নানাভাবে চেষ্টা করে থাকেন এমন সব মামলা রেকর্ড করতে , কিন্তু পুলিশ খুবই সচেতন। পুলিশ বরং গ্রাম আদালতকে সাহায্য করবে। তিনি বলেন পুলিশ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত করে । তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে আদালত ব্যবস্থা নেয়। তিনি বলেন পুলিশ সব সময়ই গ্রাম আদালত সিস্টেমকে সহযোগিতা দিয়ে আসছে। এতে পুলিশের ওপর থেকে ভার অনেকটাই কমে যায়। এতে বাদি ও বিবাদী উভয়েই শান্তি লাভ করে। তিনি আরও বলেন বর্তমান পুলিশ সুপার মো. সাজ্জাদুর রহমানের নির্দেশ অনুযায়ী ছোটখাট বিষয়ের মামলার জট কমে এসেছে। সদর থানায় এখন মাসে গড় পড়া ৯৭ টি মামলা হথো উল্লেখ করে তিনি বলেন এখন তা ৫৪ /৫৫ টিতে চলে এসেছে। তবে এর মধ্যে মাদক বিষয়ক মামলা বেশি। বিশেষ অতিথি প্রেসক্লাব সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ বলেন সংবাদকর্মীরা গ্রাম আদালতের সুফল পত্রপত্রিকায় তুলে ধরছেন। এতে বিচারপ্রার্থীরা উৎসাহিত হচ্ছেন। তিনি বলেন গ্রাম আদালতের প্রতিনিধিরা প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে গণমাধ্যমকে জানালে তা আরও প্রচার লাভ করতে পারে।

এর আগে সকালের অধিবেশনে কর্মশালায় বলা হয় দেশের ২৭টি জেলায় ১২৮টি উপজেলার ১০৮০ টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্প দ্বিতীয় পর্যায় এখন বেশ সক্রিয় অবস্থায়। গত জুলাই থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এসব আদালতে ৩২ হাজার ২৬৪টি মামলা এসেছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২০ হাজার ৫৬০টি। অন্য মামলাগুলি চলমান রয়েছে জানিয়ে এতে বলা হয় মামলার রায় বাস্তবায়ন হয়েছে ১৭ হাজার ৪০৫টি। এর মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থরা ১৭ কোটি ৬ লাখ টাকারও বেশি ক্ষতিপূরন লাভ করেছেন বলে পরামর্শ সভায় উল্লেখ করা হয়। এতে আরও জানানো হয় মামলার আবেদনকারীদের মধ্যে ১০ হাজার ৫৮৫ জন নারী রয়েছেন। তারা বিচার লাভ করেছেন। নানাভাবে গ্রাম আদালত সম্পর্কে ৪৩ লাখ ৫৬ হাজারেরও বেশী মানুষকে সচেতন করা হয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
কর্মশালায় আরও বলা হয়, সাতক্ষীরা জেলার তালা, আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের এই প্রকল্প চালু হয়েছে। সেখানে ১৬২৭টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১২৪১টি। এতে আবেদনকারী নারীর সংখ্যা ছিল ৩৩৯ জন। এসব পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়, সাধারন মানুষকে সহজেই গ্রাম আদালত খুব স্বল্পতম সময়ে সুবিধা দিতে পারে। একে আরও কার্যকর করতে হলে সবাইকে আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে। অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আদালতের কাঠামো গঠিত হয় উল্লেখ করে বলা হয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিচারের রায় নিষ্পত্তি হয়। সর্বোচ্চ ৯০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না করতে পারলে তা বাতিল হয়ে যায়। ন্যায়বিচার, শান্তিশৃংখলা রক্ষা এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে গ্রাম আদালত আরও ভূমিকা রাখতে পারে বলেও র্ সভায় জানানো হয়।
কর্মশালার সভাপতি স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শাহ আব্দুল সাদী বাংলাদেশের গ্রাম আদালতের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন স্বচ্ছতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্বপূর্ন মাধ্যম গ্রাম আদালত। এই মাধ্যমকে শক্তিশালী করতে গনমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে বলে জানানো হয়। গ্রাম আদালত পরিচালনায় বিভিন্ন সমস্যা ও তার সমাধান নিয়েও কথা বলেন তিনি। সমাজে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক তথ্য দিয়ে মামলা জটিল করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রবনতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে যেমন বাদী বিবাদী দুই পক্ষের ব্যয় বৃদ্ধি পায় তেমনি তা নিষ্পত্তি করতেও বহু ভোগান্তির পাশাপাশি অনেক সময় লাগে। এজন্য গ্রাম আদালতকে আরও বেগবান করতে পারলে তৃণমূল পর্যায়ে শান্তিশৃংখলা রক্ষা সহজ হয়। বিশ্বের বেশী আইনের দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে আইন না মানার এক ধরনের সংস্কৃতি রয়েছে। আইনকে কেবলমাত্র কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা তেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে জানান তিনি। বিচারকদের সব ধরনের প্রভাবমুক্ত থেকে বিচার করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে আদালত সমূহে মামলার জট যেমন কমবে তেমনি গ্রামে শান্তির সুবাতাস বইবে। উন্মুক্ত আলোচনায় আরও অংশগ্রহন করেন তাদের বক্তব্যে উঠে আসে বিচারের নোটীশ গ্রহন না করা, প্রভাবশালীদের বিচারের আওতায় আনার অন্তরায়, সম্পদের মূল্য বৈষম্য, বিচারকদের ভোটের রাজনিিত , বিচারকদের নির্বাচন রাজনীতি, বিচারকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বিচারে নিরপেক্ষতা বজায়ে অন্তরায়সহ নানা বিষয়। এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয় কর্মশালায়।

শ্যামনগর

যশোর

আশাশুনি


জলবায়ু পরিবর্তন